জ্বলদর্চি

লাদাখ : মন ভালো করা এক দেশ/তৃতীয় পর্ব /কলি সাহু চৌধুরী

হল অব ফেম

লাদাখ : মন ভালো করা এক দেশ

তৃতীয় পর্ব 

কলি সাহু চৌধুরী 

ঘুম ভাঙ্গতেই পর্দা সরিয়ে দেখি ভোর হচ্ছে সবে, দ্রুত মোবাইল ক্যামেরা হাতে ছাদে উঠতেই চোখের সামনে পাহাড়ের মাথায় ভেসে ওঠে অরুণিত সূর্যদেবের এক আলোক সুন্দর রূপ! ধীরে ধীরে অপরূপ সাজে সেজে উঠছে লেহ এর সকাল। বিশ্ব স্রষ্টার আশ্চর্য তুলিতে রং মেশাতে মেশাতে নরম আলোর বদলে জায়গা করে নিচ্ছে ঝকঝকে রোদ। সে এক অদ্ভুত অনুভূতি! কিছু ক্ষন থেকে নেমে আসলাম ।
আজ আমাদের বেরনো সিন্ধু নদ ও জঁস্কার নদীর সঙ্গম পয়েন্ট এর উদ্দেশ্যে । যাওয়ার আগে থেকেই কয়েকজনের কাছে শুনেছি, লেহ শহর থেকে ৩৫ কিমি দূরে লেহ - শ্রীনগর হাইওয়ের উপরে শ্যাম ভ্যালি তে অবস্থিত এই সিন্ধু নদ ও জঁস্কার নদীর সঙ্গমস্থল নাকি দারুন জায়গা !!
যাঁরা শ্রীনগর হয়ে বাই রোড লাদাখে আসবেন তাদের ওই রাস্তার মধ্যেই পড়বে। যাওয়ার আগে লাদাখের দর্শনীয় স্থান গুলোর একটা দীর্ঘ তালিকা বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম l "
হল অব ফেম"  ছিল আমাদের ভ্রমণ-তালিকার একেবারে প্রথম নম্বরের গন্তব্য অবশেষে কর্মা ভাইয়া গাড়ি পার্ক করতেই আর দেরি করলাম না। সবাই তাড়াতাড়ি নেমে টিকিট কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেলাম। এই সকালেই প্রচুর পর্য্টকের বেশ ভিড়। ভিতরে ঢুকেই হাতে একটা অডিও গাইড দেওয়া হলো। তারপর ধীরে ধীরে একেকটা গ্যালারি ঘুরে দেখতে দেখতে শুনতে লাগলাম ভারতীয় সেনাবাহিনীর বীরত্ব, আত্মত্যাগ আর সীমান্তে তাঁদের কঠিন জীবনযাপনের গল্প। কার্গিল যুদ্ধের নানা স্মৃতি, শহিদ জওয়ানদের ছবি, তাঁদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র আর অজস্র তথ্য দেখে মনে হচ্ছিল,যেন ইতিহাসের পাতাগুলো চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কার্গিল যুদ্ধের বীর সেনানীদের কথা পড়তে পড়তে বারবার গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের বীর যোদ্ধা Major Shaitan Singh-এর অসামান্য সাহসিকতার কাহিনি পড়ে ও শুনে গভীর শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে এল, তাঁর সেই আত্মত্যাগের জন্য তাঁকে মরণোত্তর পরমবীর চক্রে সম্মানিত করা হয়। সেখানেই জানতে পারলাম Captain Vikram Batra Manoj Kumar Pandey, Grenadier Yogendra Singh Yadav-সহ বহু বীর সেনানীর সাহসিকতার কাহিনি। তাঁদের অদম্য সাহস, দেশপ্রেম আর আত্মত্যাগের গল্প শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, এই মানুষগুলোর জন্যই আমরা আজ নিরাপদে আছি। হল অব ফেম ঘুরে দেখার পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রতি শ্রদ্ধা আর গর্ব যেন আরও অনেক গুণ বেড়ে গেল।"গ্যালারিগুলো ঘুরতে ঘুরতে বারবার মনে হচ্ছিল, আমরা কত নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকি, আর দেশের সীমান্তে আমাদের সেনারা কত প্রতিকূল পরিবেশে দিনরাত পাহারা দেন। হাড়কাঁপানো ঠান্ডা, বরফে ঢাকা দুর্গম পাহাড়, অক্সিজেনের অভাব—এসবের সঙ্গে লড়াই করেও তাঁরা দেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। তাঁদের এই ত্যাগ আর নিষ্ঠার তুলনা হয় না।
হল অব ফেম এর প্যারেড গ্রাউন্ড

ভালো লাগল আরেকটা বিষয়। এখানে শুধু সেনাবাহিনীর ইতিহাসই নয়, লাদাখের সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাত্রা আর এই অঞ্চলের নানা অজানা তথ্যও সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তাই Hall of Fame আমার কাছে শুধু একটা মিউজিয়াম নয়, দেশপ্রেম, সাহস আর আত্মত্যাগের এক জীবন্ত স্মৃতিসৌধ!
এরপর প্যারেড গ্রাউন্ডে গিয়ে সেনাবাহিনীর প্যারেড দেখার সুযোগও পেলাম। বিউগলের সুর বেজে উঠতেই চারপাশের পরিবেশ যেন বদলে গেল। একসঙ্গে পা ফেলে এগিয়ে চলা, প্রতিটি আদেশ নিখুঁতভাবে পালন করা, পোশাকের শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা আর অসাধারণ নিয়মানুবর্তিতা দেখে আমরা মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। 
হল অব ফেম থেকে বেরিয়ে আসার সময় মনটা কেমন যেন আবেগে ভরে গিয়েছিল। অজান্তেই মাথা নত হয়ে এসেছিল সেই সব বীর সেনাদের প্রতি, যাঁদের ত্যাগ, সাহস আর আত্মবলিদানের কারণেই আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়ে আজ নিশ্চিন্তে বেঁচে আছি। কিছু জায়গা শুধু দেখা হয় না, হৃদয়ে গেঁথে যায়—Hall of fame  দেখে মন বিষন্ন -ভারাক্রান্ত হলেও ভীষন গর্ব অনুভব করছিলাম, শ্রদ্ধায় মাথা নুইয়ে সবাই জয় হিন্দ বলতে বলতে গাড়িতে গিয়ে উঠলাম সঙ্গম স্থলের উদ্দেশ্যে...
🍂
যেতে যেতে দেখলাম রাস্তার দুপাশে পুরোটাই ভারতীয় সেনাবাহিনীর দখলে , ট্রেনিং সেন্টার, থাকার জায়গা, আরও কত কি,সে সব ফটো তোলা বারন, আমাদের ড্রাইভার প্রতি মুহূর্তে সেটা মনে করিয়ে দিচ্ছিল, আর যেটুকু তুলেছি বলে কোথাও শেয়ার করব না বাড়ির লোকজন কে দেখাবো শুধু। কথায় কথায় জানতে পারলাম এই টু্্যরিস্ট এর সিজন ছাড়া ওরা প্রায় সবাই বছরের বাকি সময় সেনাবাহিনীর গাড়ি চালায় ডিউটি করে। লেহ থেকে একেবারে উপরে সোমরিরী লেক পর্যন্ত ওই ৭ দিন যাওয়ার সময় দেখালো আগে কেমন ছিল আর এই গত দুবছরে গালওয়ান উপত্যকার গন্ডোগোলের পরে আরও কত কত নতুন বাঙ্কার বাড়াতে হয়েছে, প্রচুর প্রচুর সেনা মোতায়েন হয়েছে।
সত্যি তাই!! যেদিকে তাকাই চারিদিকে সেনা, দোকান-রাস্তা সব, সব কিছু পরিচালনা করছে, কথা বলতে বলতে হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে করমা ভাইয়া বলল বামদিকে তাকিয়ে দেখ!! বিস্মিত চোখের সামনে ওই যে নীচে সঙ্গমস্থল!! কবেকার সিন্ধু নদ জঁস্কারের সাথে দেশ কাল ভেদ করে সবেগে বয়ে চলেছে , বেশ কিছু ক্ষন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি আপন ছন্দে বয়ে চলা দুই নদীর দিকে , করমা ভাই বলল এ কিছু নয় সামনে আরও চমক!! এগিয়ে গেলাম আরে এ কি!! কত গুলো গাড়ি জাস্ট স্টার্ট বন্ধ করে এটা কি করছে, ও হো; এই সেই বিখ্যাত magnetic hill point !! এটা নাকি একটা mysterious স্থান , এখানে নিজের গাড়ি কে nutral e রাখলেও গাড়ি নিজের মতো এগিয়ে যায় constant speed এ। তো আমাদের ও laws of gravity এর সেই অভিজ্ঞতা হলো।
এবার গাড়ি কিছুটা গিয়ে বাঁক নিতেই একেবারে চোখের সামনে জঁস্কার নদী। গাড়ি পার্ক করে সবাই নেমে গেলাম, নদীর এক দিকে ভারতীয় সেনাবাহিনী রাফ্টিং ট্রেনিং চলছে, অদূরে আমাদের মতো পর্যটকদের ভিড়, এখানে সবাই মন ভরে ফটোগ্রাফি ও চা, কোল্ডডিংক্স, ম্যাগি, পকোড়া এসব নিয়ে নদীর তীরে বসে উপভোগ করছে।
সিন্ধু এবং জঁস্কার নদের সঙ্গম স্থল

হঠাৎ মুহূর্তের মধ্যে উঠলো ধূলোর ঝড়!!! কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছি না, নাকে চোখে মুখে তীব্রভাবে বাতাসের সাথে ধূলো এসে ঢুকছে। সবাই নিজেদের মতো গাড়ীর মধ্যে ঢুকে পড়বে বলে ছুটছে, কিন্তু গাড়ি খুঁজে পেলে তো পার্কিং লটে গিয়ে, উফস!! সাঙ্ঘাতিক অবস্থা।
একটা সময় দূর থেকে দেখলাম হাত নেড়ে করমা ভাইয়া ডাকছে এদিকে এদিকে, কোনরকমে গিয়ে গাড়ির মধ্যে ঢুকে আগে কাঁচ তুলে স্বস্তি! জানালো একটু সময়ের জন্য এখানে এরকম হঠাৎ হঠাৎ ধূলোর ঝড় ওঠে, আবার পরক্ষনেই ফাঁকা হয়ে যায়।
পাহাড়ের মাথায় সেনাবাহিনী পরিচালিত গুরুদ্বারা

যাইহোক হাওয়ার গতির সাথেই আমাদের গাড়ি এগোতে লাগলো, দুপুরের খাবার কোথায় খাব নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছি, করমা ভাই বলল ফেরার পথে পাথ্বর সাব গুরুদোয়ারা পড়বে ওটা দর্শন করে লেহ তে ফিরে গিয়ে একেবারে lunch করবেন। আমরাও তাই মেনে নিলাম। আমরা মানে আমি , বাকি দুজন সিনিয়র তো একজন ক্রমাগত ফোন এ মিটিং, আর একজন ওই ধুলোর ঝড়ে আমার সবচেয়ে ফিরতে কেন দেরি হলো সেটা নিয়ে বকুনি দিয়েই চলছিল, ধূর ওসব কে কবে গায়ে মাখে, বেড়াতে বেরিয়ে কে নিয়ম মানে! ভুল করলে হয় চুপ করে থাক; নয়তো আদি অকৃত্রিম আমাদের যেটা করনীয় উল্টে ঝাড় দিয়ে দাও।
আবার আমাদের লেহ - কার্গিল হাইওয়ে ধরে ফেরা, কিছুটা এগিয়ে এসে রাস্তার বামদিকে গুরুদোয়ারা তে গাড়ি থামলো। পাহাড়ের মাথায় অতি সুন্দর গুরুদোয়ারা এটাও ভারতীয় সেনাদের দ্বারা পরিচালিত, সেনারাই রান্না করছেন, ওঁরাই পরিবেশন করছেন যত্ন করে সবাই খাচ্ছে কিনা। প্রথমে জুতো মোজা খুলে পরিখার জলে পা ধুয়ে নারী - পুরুষ সবাই কে মাথায় কাপড় বেঁধে ( সব গুরুদোয়ারার যা নিয়ম) পরিষ্কার হল ঘরের মধ্যে সারি সারি আসন পাতা। পরিচ্ছন্ন নিরামিষ খাওয়ার খেলাম আমরা তারপর কয়েকটি সিঁড়ি বেয়ে উপরে গুরূ নানক দেবের তীর্থ দর্শন করলাম, খুব ঠাণ্ডা ছিল, পিছনে পাহাড়ের মাথায় ততক্ষণে মেঘ নেমে আসতে দেখলাম ।
ক্রমশ:

Post a Comment

0 Comments