খর্জুর বীথির ধারে--১১/মলয় সরকার

খর্জুর বীথির ধারে

মলয় সরকার
(১১শ পর্ব ) একাদশ পর্ব


চলেছি মরুভূমির মাঝখান দিয়ে । এপাশ ওপাশ যেদিকেই তাকাই ধূ ধূ লাল বালির মরুভূমি, বিচ্ছিন্ন ভাবে কিছু ছোট ছোট ক্ষয়ে যাওয়া পাহাড় , কিছু ছোট ঝোপ আর কিছু পর্যটক। আকাশে রোদ ঝলসাচ্ছে। তাতে মরুভূমির রুক্ষ সৌন্দর্য্য আরও যেন বেশি করে হৃদয়ে গেঁথে যাচ্ছে।

লাল মরুভূমির পথে যেতে যেতে আমাদের গাড়ী থামল এক জায়গায়। দেখি আশে পাশে শুকনো কাঠির মত অনেক ঝোপ হয়ে আছে। এরকম অবশ্য ছোটখাট ঝোপ রাস্তায় আগেও দেখেছি। ওরা একটা ঝোপের কাছে নিয়ে গিয়ে, হাত দিয়ে কাঠির মত  কয়েকটা ডাল ভেঙ্গে দেখাল, তার থেকে আঠাল দুধের মত রস বের হচ্ছে। গাইড বলল, এটার রস আমরা সাবান হিসাবে ব্যবহার করি। আমার হাতেও দিল । আমি ঘসে দেখি সাবানের মত ফেনা হচ্ছে। ও বলল, এই গাছ ও অন্য ঝোপ ঝাড় যা দেখছেন, সেগুলির মধ্যে কিছু গাছ উটেরা খায়, কিছু ওষুধ হিসাবে আমরা ব্যবহার করি । তবে এই গাছগুলো মরুভূমির সম্পদ। কারণ এগুলো মরুভূমির বালিকে আটকে রাখে ঝড়ের থেকে। এদেরই মরুভূমির প্রাণ বলতে পারেন, যেমন সমতল ভূমিতে ঘাস অনেক ভূমিক্ষয় রোধ করে। এগুলো আমাদের উটের খাবার হিসাবে ব্যবহার ছাড়াও, মরে গেলে আমাদের জ্বালানী হিসাবে ব্যবহার হয়। কাজেই এই ঝোপগুলো আমাদেরর কাছে খুবই দামী। বুঝলাম, প্রকৃতির মানুষই আসলে প্রকৃতির দাম বোঝে। আমরা শহুরেরা নির্দ্বিধায় বিভিন্ন প্ররোচনায়, সাময়িক লাভের জন্য প্রকৃতিকে ধ্বংস করে চলেছি নির্দ্বিধায়।.
পরে দেখলাম, এই গাছগুলো, যা ও দেখাল, তার নাম  Anabasis articulate । এছাড়া পাওয়া যায়, Retama raetam, Haloxylon persicum ইত্যাদি নানা ধরণের ঝোপজাতীয় গাছ।   

সূর্য মাথার উপরে। এই সব দেখতে দেখতে কখন যে বেলা গড়িয়েছে বুঝতে পারি নি। ওরা বলল, চলুন এবার একটু গলা ভিজিয়ে নেবেন। অনেকক্ষণ ঘুরেছেন।
বললাম, চল যাই–

আমরা পৌছালাম, একটা বড় তাঁবু খাটানো দোকানের কাছে। এখানে ওরা যে তাঁবুগুলো খাটায় সেগুলো বেশিরভাগই কোন পাহাড়ের আড়ালে খাটায় । এখানে পাকা বাড়ি ঘর কিছুই দেখছি না। সবটাই তাঁবুর ঘর বাড়ি।আর ,পাহাড়ের আড়ালে এগুলো যে হয়, সেটা হল দুটো কারণে। প্রথমতঃ সূর্যের আলো বেশি না লাগায়, একটু ঠাণ্ডা থাকবে। দ্বিতীয়তঃ মরুঝড়ের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য।

আসতে আসতে রাস্তায়, মাঝে মাঝে অনেক তাঁবু দেখেছি। এই তাঁবু গুলো কিন্তু , তাঁবু বলতে আমাদের মনে যেমন ছবি আসে, সেরকম নয়। এর ধরণটা হল, একটা টিনের চালের ঘরকে পুরোটাই যদি আমরা সুদৃশ্য রঙিন ত্রিপলে ঢেকে দিই বা সেটা দিয়েই পুরোটা তৈরী, ভাবি, তাহলে যেমন দেখতে হয়, তেমনই।ওরা বলে, ওদের তাঁবু ছাগলের চামড়ার।কিন্তু আমার মনে হল, লোমশ কম্বলের মত কোন মোটা চাদর দিয়েই ওগুলোর আচ্ছাদন বা দেওয়াল। ভিতরে ঢুকে, প্রায় বোঝা যায় না যে,  তাঁবুর ভিতরে আছি। ভিতরে মোটা চাদরে একেবারে মোড়া। মেঝেতে বেশির ভাগই লাল মোটা কার্পেট পাতা। অনেকের ভিতরটা এতই সুসজ্জিত যে, যে কোন রাজবাড়ির সৌন্দর্য্যকেও হার মানাবে।আর তাঁবু গুলো বাইরে থেকে সব একরকম, বটল গ্রীন ও সাদায় ডোরা দেওয়া রঙ। খুব টাইট করে বাঁধা। কোথাও এতটুকু বাঁকাচোরা নেই। দেখে বোঝার উপায় নেই, ওগুলো আসলে তাঁবু। 
যে দোকানটিতে এলাম, সেটিও সে রকমই বেশ একটি বড় তাঁবু, অনেকটা খোলা। ভিতরটা সুন্দর আকর্ষণীয় করে সাজানো। অনেক পর্যটকই বসে কিছু টিফিন, চা, কফি, ঠাণ্ডা পানীয় ইত্যাদি খাচ্ছেন। আমরাও বসে কিছু খেয়ে নিলাম। 

এরা বেশ চটপটে। ওরা জানে যে, পর্যটকরা এখানে আড্ডা মারতে আসেন নি, তাঁদের সময় অনেক দামী। তাঁরা ঘুরতে এসেছেন, সময় নষ্ট করতে নয়। কাজেই চটপট তাদের বিক্রী করতে পারলেই লাভ।একেবারে মেসিনের মত সবাইকে হাসি মুখে আপ্যায়ণ করে যাচ্ছে।

দোকানের বাইরে, একটি  বাচ্চা ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল, ওই ভিক্ষুক শ্রেণীর। চারপাশে উটের দল বিশ্রাম নিচ্ছে বসে বা দাঁড়িয়ে। ছেলেটি এগিয়ে এসে আমাদের দিকে সকরুণ দৃষ্টিতে তাকাল। বুঝলাম কিছু খেতে চাইছে। দোকানীকে বললাম, ওকে কিছু দিতে।

খাবার হাতে পেতেই ওর চোখদুটো আনন্দে চকচক করে উঠল। ও কৃতজ্ঞতাস্বরূপ বলল, আসুন একটা জিনিস দেখাচ্ছি। এই বলে ও একটি বড় পাথরের কাছে নিয়ে গেল। সেখানে দেখি পাথরের গায়ে একটি খোদাই করা মানুষের মুখ রয়েছে। মুখটা বেশ চেনা চেনা লাগল।ও বলল, এটা জর্ডনের রাষ্ট্রপ্রধান রাজা দ্বিতীয় আবদুল্লার মুখ। বেশ সুন্দর করেছে শিল্পী।এটি আধুনিক শিল্প কর্ম। ছেলেটি এটি দেখিয়ে একটা আত্মতৃপ্তি লাভ করল মনে হল। যেন একটা অনেক বড় কাজ করেছে এরকম উজ্বল মুখ নিয়ে নানা কথা বলতে লাগল। আমি ওর চোখের মধ্যে দিয়ে  দেখতে পেলাম, আমার দেশের গাঁয়ের নিষ্পাপ অপু দুর্গার মুখ, পেট্রার সেই বালকগুলোর মুখ কিংবা সারা পৃথিবীর সমস্ত শিশুর ছবি। আমার কাছে সব একাকার হয়ে গেল।

ওর হাতে আবার কিছু খুচরো পয়সা দিলাম। ও নাচতে নাচতে চলে গেল। সত্যি, শিশুরা কত সরলই হয়! শুধু তাই নয়, নতুন করে যেন বুঝলাম, সত্যি আনন্দ পাওয়া কতই সহজ। সুন্দরের দেবতা বোধ হয় এদের মধ্যেই মন্দির করে বাস করেন।

এখান থেকে বেরিয়ে গাইড একটু হেঁটে সামনেই নিয়ে গিয়ে পাহাড় গুলোর নানা আকৃতির বৈচিত্র্য দেখাচ্ছিল। আমি মোহিত হয়ে ছবি তুলতে তুলতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলাম। প্রতিটা ছবিই তো সুন্দর, কত তুলব। হঠাৎ দেখি সামনে বিরাট খাদ। বুঝলাম আমরা আছি একটা অনেক উঁচু পাহাড়ের মাথায়। এমনই খাদ যে, তার কোন ঘেরা নেই। কেউ অজান্তে এগিয়ে গেলে তাকে আর নীচে পর্যন্ত পৌঁছাতে হবেনা।একেবারে নীচে না পড়ে, পড়তে পড়তেই  সে উপরে উঠে যাবে! 

আমরা এখান থেকে বেরিয়ে, গেলাম একটা জায়গায় । কিছু ভাঙ্গা ধ্বংসাবশেষ বলে মনে হল।বেশ মোটা মোটা পাথর জোড়া দিয়ে  থাম, দেওয়াল ,চত্বর ইত্যাদি রয়েছে।হলুদ বেলে পাথরের পাহাড়ের গায়ে এই ধ্বংসাবশেষকে দেখিয়ে ওরা বলল, এটি নাবাতিয়াদের মন্দির ছিল। এটি শুনলাম, ১৯৩০ সালে খুঁড়ে আবিস্কৃত হয়েছে। এটি নাকি তাদের দেবতা আলাত এর উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল।এর গায়ে প্রথম বা তৃতীয় শতাব্দীতেও লেখা কিছু লিপি পাওয়া গেছে।অর্থাৎ সেই সময়েও এটি চালু মন্দির ছিল। এই মরুভূমির মধ্যেও তাহলে কত উন্নত সভ্যতা ছিল, যারা এমন মন্দির তৈরি করেছিল বা লিখতে পড়তে জানত, সেটা ভেবেই আশ্চর্য লাগছিল।
এবার ওরা ফেরত নিয়ে এল, আবার সেই তাঁবুতে। যেখান থেকে আরম্ভ করেছিলাম যাত্রা। রাস্তায় আসতে আসতে এখানে ওখানে দাঁড়িয়ে অনেক কিছু দেখাচ্ছিল ওরা। একটা যেন ঘোরের মধ্যে ঘুরছিলাম।এত লালের মধ্যে ,একটা সত্যিকারের মরুভূমির মধ্যে, সত্যি বেদুইনদের সঙ্গে ঘুরছি, এই ভাবনাই আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। 

তাঁবুতে ফিরে আসতেই ওরা আমাদের বসাল আদর করে পাশের একটি তাঁবুতে, সেটি বেশ লম্বা, সামনেটা খোলা , সাজানো এবং অনেক চেয়ার টেবিল পাতা। আমরা বসলাম, দুটো চেয়ার সহ একটা টেবিলে। একটু পরেই এল নানা রকমের খাবার। কোনটা যে কি খাবার, সঠিক জানি না। তবে মনে হল, মিশ্র ডিস। কারণ এখানে তো সব ধরণের মানুষ আসবেন, তাই খাবারও মিশ্র। সবার যাতে ভাল লাগবে তেমন খাবার হওয়াই স্বাভাবিক।কিছু শাকপাতা, দই জাতীয় কিছু, এছাড়া কিছু মাংস তো ছিলই। এখানেও সেই রকম প্রচুর ব্রেডের টুকরো দিয়েছিল। এত খাবার খেতে পারি নি। তবে ওদের আন্তরিকতায় আমরা মুগ্ধ। আমি বইতে পড়েছিলাম, বেদুইনরা খুব আন্তরিক ও অতিথি পরায়ণ। কথাটা যে বর্ণে বর্ণে সত্যি, তার প্রমাণ পেলাম। আমরা ওখান থেকে চলে এসেছি সত্যি, কিন্তু ঐ রুক্ষ মরুভূমির মাঝেও যে আন্তরিকতার মনন রসসিক্ত মনগুলো কি করে মরুদ্যানের মত বেঁচে আছে তাই ভাবি। তাই মেলাতে চেষ্টা করি, এই জন্যই কি আরব সাকীদের আতিথ্যের কথা খৈয়ামের কবিতার পাতায় পাতায় ছত্রে ছত্রে? হবেও বা–

আমরা বললাম। রিয়াধ আমাদের ডেড সী দেখাবে না? বলল, চলুন স্যর। এগিয়ে চলল, গাড়ী।

যেতে যেতে রাস্তার পাশে পাশে দেখি হয়ে আছে খেজুর গাছ। গাছের সারি একেবারে। তবে আমার দেখা গ্রামের পথে বা বাংলা দেশের যে খেজুর গাছের রস খাই, সে খেজুর গাছের সঙ্গে এই খেজুরের গাছেরও অনেক তফাত।একটু স্থুলাঙ্গী, মাথায় ভর্তি পাতা। গাছ ভর্তি পাকা কালো খেজুরের কাঁদি  ভর্তি। এমন কি অনেক পাকা খেজুর গাছ থেকে পড়ে মাটিতে , কিছু রাস্তাতেও গাড়ির চাকার তলায় পিষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে।আর খেজুরের কি সাইজ! জীবনে দেখি নি এত বড় বড় খেজুর, গাছে হয়ে রয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় সারি সারি করে খেজুর গাছের চাষ হয়েছে মাঠের পর মাঠ ভর্তি।
চলুন এরপর জানব এখানকার খেজুরের বিশেষত্ব—
ক্রমশঃ-

পেজে লাইক দিন👇

Comments

Trending Posts

ড. সুকুমার মাইতি (গবেষক, শিক্ষক, প্রত্ন সংগ্রাহক, খড়গপুর)/ভাস্করব্রত পতি

‘পথের পাঁচালী’ এবং সত্যজিৎ রায় : একটি আলোচনা/কোয়েলিয়া বিশ্বাস

রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি পরিষদ (NAAC) এর মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি: উদ্দেশ্য ও প্রস্তুতি - কলেজ ভিত্তিক অভিজ্ঞতা /সজল কুমার মাইতি

প্রাচীন বাংলার জনপদ /প্রসূন কাঞ্জিলাল

খাঁদারাণী, তালবেড়িয়া, মুকুটমণিপুর ড্যামের নির্জনতা ও 'পোড়া' পাহাড়ের গা ছমছমে গুহা /সূর্যকান্ত মাহাতো

বাংলা ব্যাকরণ ও বিতর্কপর্ব ১৮/অসীম ভুঁইয়া

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ১১০

সুন্দরবনের উপর গুচ্ছ কবিতা/ওয়াহিদা খাতুন