দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ২৪শে জুলাই, আন্তর্জাতিক স্ব-যত্ন দিবস,স্ব-যত্ন কি, আমাদের জীবনের এর গুরুত্ব কি, আসুন সবকিছুই বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
নিজের যত্ন, সুস্থ জীবনের প্রথম পদক্ষেপ। ‘স্ব-যত্ন’ শব্দটি শুনলে অনেকের মনে হয়, এটি হয়তো কেবল নিজের আরাম, সৌন্দর্য বা অবসর কাটানোর বিষয়। কিন্তু প্রকৃত অর্থে স্ব-যত্ন তার চেয়ে অনেক গভীর ও বিস্তৃত। নিজের শারীরিক, মানসিক, আবেগিক এবং সামাজিক সুস্থতার প্রতি সচেতন থাকা এবং নিজের ভালো থাকার জন্য দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়াই স্ব-যত্ন।
আধুনিক জীবনে মানুষ নানা ধরনের ব্যস্ততা, দায়িত্ব, প্রতিযোগিতা ও চাপের মধ্যে দিন কাটায়। পড়াশোনা, চাকরি, পরিবার, অর্থনৈতিক চিন্তা, সামাজিক সম্পর্ক সবকিছুর ভার সামলাতে গিয়ে আমরা অনেক সময় নিজের কথা ভুলে যাই। অন্যের যত্ন নিতে গিয়ে নিজের বিশ্রাম, আনন্দ, মানসিক শান্তি কিংবা শারীরিক সুস্থতাকে অবহেলা করি। আন্তর্জাতিক স্ব-যত্ন দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নিজের যত্ন নেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়, এটি সুস্থ ও সুন্দর জীবনের অপরিহার্য অংশ।
🍂
স্ব-যত্নের প্রথম ধাপ হলো, নিজের শরীরের প্রতি যত্নশীল হওয়া। সুষম খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, এসবই স্ব-যত্নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সুস্থ থাকার জন্য সবসময় কঠিন নিয়ম বা ব্যয়বহুল ব্যবস্থা প্রয়োজন হয় না। প্রতিদিন সময়মতো খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত জল পান করা, কিছুটা হাঁটা এবং নিয়মিত বিশ্রাম নেওয়ার মতো ছোট অভ্যাসও জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে স্ব-যত্ন শুধু শরীরের যত্নে সীমাবদ্ধ নয়। মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মন খারাপ হলে তা অস্বীকার না করে নিজের অনুভূতিকে বোঝার চেষ্টা করা দরকার। সব সময় শক্ত থাকার ভান করা বা নিজের কষ্ট চেপে রাখা কোনো সমাধান নয়। বিশ্বস্ত বন্ধু, পরিবারের সদস্য বা উপযুক্ত পেশাদারের সঙ্গে কথা বলা অনেক সময় মনকে হালকা করতে পারে। নিজের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া দুর্বলতার লক্ষণ নয়, বরং এটি আত্মসচেতনতার পরিচয়।
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে, কিন্তু অতিরিক্ত পর্দা-নির্ভরতা, অনবরত নোটিফিকেশন এবং অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করার প্রবণতা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। তাই মাঝে, মাঝে প্রযুক্তি থেকে বিরতি নেওয়া, প্রকৃতির কাছে সময় কাটানো, বই পড়া, গান শোনা, ছবি আঁকা বা নিজের পছন্দের কোনো সৃজনশীল কাজে যুক্ত হওয়াও স্ব-যত্নের অংশ হতে পারে।
স্ব-যত্নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘না’ বলতে শেখা। অনেক সময় অন্যকে খুশি করার জন্য আমরা নিজের সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব গ্রহণ করি। ফলে ক্লান্তি, বিরক্তি ও মানসিক চাপ বাড়তে থাকে। নিজের সময়, শক্তি ও সীমাবদ্ধতাকে সম্মান করা অত্যন্ত জরুরি। সব অনুরোধ গ্রহণ করা সম্ভব নয়, এটি স্বীকার করা আত্মকেন্দ্রিকতা নয়, বরং নিজের প্রতি দায়িত্বশীলতা। স্ব-যত্নের সঙ্গে আত্মসম্মানেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। নিজের ভুলকে স্বীকার করা যেমন জরুরি, তেমনই নিজের সাফল্যকেও মূল্য দেওয়া দরকার। আমরা প্রায়ই নিজেদের ভুলের জন্য কঠোরভাবে বিচার করি, কিন্তু ভালো কাজের জন্য নিজেকে প্রশংসা করতে ভুলে যাই। অথচ আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে নিজের প্রচেষ্টা ও অগ্রগতিকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে।
শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রেও স্ব-যত্নের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পড়াশোনার পাশাপাশি পর্যাপ্ত বিশ্রাম, খেলাধুলা, সৃজনশীলতা এবং বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ তাদের সুস্থ বিকাশে সহায়তা করে। শুধু ভালো ফলাফল নয়, তাদের অনুভূতি, আগ্রহ ও মানসিক সুস্থতার প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। একইভাবে কর্মজীবী মানুষদেরও কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করতে হবে।
আন্তর্জাতিক স্ব-যত্ন দিবসের বিশেষ তাৎপর্য হলো, স্ব-যত্ন এমন একটি অভ্যাস, যা প্রতিদিনের জীবনে পালন করা যায়। এটি কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি, বয়স বা পেশার মানুষের জন্য নয়। একজন শিক্ষার্থী নিজের পড়াশোনার সময়সূচির মধ্যে বিশ্রামের সময় রাখতে পারে। একজন কর্মজীবী মানুষ কাজের চাপের মধ্যেও নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করতে পারেন। একজন গৃহিণী বা পরিবারের প্রবীণ সদস্যও নিজের পছন্দের কাজ, বিশ্রাম ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে নিজের যত্ন নিতে পারেন।
তবে স্ব-যত্নকে কখনোই স্বার্থপরতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। নিজের যত্ন নেওয়া মানে অন্যের প্রতি দায়িত্ব ভুলে যাওয়া নয়। বরং নিজের শরীর ও মন সুস্থ থাকলে আমরা পরিবার, সমাজ ও কর্মক্ষেত্রের প্রতি আরও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারি। যে মানুষ নিজে ভালো থাকার চেষ্টা করেন, তিনি অন্যের ভালো থাকাকেও আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন।
স্ব-যত্নের জন্য বড় কোনো পরিবর্তনের অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। আজ থেকেই কিছু ছোট অভ্যাস শুরু করা যায়, সময়মতো ঘুমানো, নিয়মিত খাবার খাওয়া, কিছুক্ষণ নীরবে থাকা, প্রিয় মানুষের সঙ্গে কথা বলা, নিজের অনুভূতি লিখে রাখা কিংবা প্রতিদিন নিজের জন্য কিছুটা সময় রাখা। ছোট, ছোট এই অভ্যাসই ধীরে, ধীরে একটি সুস্থ জীবনযাপনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক স্ব-যত্ন দিবস তাই কেবল একটি দিবস উদযাপনের উপলক্ষ নয়, এটি নিজের জীবনের প্রতি নতুন করে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান। অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে আমরা যেন নিজেদের হারিয়ে না ফেলি। নিজের শরীর, মন, সময় ও অনুভূতির প্রতি যত্নশীল হওয়া আমাদের অধিকার এবং দায়িত্ব দুটিই।
মনে রাখা দরকার, নিজের যত্ন নেওয়া মানে জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং জীবনকে আরও সুন্দরভাবে বাঁচার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। তাই ২৪শে জুলাই আন্তর্জাতিক স্ব-যত্ন দিবসে আমরা প্রতিজ্ঞা করতে পারি, অন্যের যত্নের পাশাপাশি নিজের যত্নকেও সমান গুরুত্ব দেব। কারণ সুস্থ ব্যক্তি, সুস্থ পরিবার এবং সুস্থ সমাজ গড়ে ওঠে এমন মানুষদের হাতেই, যারা নিজেদের ভালো থাকাকেও জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন।
2 Comments
এই বিষয়টা জানতামই না। ধন্যবাদ আপনাকে।
ReplyDeleteভীষণ ভীষণ ভালো লেগেছে বন্ধু।
ReplyDelete