কেন লিখি? 

বিজন সাহা 

পেশাগত জীবনে পদার্থবিদ বলে কেন প্রশ্নটি আমার নিঃশ্বাসে প্রশ্বাসে। তবে লেখা যেহেতু পেশা নয় তাই কখনই সেভাবে ভাবা হয়নি কেন লিখি। এখন লিখতে বসে বিভিন্ন ঘটনা মনে আসছে। তাই ঠিক অজুহাত নয়, বরং নিজের জানার জন্যই লিখব কেন লিখি।
কেন প্রশ্নটি আমার মনে গেঁথে গেছে স্কুল জীবনে। খুব সম্ভবত ধর্ম বইয়ে পড়েছিলাম এরকম কিছু কথা 
“আমি কে? কেন জন্ম? কিসে বা কল্যাণ?
এইরূপ প্রশ্ন করি লভ তত্ত্ব জ্ঞান-”  
এরপর থেকেই জানার বা প্রশ্ন করার আগ্রহ বেড়েছে, তবে নিজেকে এখনও শেষ পর্যন্ত জানা হয়নি। কোন কিছু পেশা হলে সহজেই উত্তর দেয়া যায় যে এটা আমার জীবিকা। কিন্তু কোন কাজ যদি পেশা না হয়ে শখ বা হবি হয় তখন? ব্যক্তিগত জীবনে আমি শুধু সেটাই করি যা করতে আমার ভাল লাগে। আর যদি কখনও এমন কিছু করতে হয় যা আমার ঠিক পছন্দের নয় তাহলে তা উপভোগ করার চেষ্টা করি, চেষ্টা করি সেখান থেকেও কিছু শিখতে, কিছু জানতে। আর এটা শুধু লেখা নয়, জীবনের সব ক্ষেত্রেই। 

২০০৯ সালে প্রথম এই ধরণের প্রশ্নের সম্মুখীন হই। তখন আমার ছবি প্রদর্শনী চলছিল দুবনায়। “আমাদের শিশুরা” নামে এই প্রদর্শনীতে আমার ছেলেমেয়েদের, ওদের বন্ধুদের আর আমাদের বন্ধুদের ছেলেমেয়েদের ছবি ছিল। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা যখন দেয়ালে নিজেদের ও বন্ধুদের ছবি দেখে অবাক হয়ে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত সেটা ছিল এক ভিন্ন ধরণের অভিজ্ঞতা। সেই সময় “জীবন্ত টুপি” নামে বাচ্চাদের এক পত্রিকা থেকে ইন্টার্ভিউ নেয় তাতিয়ানা। আমার ধারণা ছিল ও আমাকে আমাদের দেশ সম্পর্কে প্রশ্ন করবে। কিন্তু আমাকে অবাক করে ও জানতে চাইল
- তুমি কেন ছবি তোল?

🍂

আমরা গল্প করছিলাম ফটো ক্লাব ফোকাসে। অনেকেই বসে কথা বলছিলাম ছবি নিয়ে। ফলে সময় ছিল ভাবার। মিনিট পনেরো পরে কেমনে কেমনে যেন উত্তরগুলো তৈরি হয়ে গেল। অবশ্য এসব উত্তর এল যতটা না ছবিকে কেন্দ্র করে তারচেয়ে বেশি জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে। মনে পড়ল সোভিয়েত জীবনের প্রথম দিনগুলির কথা। তখন এখানে যা দেখতাম তাই নতুন মনে হত। ফার, পাইন, ম্যাপল, শুভ্র বরফ। তাই সেই সময় মনে হত যখন দেশে ফিরব তখন এই ছবিগুলি হবে আমার সোভিয়েত জীবনের সাক্ষী। তাই বললাম
- আমি ছবি তুলি আজকের আমিকে ভবিষ্যতে কোন এক সময় দেখার জন্য।   
- একটু বুঝিয়ে বলবে?
- ছাত্রজীবনে আমি যখন ছবি তুলতাম তখন প্রায়ই কেউ না কেউ আমার সাথে থাকত। আজ যখন সেসব ছবির দিকে তাকাই শুধু বন্ধুদের মুখ দেখি না, মনে পড়ে সেই সময়ের কথা, আমাদের অতীতের কথা। তাই ছবি তুলে আমি সময়কে, নিজের জীবনের বিভিন্ন মুহূর্তকে ধরে রাখি।
- এখানেই শেষ?
- না। অনেক দিন দুবনা থাকার পর আমার ফ্যামিলি মস্কো ফিরে গেছে। আগেকার ব্যস্ত জীবন আর নেই আমার। কাজের শেষে ঘরে ফিরে যাতে একাকীত্বে হারিয়ে না যাই সেজন্য আমি ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। হ্যাঁ, আমি ছবি তুলি একাকীত্ব থেকে রক্ষা পাবার জন্য। 
- আর কিছু?
- আমি খুব বেশি সময় মানুষের মধ্যে থাকতে পারি না। আজকাল প্রায়ই মস্কো যেতে হয়। আমাদের ডায়াস্পোরার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে পরিচিতদের ভিড়ে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ি তখন হাতে ক্যামেরা তুলে নেই। সে সময় কেউ আর আমাকে বিরক্ত করে না। ভিড়ের মধ্যে নিজের কাছে ফিরে আসার জন্য আমি ছবি তুলি। 

ছাত্রজীবনে যখন খুব একা থাকতে ইচ্ছে করত তখন প্রায়ই আরবাত স্ট্রীটে হাঁটতে যেতাম। আরবাত মস্কোর অন্যতম ব্যস্ত পথচারী রাস্তা। সবসময়ই ট্যুরিস্ট দিয়ে ভরা। আরবাতে হাঁটছি। তুমি কাউকে চেন না, কেউ তোমাকে চেনে না। এ যেন জনারণ্যে হারিয়ে যাওয়া। চারিদিকে মানুষের ভিড়, অথচ তুমি একা, একান্তই নিজের তুমি। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ পনেরো বছর। কিছু ছবি তোলা কমেনি। ছবি তোলা আজ জীবনের অংশ। নিঃশ্বাস প্রশ্বাস নেবার মতই। বিকালে যখন ভোলগার তীরে হাঁটতে যাই অথবা অন্য কোথাও বেড়াতে যাই, ক্যামেরা কাঁধে ঝুলে, ক্যামেরা না থাকলে স্মার্টফোন হাতে তুলে নেই। ছবি এটা এখন শুধু অতীত দেখা নয়, এটা নিজের বর্তমানের ভালোলাগা, ভালোবাসা, নিজের আবেগ, অনুভূতি প্রকাশের ভাষা। প্রশ্ন উঠতেই পারে যে এর সাথে লেখার কি সম্পর্ক? তবে লিখতে বসে মনে হল এই সম্পর্ক গভীর। 


স্কুল জীবন থেকেই লেখালেখির অভ্যেস ছিল। তবে সেটা মূলত ক্লাব বা স্কুলের দেয়াল পত্রিকা আর ক্লাবের বিভিন্ন সংকলনে। পরে মস্কো এসে লিখতাম সংগঠনের দেয়াল পত্রিকায় বা মস্কোর জীবন নিয়ে সাপ্তাহিক একতায়। তবে সেসব অনিয়মিত। তবে লিখতে খুবই পছন্দ করতাম। কোথাও বেড়াতে গিয়ে বন্ধুদের না পেলে চিরকুট লিখে রেখে আসতাম। আর চিঠি লিখতাম অনেক। এছাড়া নিজের চিন্তাভাবনা লিখে রাখতাম প্রায়ই। এসব এখনও সেভাবেই পড়ে আছে। পরে অবশ্য সেসব নোট নিজের বিভিন্ন লেখায় ব্যবহার করেছি। কর্মজীবন শুরু করার পর যখন ফ্যামিলি নিয়ে দুবনা আসি তখন এ ধরণের লেখা জীবন থেকে উধাও হয়ে যায়। আর ২০০৯ সালে ওরা যখন মস্কো চলে যায় তখন নতুন করে শুরু হয় লেখালেখি। সেটাও মূলত নিজের একাকীত্বকে রঙিন করতে। তাই ছবি তোলার সাথে লেখার যোগাযোগ অবিচ্ছেদ্য আমার জীবনে। ২০০৯ এ লিখতাম মূলত ইংরেজি আর রুশে। কারণ তখন বাংলায় লেখা আজকের মত সহজ ছিল না। দেশ থেকে কীবোর্ড নিয়ে এলেও তাতে আর লেখা শেখা হয়নি। এরপর অভ্র ইনস্টল করে বাংলায় লিখতে শুরু করি। লেখা চালিয়ে যেতে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তা হল দুবনায় বাংলায় কথা বলার মানুষ না থাকা। তাই আমি প্রায়ই বলি যে আমি কথা বলি না, কথা লিখি। যে কথাগুলো শ্রোতার অভাবে মুখে বলতে পারি না সেটাই লিখে রাখি। যেহেতু ঘোরাফেরা করতে পছন্দ করি, পছন্দ করি বিভিন্ন জায়গা সম্পর্কে জানতে তাই লেখার রসদের কোন অভাব হয় না। রাশিয়া সম্পর্কে দেশের মানুষের ভুল ধারণা অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক তথ্যের অভাব। সেটাও উদ্বুদ্ধ করে এখানকার জীবন, এখানকার ইতিহাস নিয়ে লিখতে। আর লিখি দেশের ও বিশ্বের চলমান ঘটনা নিয়ে। আমি জানি এসবই আমার একান্তই ব্যক্তিগত মতামত। আসলে কোন বিষয়ে আমাদের মতামত গড়ে ওঠে নিজস্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে আর জীবনের প্রতি নিজের দৃষ্টিভঙ্গি  থেকে। আমার লেখার মূল উদ্দেশ্য মানুষকে জানানো যে এভাবেও ভাবা যায়, এভাবেও কোন ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা যায়। বেশিরভাগ মানুষের প্রধান সমস্যা হল তারা অন্যদের ধারণার উপর এতটাই আস্থাশীল যে তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রয়োজনীয়তা বোধ করে না। এর সুযোগ নিয়ে কী ধর্মীয় নেতা, কী রাজনীতিবিদ, কী অন্য কেউ – সবাই তাদের ঠকায়। সেই অর্থে আমি লিখি মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখাতে। তবে ইদানিং খেয়াল করে দেখলাম, ছবির মত লেখাও অতীতের আমিকে ভবিষ্যতে দেখার সুযোগ করে দেয়। পুরানো লেখা বা চিঠিপত্র থেকে সময়ের সাথে নিজের চিন্তা ভাবনার বিবর্তনের ধারা দেখতে পাই। এ ছাড়া লেখা মানেই চিন্তা করা। যদি কথা বলার সময় অনেক কিছু মুখ ফস্কে বেরিয়ে যেতে পারে তবে লেখার সময় আমাদের চিন্তার জন্য অনেক সময় থাকে। লেখা আমাদের ভাবনাকে গুছিয়ে প্রকাশ করতে শেখায়। তাই লেখা এটাও নিজেকে জানার, নিজেকে বোঝার, নিজেকে প্রকাশ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আমি লিখি নিজেকে জানার জন্য। 

অগ্রজ গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ। অধ্যাপক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো ।