জ্বলদর্চি

কেন লিখি?/স্মৃতিরেখা পাত্র

কেন লিখি?
স্মৃতিরেখা পাত্র

আমাদের উচ্চ মাধ্যমিকের সিলেবাসে এ. জি
. গার্ডিনারের  এ-সে" অন লেটার রাইটিং " ছিলো। সেটা পড়ার পর আমি আত্মীয় পরিজন বা বন্ধুদেরকে যে চিঠিগুলি লিখতাম সেখানে চেষ্টা করতাম চিঠিগুলিতে যেন আর্ট বা শিল্পের একটু ছোঁয়া অন্তত: থাকে। ব্যস, তারপর চিঠি গেল হারিয়ে আর জীবনও হয়ে উঠলো অনেক ব্যস্ত।কোনো কিছু লেখালেখির ধারেকাছেও যাইনি। শুধু অনার্সের নোটস্ লেখা, মুখস্ত করা, চাকরি আর তারপর বিয়ে। শ্বশুরবাড়ির পরিবেশই আমাকে নিয়ে এলো ডায়েরির পাতাতে।সেখান থেকে খাতাতে।ডায়েরির পাতায় প্রথম দিকে থাকতো শ্বশুরবাড়ির লোকজনদের আচরণ ও আমার জালনিবদ্ধ রোহিতের মতো অবস্থার বিবরণ। শ্বশুরবাড়ির পরিবেশ যতোই মেয়েদের টিকে থাকার প্রতিকূলে থাক, সে সম্পর্কে মা-বাবাকে জানানোটা একটু যন্ত্রণাদায়ক, যেহেতু তাঁদের যন্ত্রণা এতে বাড়বে।সুতরাং সব চেপে যাও।তখন আমার যতো কষ্ট সব উগরে দিলাম আমার ডায়েরির পাতায় ---সব। যার যতো অপকর্ম, অন্যায়,আমার যতো কষ্ট সব লিখিত রূপ পেলো। ক্রমশ খাতা নিল ডায়েরির পাতার স্থান।আর কবিতা হয়ে উঠল আমার সব ব্যথা, কষ্ট আর আমার প্রতি অন্যায় আচরণের আক্ষরিক রূপ।তারপর ধীরে ধীরে সেখানে  জায়গা পেলো সমাজের কিছু নঙর্থক দিক ও তার সমাধানের ইঙ্গিত। কার কী করা উচিত,অনুচিত ইত্যাদি ছন্দোযোগে বলা চললো।তারপর এলো নিজের বাল্যকাল, গ্রাম, বিদ্যালয়, নিজের পড়াশোনার জায়গা, ছাত্রছাত্রী এসব নিয়ে লেখা।

কিন্তু প্রশ্নটা হলো, আমি কেন লিখছি?কিছু কি লাভ হচ্ছে এসব লিখে? 
🍂
লাভ, প্রথমত: যখন ডায়েরির পাতাতে লিখতাম তখন লেখাটির পর একটু স্বস্তি পেতাম। কিন্তু লেখাগুলি সব গোপনে চলতো বা রাখতামও গোপনে।কারণ  এগুলি প্রকাশ্যে এলে জীবন বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকি আরো বেড়ে যেতো।
তাহলে একমাত্র লাভ ভেতরের কষ্টটা একটু কমিয়ে ভেতরটাকে একটু স্বস্তি দেওয়া।
তবে এই যে পারিবারিক বা সামাজিক অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে, মনুষ্যত্বের অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আমার লেখনি যা কিছু লিখেছে সেগুলোর যদি আমার লেখার মাধ্যমে সংস্কার হত---- অন্তত: সামান্য হলেও---- তাহলে তো সোনায় সোহাগা। অন্তরে তো ওই চাহিদাটা আছেই কিন্তু আমার লেখা ক'জনের কাছেই বা পৌঁছবে আর যার কাছে পৌঁছবে তার মধ্যে কাকে ব্যাপারটা ভাবিয়ে তুলবে আর ভাবিয়ে তুললেও কেবা তার শেকড় উপড়ে ফেলার শক্তি ধরবে, জানি না।এসবের জন্য চাই সর্বস্তরে শিক্ষার প্রসার---  আসল শিক্ষার। শুধু পুঁথিগত শিক্ষা নয়,তার সাথে সাথে চেতনার জাগরণ চাই। এখনো আমরা সত্যি বলতে ভয় পাই,অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ভয় পাই,এমনকি ওই সম্পর্কে লিখেও লেখাগুলি প্রকাশ্যে আনতে ভয় পাই।তাহলে লিখে কী লাভ বলুন তো?ওই একটাই ---লেখার আনন্দ। বেছে বেছে ছাপাবো, পত্রিকাতে পাঠাবো যেগুলোতে কোন প্রতিবাদ নেই,কোন সত্য প্রকাশের  স্পর্ধা নেই ---আছে নিছকই কিছু লেখা।
আমি যখন কবিতা লিখতে শুরু করেছিলাম তখন তো আর  আজকের মতো ফেসবুক ছিলোনা। কোনোদিন সেগুলো বই আকারে যে ছাপানো হতে পারে সেটা অকল্পনীয় ছিল ।কারণ কবিদের আমি  পার্থিব মানুষ বলে ভাবতেই পারিনি কখনো। তাহলে আমার মতো অতি সাধারণ একজন মানুষ সেই সারিতে দাঁড়াবে কী করে? 
তবে আমার ছড়া বা কবিতা আমার ছাত্র-ছাত্রীদের কে এক আধটি মুখস্ত করিয়েছি যেগুলি  ওদের শিক্ষোপযোগী হয়েছে। আমার লেখা ছোট ছোট ছড়া যখন ওরা স্কুলের অনুষ্ঠানে মুখস্ত বলে,তখন আমি চরম আনন্দ পাই। আমাকে আরো লেখার প্রেরণা দেয় এইসব। 
এখন যখন আমি আমার কবিতা ফেসবুকে দিই তখন আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডসদের মন্তব্য আমায় আনন্দ দেয়।ব্যস,এই সবই আপাতত  আমার কবিতা বা ছোট গল্প লেখার কারণ। আর কয়েকটি পত্রিকাতে এক আধটি কবিতা বা গল্প স্থান পেয়েছে।ছাপার অক্ষরে নিজের লেখাকে  দেখতে পাওয়াতে যে কী আনন্দ সেটা লেখালেখি যাঁরা করেন,তাঁরা সকলেই বোঝেন।আর সবশেষে বলি---ভালোভাবে, সুন্দরভাবে এই পার্থিব জগতে  বেঁচে থাকার  এটা একটা অপার্থিব উপকরণ।

Post a Comment

0 Comments