তারাশংকর দে
স্বপ্ন মানুষের সবচেয়ে প্রাচীন আশ্রয়গুলোর একটি। পৃথিবীতে ভাষা জন্ম নেওয়ারও আগে মানুষ নিশ্চয়ই স্বপ্ন দেখত। আগুন আবিষ্কারের আগে, চাকার জন্মের আগে, সভ্যতার প্রথম ইট গাঁথারও আগে—মানুষ ঘুমিয়ে দেখেছে অদ্ভুত দৃশ্য, আর জেগে দেখেছে অসম্ভবকে সম্ভব করার আকাঙ্ক্ষা। তাই স্বপ্নকে কেবল রাতের বিষয় বললে ভুল হবে। স্বপ্ন ঘুমেরও, জাগরণেরও; অবচেতনেরও, সংকল্পেরও।
স্বপ্নের দুটি মুখ। একটি আমাদের ঘুমের ভেতরে নিয়ে যায়, অন্যটি আমাদের ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। প্রথমটি রহস্যের, দ্বিতীয়টি ভবিষ্যতের। একটি মনে করিয়ে দেয় আমরা কত অজানা, অন্যটি শেখায় আমরা কত দূর যেতে পারি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন—
"চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির..."
এটি নিছক প্রার্থনা নয়; এটি এক জাগ্রত স্বপ্নের ভাষা। এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন, যেখানে মানুষের মন মুক্ত হবে, জ্ঞান অবাধ হবে, সংকীর্ণতার দেয়াল ভেঙে যাবে। অর্থাৎ স্বপ্ন কখনও ব্যক্তিগত নয়; কখনও কখনও একটি জাতিরও হয়।
ঘুমের স্বপ্ন নিয়ে বিজ্ঞানীরা বহু কথা বলেছেন। সিগমুন্ড ফ্রয়েড মনে করতেন, স্বপ্ন অবদমিত ইচ্ছার সাংকেতিক প্রকাশ। কার্ল ইউং বলেছিলেন, স্বপ্ন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বাইরে মানবজাতির সম্মিলিত অবচেতন স্মৃতিও বহন করে। আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান জানায়, ঘুমের বিশেষ পর্যায়ে মস্তিষ্ক স্মৃতি গুছিয়ে রাখে, আবেগকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করে। ফলে স্বপ্ন কখনও বিশৃঙ্খল, কখনও ভবিষ্যদ্বাণীর মতো মনে হলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা আমাদের মস্তিষ্কের নিজস্ব ভাষা।
🍂
কিন্তু মানুষ কি শুধু ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে?
না। বরং সভ্যতার সমস্ত বড় পরিবর্তন জেগে দেখা স্বপ্নের ফল। যে কৃষক অনাবৃষ্টির মধ্যেও বীজ বুনে, সে স্বপ্ন দেখে। যে বিজ্ঞানী হাজারবার ব্যর্থ হয়ে আবার পরীক্ষাগারে ফেরেন, তিনিও স্বপ্ন দেখেন। যে কবি অন্ধকার সময়েও মানুষের পক্ষে একটি শব্দ লিখে রাখেন, তাঁর কলমও স্বপ্নেরই অন্য নাম।
আমেরিকার কবি ল্যাংস্টন হিউজ লিখেছিলেন—
"Hold fast to dreams,
For if dreams die,
Life is a broken-winged bird
That cannot fly."
স্বপ্নকে শক্ত করে ধরে রাখো; কারণ স্বপ্ন মরে গেলে জীবন ডানা-ভাঙা পাখির মতো উড়তে পারে না। এই কয়েকটি পঙ্ক্তির মধ্যে মানুষের অস্তিত্বের এক গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। মানুষ রুটিতে বাঁচে, কিন্তু কেবল রুটিতে নয়; মানুষ ভবিষ্যতের কল্পনাতেও বাঁচে।
উইলিয়াম শেকসপিয়র The Tempest-এ লিখেছিলেন—
"We are such stuff
As dreams are made on."
আমরা সেই উপাদান দিয়েই গড়া, যা দিয়ে স্বপ্ন তৈরি হয়। কত আশ্চর্য উপলব্ধি! মানুষের জীবন, অহংকার, ক্ষমতা, দুঃখ—সবই ক্ষণস্থায়ী। তবু সেই ক্ষণস্থায়ীতেই আমরা অর্থ খুঁজি, ভালোবাসা খুঁজি, ভবিষ্যৎ নির্মাণ করি।
স্বপ্নেরও রং আছে। শিশুর স্বপ্ন রঙিন, তরুণের স্বপ্ন অস্থির, বৃদ্ধের স্বপ্ন অনেক সময় স্মৃতির রঙে ধূসর। কেউ বাড়ি বানানোর স্বপ্ন দেখে, কেউ একটি বই লেখার। কেউ ভালোবাসার, কেউ মুক্তির। আবার কেউ এমনও আছে, যে কেবল এক রাত নির্ভয়ে ঘুমোনোর স্বপ্ন দেখে। পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট স্বপ্নটিও তাই তুচ্ছ নয়।
জীবনানন্দ দাশের কবিতায় স্বপ্ন প্রায়ই বাস্তবের সঙ্গে মিশে যায়। তিনি লিখেছিলেন—
"আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে—এই বাংলায়।"
এটি কেবল ফিরে আসার ইচ্ছা নয়; এটি স্মৃতি, দেশ, প্রকৃতি ও মানুষের সঙ্গে পুনর্মিলনের এক স্বপ্ন। জীবনানন্দের স্বপ্ন তাই ব্যক্তিগত হলেও শেষ পর্যন্ত সমষ্টির হয়ে ওঠে।
কখনও কখনও স্বপ্ন আমাদের প্রতারণাও করে। আমরা যা চাই, তা-ই দেখি। আবার যা ভয় পাই, তাও দেখি। সেই জন্যই স্বপ্নের ভেতরে আনন্দ যেমন আছে, তেমনি বিষাদও। এমন মানুষও আছেন, যাঁদের স্বপ্ন বারবার ভেঙে যায়; তবু তাঁরা আবার নতুন স্বপ্ন দেখতে শেখেন। কারণ স্বপ্ন দেখা বন্ধ হয়ে গেলে মানুষ কেবল বেঁচে থাকে, জীবিত থাকে না।
এডগার অ্যালান পো-এর বিখ্যাত কবিতা A Dream Within a Dream-এ প্রশ্ন উচ্চারিত হয়েছে—
"All that we see or seem
Is but a dream within a dream?"
আমরা যা দেখি, যা ভাবি—সবই কি আরেকটি স্বপ্নের ভেতরের স্বপ্ন? প্রশ্নটির উত্তর আজও মেলেনি। কিন্তু প্রশ্নটি থেকেই বোঝা যায়, স্বপ্ন কেবল মনোবিজ্ঞানের বিষয় নয়; দর্শনেরও।
বাংলা কবিতায় কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহও এক ধরনের স্বপ্ন। অন্যায়হীন পৃথিবীর স্বপ্ন। মানুষে মানুষে সমতার স্বপ্ন। তাই তাঁর উচ্চারণ—
"বল বীর—
চির-উন্নত মম শির!"
এ উচ্চারণ জেগে থাকা মানুষের স্বপ্নকে জাগিয়ে তোলে।
স্বপ্নের একটি বিপদও আছে। সব স্বপ্ন সত্যি হয় না। কিছু স্বপ্ন অপূর্ণ থাকে, কিছু অসময়ে ভেঙে যায়। কিন্তু অপূর্ণ স্বপ্নও মূল্যহীন নয়। অনেক সময় অপূর্ণতাই মানুষকে পরবর্তী স্বপ্নের দিকে ঠেলে দেয়। একটি ভাঙা সেতুই হয়তো নতুন সেতু নির্মাণের কারণ।
আজকের পৃথিবীতে মানুষ আগের চেয়ে বেশি সংযুক্ত, অথচ অনেক বেশি নিঃসঙ্গ। প্রযুক্তি আমাদের ঘুম কমিয়েছে, কিন্তু স্বপ্ন কমাতে পারেনি। বরং নতুন ধরনের স্বপ্ন তৈরি করেছে—ডিজিটাল পরিচয়, ভার্চুয়াল সাফল্য, দ্রুত খ্যাতি। তবু রাতের গভীরে মানুষ এখনও সেই পুরোনো প্রশ্নই করে—আমি কে? কোথায় যেতে চাই? আমার সত্যিকারের স্বপ্নটি কোনটি?
স্বপ্ন তাই কেবল ভবিষ্যতের ছবি নয়; আত্মপরিচয়েরও আয়না। যে মানুষ নিজের স্বপ্নকে চিনতে পারে, সে নিজের সীমাকেও চিনতে শেখে। আর যে নিজের সীমা জানে, সে-ই একদিন সীমা অতিক্রম করার সাহস পায়।
হয়তো এ কারণেই পৃথিবীর প্রতিটি বড় সৃষ্টি—কবিতা, সঙ্গীত, বিজ্ঞান, স্থাপত্য, স্বাধীনতার আন্দোলন, প্রেম কিংবা মানবতার ইতিহাস—সবকিছুর শুরুতে ছিল একটি স্বপ্ন। কেউ তা ঘুমিয়ে দেখেছিল, কেউ জেগে।
শেষ পর্যন্ত স্বপ্নের সবচেয়ে বড় পরিচয় এই যে, তা মানুষকে বর্তমানের বন্দিত্ব থেকে মুক্ত করে। স্বপ্ন আমাদের শেখায়, যা এখনও ঘটেনি, সেটিও একদিন ঘটতে পারে। আর সেই বিশ্বাসই মানুষকে বারবার ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করে।
হয়তো তাই স্বপ্নের সংজ্ঞা এক বাক্যে দেওয়া যায় না। স্বপ্ন কখনও রাতের অন্ধকারে চোখের পাতায় ভেসে ওঠা আলোর রেখা; কখনও সকালের প্রথম সিদ্ধান্ত। কখনও একটি কবিতার প্রথম শব্দ, কখনও একটি শিশুর প্রথম উচ্চারণ। কখনও ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা, কখনও সমগ্র মানবজাতির অদম্য অগ্রযাত্রা।
0 Comments