জ্বলদর্চি

লাদাখ : মন ভালো করা এক দেশ/সপ্তম পর্ব/কলি সাহু চৌধুরী

মেরাক গ্রাম

লাদাখ : মন ভালো করা এক দেশ
সপ্তমপর্ব
কলি সাহু চৌধুরী

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই আবার গেলাম প্যাংগং লেকের ধারে। সকালের আলোয় লেকটাকে যেন আরও সুন্দর লাগছিল। নীল জলের ওপর সূর্যের আলো ঝিকিমিকি করছে, চারদিকে নিস্তব্ধ পাহাড়—মনে হচ্ছিল, এই দৃশ্য ছেড়ে কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে সেই সৌন্দর্য উপভোগ করলাম, ছবি তুললাম। তারপর ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা সো মোরিরি লেকের উদ্দেশে রওনা দিলাম। সামনে অপেক্ষা করছিল লাদাখের আরও এক অপূর্ব যাত্রা। বামদিকে প্যাংগং লেকের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হতে হতে আমরা পৌঁছেছিলাম মেরাক গ্রামে। মনে হচ্ছিল, যত এগোচ্ছি, প্রকৃতি যেন ততই নিজের নতুন নতুন রূপ খুলে দিচ্ছে।
মেরাকে এসে প্রথম যে অনুভূতিটা হয়েছিল, তা হলো—এত শান্তিও কি সত্যিই কোথাও থাকতে পারে! একদিকে নীল প্যাংগং লেক, অন্যদিকে রুক্ষ পাহাড়ের সারি। চারপাশে এমন নিস্তব্ধতা, যেন প্রকৃতি নিজেই ধ্যানমগ্ন। হাওয়ার সঙ্গে লেকের জলের রং বদলে যাচ্ছিল—কখনও গাঢ় নীল, আবার কখনও সবুজের আভা। সেই রঙের খেলা দেখে মনে হচ্ছিল, চোখের সামনে যেন কোনো শিল্পী প্রতিটি মুহূর্তে নতুন ছবি আঁকছেন।
মেরাকে পর্যটকের ভিড় খুবই কম। তাই এখানে প্রকৃতিকে আরও কাছ থেকে, আরও নির্ভেজালভাবে অনুভব করা যায়। দূরে কয়েকটি বাড়ি, প্রার্থনার পতাকা হাওয়ায় দুলছে, পাহাড়ের ঢালে ইয়াক চরছে—সব মিলিয়ে ছবির মতো সুন্দর এক পরিবেশ।
3 Idiots সিনেমার কিছু দৃশ্য এখানে শুট হয়েছে।  এটি Rancho School

ভারত-চীন সীমান্তের খুব কাছাকাছি অবস্থিত এই ছোট্ট গ্রামটির সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখা যায় না, মনেও অনুভব করা যায়। এখানে এসে বুঝেছিলাম, প্রকৃতির সবচেয়ে বড় উপহার এই চুপচাপ শান্ত পরিবেশ।
সব মিলিয়ে অসাধারন এক সৌন্দর্যের টানেই রাস্তায় যেতে যেতে কতবার যে গাড়ি থামিয়েছি, তার হিসেব নেই! যেখানে চোখ আটকে গেছে, সেখানেই নেমে পড়েছি। কখনও কারাকোরামের ঝলমলে শৃঙ্গ, কখনও মেরাক গ্রামের শান্ত পরিবেশে ,কখনও সেই ফাঁকা রাস্তা আর নীল আকাশ—মনের মতো করে কয়েকটা ছবি তুলে আবার পথ চলা শুরু। মনে হচ্ছিল, এই পথের প্রতিটা মুহূর্ত শুধু চোখে নয়, সারাজীবনের জন্য স্মৃতিতেও ধরে রাখি।
🍂
একসময় পৌঁছে গেলাম সো মোরিরি লেকের কাছে। লাদাখের বুকে, সুউচ্চ পাহাড়ের নিঃশব্দ পাহারায় শুয়ে থাকা এই হ্রদ যেন প্রকৃতির যত্নে লুকিয়ে রাখা এক অমূল্য নীল রত্ন।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৪,৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত সো মোরিরি লাদাখের অন্যতম সুন্দর ও শান্ত হ্রদ। এত বেশি উচ্চতায় থাকার কারণে এখানে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ অনেক কম। তাই বেশিরভাগ পর্যটক এখানে রাত কাটানোর সাহস করেন না। উচ্চতাজনিত অসুস্থতা বা শ্বাসকষ্টের আশঙ্কা থাকায় কিছুক্ষণ এই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করেই সবাই ফিরে যান।
আমরাও বেশ কিছুক্ষণ সেই নীল বিস্ময়ের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। পাহাড়ের রুক্ষ বুকের মাঝে এত গভীর, এত স্বচ্ছ নীল জল—দেখলে মনে হয়, আকাশ যেন নিজের রংটুকু নিঃশব্দে এই হ্রদের জলে মিশিয়ে দিয়েছে। চারদিকে এমন এক নিস্তব্ধতা, যেখানে শব্দেরও যেন প্রবেশাধিকার নেই। শুধু হিমেল বাতাস, পাহাড়ের চুপ থাকা আর নীল জলের অপার্থিব সৌন্দর্য মনকে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে দিচ্ছিল।
এবার ফেরার পালা।
কারাকোরাম পর্বতমালা

গাড়িতে বসে গল্প করতে করতেই ফিরছিলাম। কর্মা ভাই বললেন, "যেদিক দিয়ে রাস্তা ফাঁকা পাব, সেদিক দিয়েই যাব।" আমাদের প্ল্যান ছিল চুমাথাং গিয়ে রাতটা থাকব। তাই আগে থেকে কোথাও হোটেলও বুক করা হয়নি। কর্মা ভাইও ভেবেছিলেন, ঠিক সময়ে চুমাথাং পৌঁছে যাব। তাই বুকিং করতে বারণ করেছিলেন।
কিন্তু পাহাড়ে সব সময় প্ল্যানমতো হয় না। ন্যোমা পৌঁছোতেই বিকেল হয়ে গেল। তখন আর সামনে এগোনোর উপায় নেই। আজকের রাতটা ন্যোমাতেই কাটাতে হবে।
কর্মা ভাই তাঁর চেনা কয়েকটা গেস্টহাউসে ফোন করলেন। আমাদের নিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরলেন। কিন্তু কোথাও একটা ঘরও খালি নেই। সব ভর্তি। তখন উনি নিজেই খুব আফসোস করতে লাগলেন। বারবার বলছিলেন, "আগে থেকে একটা বুকিং করে রাখলেই ভালো হত।"
শেষমেশ অনেক খোঁজাখুঁজির পর একটা ছোট্ট পাহাড়ি হোমস্টে পাওয়া গেল। ততক্ষণে আমাদের অবস্থা একেবারে কাহিল। সারাদিনের ক্লান্তি, তার ওপর খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে।
দুটো ছোট ঘর পাওয়া গেল। ভাগাভাগি করেই থাকব। হোমস্টের মালকিন দিদি বললেন, আর্মির ব্যারাকে কাজ করেন এমন দু'জন ইঞ্জিনিয়ার তাঁর বাড়ির আরেকটা ঘরে কয়েক মাস ধরে থাকেন। তাই বাথরুমটা তাঁদের সঙ্গেই ব্যবহার করতে হবে। তবে চিন্তার কিছু নেই। ওঁরা অনেক রাতে ফেরেন। ততক্ষণে আমরা ঘুমিয়েই পড়ব।
এরপর উনি তাড়াতাড়ি গরম গরম দুধ-চা, রুটি, বেগুন ভর্তা আর মিক্সড সবজির তরকারি বানিয়ে দিলেন। সেই মুহূর্তে ওই সাধারণ খাবারটাই আমাদের কাছে রাজভোগের মতো লাগছিল।
এরই মধ্যে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। চারপাশে ঠান্ডাও বেশ জেঁকে বসেছে। একটু একটু রোদ তখনও পাহাড়ের মাথায়, বাইরে বসে পাহাড়ের সেই নিরিবিলি সন্ধেটা উপভোগ করছি, দূরে সেনা ছাউনি চোখে পড়ছে।  তারপর গরম গরম খাওয়া সেরে মোটা কম্বলের নিচে ঢুকে পড়লাম।
আহা... সারা দিনের ক্লান্ত শরীর যেন সেই কম্বলের উষ্ণতায় এক নিমেষে হালকা হয়ে গেল। গভীর ঘুমের দেশে পৌঁছতে আর একটুও সময় লাগল না। পরদিন খুব সকালে ঘুম ভাঙতেই হোমস্টের দিদি হাসিমুখে এসে জিজ্ঞেস করলেন, "ঘুম ভালো হয়েছে তো?" আমি বললাম, "দারুণ হয়েছে। এত ক্লান্তির মধ্যে তোমার বাড়িতে থাকার সুযোগ আর তোমার হাতের গরম গরম রান্না—সবকিছুই মনে থাকবে।"
সকালে চা, টোস্ট আর বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। চারদিকে তাকিয়ে দেখি, বাড়ির সীমানা জুড়ে আখরোট গাছ, আর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পপলার গাছের সারি। উঠোনে পাহাড়ি ঝরনার জল পাইপ দিয়ে এসে পড়ছে। সেই বরফশীতল জলে হাত-মুখ ধুয়ে এক অন্যরকম সতেজ অনুভূতি হল। দূরের পাহাড়ের চূড়ায় তখন ভোরের সোনালি রোদ পড়েছে। সেই দৃশ্য যেন দিনের শুরুতেই মন ভরে দিল।
এরপর দিদি তাড়াতাড়ি আমাদের জন্য সকালের খাবার তৈরি করে দিলেন—ওমলেট, রুটি, চা, আর নিজের বাড়ির টাটকা দুধ। এত আন্তরিক আপ্যায়নের জন্য তাঁকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে, একসঙ্গে কয়েকটা ছবি তুলে আমরা রওনা দিলাম চুমাথাং-এর উদ্দেশে।
দুপুর গড়িয়ে যখন চুমাথাং পৌঁছলাম, তখন বেশ খিদে পেয়ে গেছে। সিন্ধু নদীর ধারে একটি ছোট্ট রেস্তোরাঁয় ঢুকতেই দেখি প্রায় তিরিশ জনের একটি বাঙালি পর্যটকের দল হৈ-হুল্লোড় করে খাওয়াদাওয়া করছেন। এত বড় দলের জন্য খাবার পরিবেশন করতে গিয়ে রেস্তোরাঁর ছেলেরা বেশ ব্যস্ত। তাই আমাদের অর্ডার নিতে একটু দেরি হল।
অপেক্ষা করতে করতে রেস্তোরাঁর ডান দিকের সরু পথ ধরে নদীর দিকে নেমে গেলাম। আর সেখানে গিয়েই চোখের সামনে ধরা দিল চুমাথাং-এর সবচেয়ে আশ্চর্য দৃশ্য—প্রাকৃতিক উষ্ণ প্রস্রবণ।
পাথরের ফাঁক থেকে গরম জল বুদবুদ তুলে বেরিয়ে আসছে। কোথাও আবার জল টগবগ করে ফুটছে। এই গরম জলের উৎস আসলে মাটির অনেক গভীর থেকে উঠে আসে। লাদাখ হিমালয় ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হওয়ায় মাটির নিচে থাকা গরম শিলার সংস্পর্শে জল উত্তপ্ত হয়ে উপরে উঠে আসে। সেই কারণেই চুমাথাং এত বিখ্যাত। তার প্রাকৃতিক হট স্প্রিং-এর জন্য।
আমরাও জুতো খুলে পা ডুবিয়ে বসলাম সেই উষ্ণ জলে। পাহাড়ি ঠান্ডার মধ্যে সেই গরম জলের স্পর্শ যেন সমস্ত ক্লান্তি মুহূর্তে দূর করে দিল। চারপাশে সিন্ধু নদী, উঁচু পাহাড়, আর প্রকৃতির এই অদ্ভুত সৃষ্টি—সব মিলিয়ে এক অপূর্ব অনুভূতি। অনেক ছবি আর ভিডিও তুলে সেই মুহূর্তগুলো ক্যামেরায় বন্দি করে রাখলাম।

খাওয়া শেষ করে আবার গাড়িতে উঠে পড়লাম। চুমাথাং ছেড়ে একটু এগোতেই রাস্তার দু'ধারে চোখে পড়ল ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিশাল ক্যাম্প। সারি সারি ব্যারাক, অফিস, থাকার জায়গা, গাড়ি রাখার শেড—সব মিলিয়ে যেন ছোট্ট একটা সেনা শহর।
লাদাখের এই দুর্গম অঞ্চলে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ব লাদাখের সীমান্ত এলাকায় যাতায়াত, রসদ পৌঁছে দেওয়া এবং সীমান্তের নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য চুমাথাং একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। তাই এখানে সেনাদের থাকার জন্য বড় বড় ব্যারাক, প্রশিক্ষণের জায়গা এবং বিভিন্ন দপ্তর তৈরি করা হয়েছে। সারা বছরই অসংখ্য সেনা এখান থেকে সীমান্তের বিভিন্ন পোস্টে যাতায়াত করেন।
গাড়ি চলতে চলতে জানলার বাইরে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, কী কঠিন পরিবেশে আমাদের দেশের জওয়ানরা দিনরাত পাহারা দিয়ে চলেছেন। প্রচণ্ড ঠান্ডা, তুষারপাত, অক্সিজেনের অভাব—সবকিছুর সঙ্গে লড়াই করেও তাঁরা নিজের কর্তব্য পালন করছেন। তাঁদের জন্যই আমরা নিশ্চিন্তে এই অপূর্ব পাহাড়ি সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারছি।
চুমাথাং ধীরে ধীরে পিছনে পড়ে রইল। সামনে আবার শুরু হল সিন্ধু নদীকে সঙ্গী করে পাহাড়ের বুক চিরে এগিয়ে চলা আমাদের পথ। একদিকে নীল আকাশ, অন্যদিকে রুক্ষ বাদামি পাহাড়, মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে সিন্ধু। গাড়ির জানলা দিয়ে সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, এই লাদাখের প্রতিটি পথ, প্রতিটি পাহাড়, প্রতিটি নদী যেন নিজের মতো করে এক একটি গল্প বলে চলেছে।
মাঝে কয়েক জায়গায় একটু থেমে চা খেয়ে, চারপাশের দৃশ্য উপভোগ করতে করতে আমরা এগিয়ে চললাম। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার পথ পেরিয়ে বিকেলের দিকে পৌঁছে গেলাম লেহ শহরে। পাহাড়ের নির্জনতা ছেড়ে আবার শহরের কোলাহলে ফিরে আসা, আমাদের হোটেল ছিল লেহ মার্কেটের একেবারে কাছে।
পরের দিন ছিল আমাদের বিশ্রামের দিন। লেহ প্রায় ১১,৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত, তাই শরীরকে এই উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য (acclimatization) একদিন সম্পূর্ণ বিশ্রাম নেওয়া খুবই জরুরি।

হোটেলে ডিনার করতে গিয়ে ম্যানেজার বললেন, পরের দিন সন্ধ্যায় হোটেলেই লাদাখের স্থানীয় নাচ-গানের অনুষ্ঠান হবে। তিনি বললেন, আমরা যেন সেই সময় কোথাও না যাই।
এখানে একটা কথা বলে রাখি। আমাদের হোটেলে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ আর ডিনার—সবই প্যাকেজের মধ্যে ছিল। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জিওলজি বিভাগের গবেষক আর স্যাররা প্রতি বছরই লাদাখে আসতেন। তাঁদের পরামর্শেই এই হোটেল আর ভালো ড্রাইভারের খোঁজ পেয়েছিলাম। হোটেলটা বাজারের কাছে নেওয়ারও একটা কারণ ছিল। এত উঁচু জায়গায় অনেকেরই শ্বাসকষ্ট বা অন্য সমস্যা হতে পারে। তাই বাজার কাছে থাকলে প্রয়োজনে হেঁটে যাওয়া যায়, দরকারি জিনিস কেনা যায় বা নতুন কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে স্থানীয় খাবার খাওয়াও সহজ হয়।
পরের দিন আমাদের কোনো তাড়া ছিল না। তাই একটু দেরি করেই ঘুম থেকে উঠলাম। ঠিক করেছিলাম, সেদিন তিব্বতি খাবার খাব। তনিম আগে থেকেই ইন্টারনেটে খোঁজ নিয়ে আর বন্ধুদের কাছ থেকে শুনে একটা বিখ্যাত তিব্বতি রেস্তোরাঁর নাম জেনে রেখেছিল। আমাদের হোটেল থেকে মাত্র দু'মিনিট হাঁটলেই সেখানে পৌঁছে যাওয়া যায়।
তসো মোরিরি লেক।

খাওয়া-দাওয়া সেরে আমরা বাজারে গেলাম। বাড়ির সবার জন্য লাদাখের কিছু ছোটখাটো উপহার কিনব। অনেকক্ষণ বাজারে ঘোরার পর হঠাৎ আমার মাথা ঘুরতে শুরু করল, সঙ্গে একটু শ্বাসকষ্টও হলো। ছেলে বলল, "মা, আগে তোমাকে হোটেলে রেখে আসি।" আমি হোটেলে ফিরে কিছুক্ষণ শুয়ে বিশ্রাম নিলাম।
সন্ধ্যায় সবাই হোটেলের সামনে গোলাপ গাছে ঘেরা সুন্দর বাগানে এসে বসলাম। গরম গরম চা আর পকোড়া খেতে খেতে অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার অপেক্ষা করছিলাম। কিছুক্ষণ পর লাদাখের স্থানীয় শিল্পীরা তাঁদের নাচ আর গান পরিবেশন করলেন। খুব সুন্দর একটা সন্ধ্যা কাটিয়েছিলাম। লাদাখের প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে সেদিন তাদের সংস্কৃতিকেও খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল।
এবার ফেরার পালা। লেহ থেকে দিল্লির ফ্লাইটে উঠে জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, সত্যিই কি লাদাখ ছেড়ে চলে যাচ্ছি?
এই কয়েকদিনে কত কী যে দেখলাম! কখনও আকাশছোঁয়া পাহাড়, কখনও নীল-সবুজ প্যাংগং লেক, কখনও নুব্রার বালিয়াড়ি, কখনও শ্যোক নদীর পাশ দিয়ে দীর্ঘ পথ। একেকটা রাস্তা, একেকটা বাঁক যেন নতুন করে চমকে দিয়েছে। কোথাও গাছ নেই, তবু পাহাড়ের রং প্রতি মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে। কখনও বাদামি, কখনও সোনালি, কখনও আবার বেগুনি আভা। প্রকৃতি যে এত রঙ নিয়ে খেলা করতে পারে, লাদাখ না এলে বুঝতেই পারতাম না।
এখানকার ছোট ছোট গ্রাম, বৌদ্ধ গুম্ফা, রঙিন প্রার্থনার পতাকা আর মানুষের সহজ-সরল হাসিমুখ—সবকিছু মিলিয়ে লাদাখকে যেন আরও আপন করে দিয়েছিল।
ভ্রমণ তো একদিন শেষ হবেই। কিন্তু কিছু জায়গা শুধু চোখে নয়, মনের ভেতরেও থেকে যায়। লাদাখ আমার কাছে ঠিক তেমনই। এখান থেকে শুধু ছবি নিয়ে ফিরছি না, সঙ্গে নিয়ে ফিরছি অনেক সুন্দর মুহূর্ত, অনেক বিস্ময় আর সারাজীবন মনে রাখার মতো কিছু স্মৃতি।
বিদায় লাদাখ... আবার কোনো একদিন, নতুন করে তোমার কাছে ফিরে আসার আশা নিয়েই।
শেষ।

Post a Comment

0 Comments