জ্বলদর্চি

দূর দেশের লোকগল্প—২৮৯/লোভী হায়েনা উগাণ্ডা (আফ্রিকা)/চিন্ময় দাশ

দূর দেশের লোকগল্প—২৮৯

লোভী হায়েনা

উগাণ্ডা (আফ্রিকা)

চিন্ময় দাশ


সকালের রোদে ঝলমল করছে চার দিক। এক হায়েনা বেরিয়েছে শিকার করতে। এখন গরম কাল। শিকারের দেখা মেলা ভার। পর পর ক’দিন কিচ্ছুটি জোটেনি। পেটে যেন আগুন জ্বলছে। 

অনেক ক্ষণ ঘোরাঘুরির পর, একটা হরিণ চোখে পড়ে গেল। কৃষ্ণসার হরিণ। সাথে একটা ফুটফুটে বাচ্চাও। খেলা করছে মায়ের সাথে। 

ঝপ করে নীচু হয়ে গেল হায়না। লম্বা ঘাসের বন।শরীর ডুবিয়ে, আড়াল করে ফেলল নিজেকে। বাচ্চাটাকে দিয়ে তোফা ভোজ হয়ে যাবে একটা। ভাবতে গিয়েই, জিভ থেকে লালা ঝরতে লাগল। পেটের ভিতর গুড়গুড় আওয়াজ। দু’-তিন দিন কিচ্ছুটি পড়েনি পেটে। 

শিকারের ছক কষা শুরু হোল। মা হরিণটা ঝামেলা বাধাতে পারে। বাচ্চাকে তাক করলে, সে ছেড়ে কথা বলবে না। মা মানেই তো হরিণী। মাথায় শিং নাই। কিন্তু পেছনের পা দুটো! হরিণীর পায়ের ক্ষুর ভয়াণক ধারালো। চিরে ফালাফালা করে দেবে।

🍂

তখন মাথায় নতুন ভাবনা এলো। বাচ্চা নয় প্রথমে মা হরিণটাকে কুপোকাত করতে হবে। তখন বাচ্চাটা কোনও ব্যাপারই হবে না। আজ কচি বাচ্চাটার নরম মাংস খেলাম পেট পুরে। মা-টা থাকল পরের কয়েক দিনের জন্য। তোফা হবে ব্যবস্থাটা। 

ভাবনা ছেড়ে কাজে নেমে পড়ল হায়েনা। উঠে দাঁড়াল আড়াল ছেড়ে। সোজা তেড়ে গেল হরিণের দিকে। হরিণটা তাকে দেখে ফেলেছে। ছিটকে উঠে লাগিয়েছে দৌড়। নিরাপদ দূরত্ব রেখে থেমে গিয়েছে। যাতে তার দিকেই এগিয়ে আসে হায়না। সেই ফাঁকে বাচ্চাটা দৌড় লাগিয়েছে উলটো দিকে। 

হায়েনা তাড়া করছে। দৌড়ে পালাচ্ছে হরিণ। পালাচ্ছে বটে, একেবারে চোখের আড়াল হচ্ছে না সে। নিরাপদ দূরত্ব রেখে রেখে, সামনে সামনে এগিয়ে চলেছে। 

এভাবেই মাইল দুয়েক দৌড়েছে দুজনে। হায়েনা বুঝতে পারল, তাকে বোকা বানাচ্ছে হরিণ। এমন একটা দূরত্ব রাখছে, যা পার হওয়া তার পক্ষে কোন মতেই সম্ভব নয়। টেনেও এনেছে অনেকটা। 

দৌড় থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল হায়েনা। তা দেখে, হরিণ বুঝে গিয়েছে জিতে গেছি। একটা ঢালের আড়ালে মিলিয়ে গেল বুদ্ধিমতী মা হরিণ।

হায়েনা ভাবল, দারুণ ব্যাপার তো। আমার তো সুবিধাই হোল এতে। বাচ্চাটাকে খুঁজে বার করলেই হোল। নির্বিঘ্নেই কুপোকাত করা যাবে। আজকের তোফা ভোজটা তো সারা যাক। কালকের কথা আজ না ভাবলেও চলবে। দিনের আলো থাকতে থাকতেই ফিরতে হবে। নইলে বাচ্চাটাকে পাওয়া যাবে না। 

মুখ ঘুরিয়ে লম্বা দৌড় লাগাল হায়েনা। মন ফুরফুরে। এবার সহজেই বাচ্চাটাকে কব্জা করা যাবে। কিন্তু দুনিয়া তো আর কারও ভাবনা মতো চলে না। ফিরে এসে দেখল, সব ভোঁ-ভোঁ। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ছায়াটাও দেখা গেল না বাচ্চাটার। কর্পুরের মত উবে গিয়েছে যেন। 

হায়েনা জানতেই পারল না, বাচ্চাটা নিরাপদ জায়গাতেই পৌঁছে গিয়েছে। মা আর বাচ্চাটা দল ছুট হয়ে পড়েছিল। সুযোগ পেয়ে দলের কাছেই ফিরে গেছে বাচ্চাটা। এখন কেবল তার মায়ের ফিরে আসার অপেক্ষা।

হায়েনা বুঝতে পারল, ভুলটা তারই হয়েছে। হরিণকে কাবু করা, একা একটা হায়েনার পক্ষে কোন দিনই সম্ভব নয়। হরিণ শিকার করা দল বেঁধেও প্রায় অসম্ভব। 

আগু পিছু না ভেবে, লোভে পড়ে খামোখা হয়রাণ হতে হোল। 

শ্রদ্ধা ও স্মরণে নবারুণ ভট্টাচার্য।

Post a Comment

0 Comments