অনিন্দিতা শাসমল
"আমার স্বপ্ন দেখা দুটি নয়ন ,হারিয়ে গেল কোথায় কখন, কেউ তা জানে না...."
সত্যিই তাই । যেদিন থেকে একটি শিশু স্বপ্ন দেখতে শুরু করে, স্বপ্ন দেখতে দেখতে কৈশোর,যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্যের দ্বারে পৌঁছেও স্বপ্ন দেখতে দেখতেই বেঁচে থাকে। স্বপ্ন না থাকলে যে কোনো মানুষের জীবন অর্থহীন। কেউ স্বপ্ন দেখে বাড়ি ,গাড়ি ,অর্থ , প্রতিপত্তি, ঐশ্বর্য , কেউ বা সুখ ও শান্তির খোঁজে সারা জীবন ছুটে বেড়ায় মায়া হরিণীর পেছনে। তবু আমরা স্বপ্ন দেখি।
আমার স্বপ্ন দেখা ! সেই ছোটোবলায় সুর করে পড়া কবিতা ---"একদিন রাতে আমি স্বপ্ন দেখিনু /চেয়ে দেখো দেখো বলে যেন বিনু/চেয়ে দেখি ঠোকাঠুকি বরগা কড়িতে/কলিকাতা চলিয়াছে নড়িতে নড়িতে।"
আমি ছোটোবেলা থেকেই ঘুমের ঘোরে প্রতিদিন এইসব অলীক স্বপ্ন দেখি । আর সকালে উঠে অবাক হয়ে সেগুলো ভাবি। আসলে কল্পনাপ্রবণ মন বেশি করে স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে। আকাশের নীলে পানসি ভাসিয়ে,হালকা হাওয়ায় ডানা মেলে দেয় যে স্বপ্নরা ,তারাই ঘুমের দেশে রঙ বেরঙের ছবি আঁকে। এইসব
স্বপ্ন বিভ্রাট দেখে কবিতাও লিখে ফেলি--
ইঁদুর ছানা বিড়াল দেখে আর পায়না ভয়
মাগো আমি মরে যাই ,এমনও আবার হয় ?
হঠাৎ দেখি সাপে নেউলে ভীষণ রকম ভাব
গাছে উঠে একটা গরু খাচ্ছে পেড়ে ডাব !
মাছেরা সব ডাঙায় উঠে নাচছে ধেই ধেই
ডাঙায় কুমির জলে বাঘ কুছ পরোয়া নেই
তেঁতুলগুলো তেতো খেতে আপেলগুলো টক
ঘোড়ার মাথায় শিং আর হাতির পায়ে নখ !
উচ্ছের ঝোল মিষ্টি আর মিষ্টি খেতে নিম
কাক পেড়েছে কোকিল-বাসায় কী সুন্দর ডিম !
এমন সব স্বপ্ন দেখে যেই ভেঙেছে ঘুম
নিশুতি রাত সব শুনশান,নিস্তব্ধ নিঝুম !
চিমটি কেটে দেখলো রাজু, নিজেই নিজের গায়
উঠলো ছাদে খুব আস্তে আলতো পায়ে পায়
চাঁদের আলোয় ভাসছে জগৎ লাগিয়ে দিয়ে তাক
যেমন ছিল তেমনি আছে, সবকিছু ঠিকঠাক ।
ছোটোবেলা থেকে মায়ের বড় শাড়ি গায়ে জড়িয়ে বা গামছাকেই শাড়ি হিসেবে পরে ,মাথায় গামছা জড়িয়ে খোঁপা করে ,কাঁধে একটা পরিত্যক্ত ব্যাগ জোগাড় করে, ঝুলিয়ে দিদিমণি সেজে দিনের বেলায় মহড়া দিতাম । সেই দিবাস্বপ্ন রাতেও দেখে ,অবচেতনে দিদিমণি সেজে মুখ দিয়ে বিড়বিড় করে ছাত্র পড়ানোর আওয়াজ বেরোতো। হাসি হাসি মুখ মায়ের ডাকে চোখ খুলে দেখতাম চারিদিকে নরম আলোর বন্যা।আর রেডিওতে বা ফিলিপসের টেপ রেকর্ডার বাজতো খুব চেনা একটা গান ---
"কী মিষ্টি,দেখ মিষ্টি,কী মিষ্টি এ সকাল..."
সেই স্বপ্ন সফল করে দিদিমণি হতে গিয়ে স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটির ও তার পরবর্তী চাকরির পরীক্ষার জন্য যে কঠোর পরিশ্রমের দিনগুলো পেরোতে হয়েছে , ছোটোবেলায় দেখা স্বপ্নের মতো তা এতটা সহজ নয় । তবে মানুষ জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার জন্য যা স্বপ্ন দেখে ,কঠোর পরিশ্রম আর নিয়মানুবর্তিতা থাকলে তা সফল করে তোলা সম্ভব বলে আমার বিশ্বাস।
কল্পনা চাওলা থেকে সুনিতা উইলিয়াম সকলেই ,এই কারণেই তাঁদের মহাকাশ বিজয়ের স্বপ্ন সফল করেছিলেন।তাঁদের নিয়েই লেখা আমার স্বপ্ন-উড়ান কবিতা --
সেই মেয়েটার স্বপ্ন ছিল
গাড়ি নয়তো,রকেট যান
সেই মেয়েটার কঠিন ব্রত
স্বপ্ন ছোঁয়া অবাক উড়ান।
ছোটো থেকেই দারুণ জেদ
পৌঁছে যাবো নীল আকাশে
সকল বাধা কাটিয়ে ঠিক
শূন্যে ভাসবো মহাকাশে।
অদম্য সেই কৃচ্ছসাধন
পৌঁছে দিলো অবশেষে ,
ন'টি মাস কম কথা নয়
আবার ফেরা নিজের দেশে।
সেই মেয়েটাই দেশের গর্ব
সারা পৃথিবী তাকিয়ে আছে
বিজ্ঞান মানে জয়যাত্রা
আঁধার পেরিয়ে আলোর কাছে।
আমি যে স্বপ্ন দেখতে দেখতে জীবনের অর্ধশতবর্ষ পার করে আজ এই পৃথিবীর আলো হাওয়ার শ্বাস প্রশ্বাস নিচ্ছি ,তার কিছু স্বপ্ন পূরণ হয়েছে । কিছু এখনও বাকি ।জানিনা সেই স্বপ্ন কোনোদিন পূরণ হবে কিনা। আজও প্রতিদিন প্রতিনিয়ত স্বপ্ন দেখি ঘরে বাইরে, পথে ঘাটে, অফিস আদালতে নারীদের জন্য সুরক্ষিত এবং জাতপাত ও ধর্মের গোঁড়ামিহীন একটি সুন্দর সমাজের। এই স্বপ্ন দেখতে দেখতেই বাকি জীবন কেটে যাবে হয়তো বা! তবুও স্বপ্ন দেখে যাবো, আর মানুষের কাছে পৌঁছে যাবো এই আশা নিয়ে --
এসো, জল ঢেলে দিই কুঁড়ি ধরে থাকা ওইটুকু চারাগাছে ;
এসো, বই খাতা নিয়ে ছুটে যাই সেই পথশিশুদের কাছে।
এসো, পায়ে পায়ে হাঁটি , সবুজে সবুজ মখমল ভিজে ঘাসে ;
এসো, মন ভরে নিই ছাতিম গন্ধ , ভরা শরতের মাসে।
এসো, সকলের সাথে গান গাই ,আর প্রাণের কবিতা বলি ;
এসো রক্তের দাগ মুছে দিই ,আর ফোটাই গোলাপ কলি।
এসো , রক্তদানের পুণ্যে ফেরাই রাম রহিমের প্রাণ ;
এসো মসজিদে আর মন্দিরে গাই , শুধু সাম্যের গান।
এসো, প্রতি ভোরবেলা ভৈরবী সুর , ধুলো জমা এসরাজে ;
এসো , প্রাণ ঢেলে দিই , গান ঢেলে দিই ..আগামীর শুভ কাজে।
এসো , হাতে হাত আর চোখে চোখ রেখে , শপথের কথা বলি ;
এসো সুজন বন্ধু , আজীবন যেন একসাথে পথ চলি।
এসো,যতটুকু আছে ,তাই নিয়ে যাই মানুষের আশেপাশে,
এসো, সকলের মনে সাহস যোগাই ,সারা বছরে ও মাসে।
এসো, বিপদের দিনে প্রসারিত করি তোমার আমার হাত,
এসো , সবার হৃদয়ে উপহার দিই স্বর্গের পারিজাত।
যত হানাহানি ধুয়ে মুছে যাক ভরা জোয়ারের জলে।
অন্তবিহীন বন্ধুতা যেন জীবনের কথা বলে।
আঙিনায় এসো আগমনী সুর, শিউলি পড়ুক ঝরে ;
ঈদ-মহালয়া মিলে মিশে যাক অপরূপ এক ভোরে।
0 Comments