বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১৩১
শুসনি শাক
ভাস্করব্রত পতি
ঋকবেদের ১/৫৮/৩ সুক্ততে পাই - 'নিষণ্নং দৌভিদে সুখং যমকং'। আবার কোনও কোনও ভাষ্যকার লিখেছেন -- 'বর্ষাসু যমকং পত্রং নিষণ্নং শাকং সুখং স্বপ্নং স্বাপয়তি' -- অর্থাৎ বর্ষাকালের যমকপত্র নিষণ্ন শাক সুখনিদ্রা আনে। জ্যোতিষের অঙ্কশাস্ত্র 'লীলাবতী'তেও উল্লেখ করা হয়েছে যে এই যমকপত্র নিষণ্ন মনকে সুষুপ্তিতে পৌঁছে দেয়। নিষণ্ন শব্দের অর্থ অবসাদক। পরবর্তীতে এই নিষণ্ন শাকই পরিচিত হয়েছে 'সুনিষণ্নক' [সু নিষণ্ন (নিদ্রা) যাহা দ্বারা, বহুব্রীহি সমাস] নামে। এর অর্থ যার দ্বারা নিদ্রা গাঢ় হয়। এটিই আমাদের গ্রামাঞ্চলের অতি পরিচিত এবং উপাদেয় শুসনি শাক।
গ্রামের মানুষের কাছে এটি অতি উপাদেয় এবং সহজলভ্য জলজ উদ্ভিদ। সর্বত্র মেলে। বিশেষ করে বর্ষাকালে এর প্রাধান্য এবং দর্শন বেশি মাত্রায় দেখা যায়। শহুরে মানুষের জন্যেও ইদানীং এটি হাজির থাকে হাটবাজারে। ভারত, চিন, ভিয়েতনাম, জাপান, বাংলাদেশ ছাড়াও এই শুসনিশাকের গতিবিধি পরিলক্ষিত হয় আফগানিস্তান, দক্ষিণ ইউরোপ, পশ্চিম সাইবেরিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এলাকাতেও। শুসনি শাক সেদ্ধ আর পান্তা ভাত -- জবাব নেই রসনাপ্রিয় বাঙালিদের কাছে।
ভেজা মাটিতে হয়ে আছে শুসনি শাক
শুসনি হল জলজ ফার্ণ জাতীয় উদ্ভিদ। গ্রামের সর্বত্র জন্মায়। বিশেষ করে পুকুরের পাড়ে, ভিজে জমিতে এবং ধানক্ষেতে। চাষীদের কাছে এটি অবশ্য অনাবশ্যক আগাছা। তাই ধানের জমিতে জন্মালে তাঁরা অতি দ্রুত শুসনি গাছ উপড়ে ফেলে দেন। কেননা, এরা ধানজমিতে ব্যবহৃত সারের প্রকোপে অতি দ্রুত বেড়ে ওঠে। কিন্তু ধানগাছের বৃদ্ধি হয়না তখন। কোনোরকম যত্নের তোয়াক্কা করেনা শুসনি শাক। তবে ইদানিং অবশ্য বহু মানুষ তাঁদের পোড়ো জমিতে বানিজ্যিকভাবে চাষ করছে।
বস্তাভর্তি শুসনি শাক
শুসনি হল Marsileaceae পরিবারের অন্তর্গত। এর দ্বিপদী নাম Marsilea quadrifolia এবং Marsilea minuta। শুসনির পাতা যৌগিক প্রকৃতির। এর পত্রবৃন্তের ডোগায় একটি নির্দিষ্ট বিন্দু থেকে চারদিকে চারটি সমান আকৃতির পত্রক জন্মায়। তাই এর বিজ্ঞানসম্মত নামের ক্ষেত্রে species এর নামকরণে quadrifolia শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। বাংলায় বলে চতুষ্পত্রী। এর এই বৈশিষ্ট্যপূর্ণ চারটি পত্রকের দরুন ইংরেজিতে বলে Four Leaf Clover। মার্কিনীরা বলে European Waterclover। এদের পত্রবৃন্ত নালটি ৭-৮ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। ফার্ন গাছের মত এদের কোনও ফুল বা ফল হয় না। রেনুর মাধ্যমেই এরা বংশবিস্তার করে। শীতের সময় এদের বীজ (Spore) হয়।
রাশি রাশি শুসনি শাক জন্মেছে....
গ্রামাঞ্চলে এর নাম ঘুম শাক। কেননা, একে খেলে বেশ ঘুম ঘুম আমেজ আসে। শুসনিকে সংস্কৃতে সুনিষণ্ণক, শিতাবরী, শিখী, ওড়িয়াতে সুনসুনিয়া, হিন্দিতে শিবিয়ারী, চৌপতিয়া (সংস্কৃত চতুষ্পত্রী থেকে এসেছে চৌপতিয়া), মারাঠিতে কুরডু, গুজরাটিতে ওটিশন, কন্নড়ে খণ্ডকাতরা, তামিলে আলাইক কিরাই বলে। এছাড়াও শুসনির নামকরণ করা হয়েছে শিতাবরী, শিতাবর, সূচ্যাহ্ব, সুচিপত্রক, শিখী, বহু, কুরুট, মেধাকৃৎ (একে বলা হয়ে থাকে মেধাকৃৎ। অর্থাৎ মেধাজনক), কুক্কুট ইত্যাদি নামেও।
ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে শুসনি শাক
অঞ্চলভেদে শুষনি শাকের আরও বিভিন্ন নাম রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত নামগুলো হলো— শুনশুনি, শুনশুনিয়া এবং শুশুনি শাক। এছাড়া কোনো কোনো এলাকায় এটিকে আবুল ঘাস বলেও ডাকা হয়। প্রাচীন মনীষীদের ভাষ্যে পাই 'সুনিষণ্নো হিমগ্রাহী মোহদোষত্রয়াপহঃ'। অর্থাৎ এটি স্নিগ্ধকর, মল সংগ্রাহক, ত্রিদোষ জনিত মোহঅপহরণকারী।
শুসনির মধ্যে রয়েছে Ketonic Constituents যেমন Marsiline, 3 Hydroxytriacontane, Alcoholic Constituents যেমন Hentriacontan 16-01, Sterile যেমন Betasitosterol, Mythylamine, Saponin ইত্যাদি। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের কাছে শুষনি গুরুত্ব প্রচুর। শ্বাসজনিত রোগ হাঁপানি, স্বল্প মেধা, প্রস্রাবে জ্বালা, অনিদ্রা, রক্তপিত্ত, শরীরের প্রদাহ, উচ্চরক্তচাপ, রমণে শৈথিল্য, বিস্মৃতি, বিষাক্ত কীটপতঙ্গের দংশনের নিরাময়ে শুষনির ভূমিকা বেশ। ড. হরিসাধন গোস্বামীর কবিতায় পাই এই শুসনিশাকের অনুষঙ্গ --
'শুসনি কলমি গিমা শাক
গেঁড়ি গুগলি কাঁকড়া কুচো মাছ
মাঝে মাঝে হরিমটর
নিষ্ফলা নির্জলা সারা দিনমান
রাত্রির বাতাস কী ভীষণ ভারী'!
0 Comments