অর্ক কোথায় 

(প্রথম পর্ব)

সৌমেন রায়

চিত্র – কল্লোল মজুমদার

মিষ্টির পিসিমণি বাপের বাড়ি এসেছে। সঙ্গে এসেছে অর্ক। সদ্য পরীক্ষা শেষ হয়েছে  তার। সবদিন পরীক্ষা ভালই হয়  অর্কের, শুধু রেজাল্টটা একটু খারাপ হয়। তবে একেবারেই  যে  খারাপ  তেমনটা নয়।

 অর্ক  বলে, ‘ কি করব? পরীক্ষা শেষ হলেই প্রতিবার মামা বাড়ি  যেতে  হয়।তাই বাধ্য হয়ে মামা বাড়ি গিয়ে কি  করব,কি  খাবো সেই প্ল্যান প্রোগ্রামটা পরীক্ষার সময়ই করতে হয়। তাহলে পরীক্ষা  ভালো  হবে  কি  করে’?

 যেন  ওর মামা বাড়ি আসার কোনো ইচ্ছে নেই, মা জোর করে নিয়ে  আসে। নিজের মামা বাড়ি ছাড়াও গোটা পাড়াটাই তার মামা বাড়ি। তারা সব পিসির জেঠতুতো , খুড়তুতো ভাই। তারা অর্ককে কেউ ডাকে লাড্ডু বলে, কেউ ডাকে মন্ডা বলে। বড় মামা বলে রতন। পাড়ার সবার সঙ্গে পিসির সম্পর্ক ভালো। সেই সুবাদে অর্ক সারাদিন ঘুরে ঘুরে খেয়ে বেড়ায় সব বাড়িতে। তার পাড়া ঘোরার গাইড হলো মিষ্টি।

 এই বাড়িতে খেয়ে অর্ক বলে, ‘ও বাড়িতে বলবে না কিন্তু’।

 পেটুক ছেলেকে খাইয়েও সুখ। তাই সকাল থেকেই চারিদিকে আওয়াজ ওঠে, ‘অর্ক কোথায়? অর্ক কোথায়?’ 

কেউ বলে, ‘গাওয়া ঘিয়ের লুচি ভেজেছি, গরম গরম খেয়ে যা।‘ কেউ বলে, ‘দুধ পুলি করেছি, দুটো মুখে দে।‘ 

একদিন সে হেলেদুলে সব বাড়িতে ভালো-মন্দ খেয়ে ছোট মামার সঙ্গে বসে গেল মাছ ধরতে। ছোটমামা ছিপ ফেলার ব্যাপারে সিরিয়াস। কুরকুটের ডিম, বিশুদ্ধ সরষের খোল, চিটাগুড়, মৌরি, এলাচ,লবঙ্গ, কর্পূর এইসব দিয়ে মশলা বানায়। পড়ায় মন না থাকলে কি হবে ফাতনার দিকে চোখ রেখে বসে থাকতে পারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। মাছ ধরার সময় আশেপাশে কথা বলাও নিষেধ। সেখানে বকবক করে মামার বকুনি খেল অর্ক। কিন্তু ভাগ্যক্রমে সেদিন তার ছিপে একটা সরপুঁটি মাছ পড়ে গেল।

 মাছটা এনে দিদিমাকে বলল,  ‘এটা ভেজে দাও তো’।

 দিদিমা হাসিমুখে মাছ ছাড়িয়ে ভেজে দিল। বেঁটে খাটো দিদিমার মুখে হাসিটি লেগে আছে সর্বদা। অর্কের যত আবদার দিদিমার কাছে। মাছটা খেতে খেতে হঠাৎ কি মনে হলো, একটা পিস শালপাতায় মুড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল অর্ক। 

বহুক্ষণ দেখা নেই তার। পিসির আবার সবেই ভয়। জলে পড়ে যাওয়ার ভয়, বোলতা কামড়ানোর ভয়, খারাপ কথা শিখে ফেলার ভয়, নজর লেগে যাওয়ার ভয়। তাই অনেকক্ষণ দেখতে না পেয়ে পিসি চারিদিকে খুঁজতে লাগল ‘অর্ক কোথায়, অর্ক কোথায়’? 

🍂

সবাই বলল, ‘আছে কোথাও।‘

 কিন্তু পিসির তো মায়ের মন। সবসময় ভয় করে। কলকাতা শহরের সারি সারি ফ্ল্যাটগুলোর একটায় থাকে অর্ক। সেখানের সবকিছু নিয়মে বাঁধা। স্কুলেও নিয়মের খুব কড়াকড়ি। অর্ক বলে স্কুল তো নয় যেন কারাগার। সেই কারণে মামা বাড়ি এলে বাঁধা গরু ছাড়া পেয়ে যায়। কখন কোথায় যায় তার ঠিক নেই। সবাই বলছিল বটে আছে কোথাও কিন্তু যখন দুপুর পর্যন্ত এলো না সবাই পড়ল চিন্তায়। চারিদিকে খোঁজ খোঁজ। গোয়াল ঘরের মাচা, আখের ক্ষেত, বুড়ো পাকুড় তলায় শিবের মন্দির, কল্লা পুকুরপাড়ে গোলঞ্চ তলা কোন আস্তানা বাদ রইল না। কিন্তু পাওয়া গেল না কোথাও।

এদিকে অর্ক শালপাতায় মোড়া মাছের পিসটা ভৈরবকে খাইয়ে তার সঙ্গে জঙ্গলে চলে গেছে গরু চরাতে। ভৈরব মামাবাড়ির রাখাল। মাথায় কুচকুচে কালো কোঁকড়ানো চুল। চেহারা দেখলে মনে হয় পাথর কুঁদে বানানো। গরুগুলোকে জঙ্গলের প্রান্তে ছেড়ে দিয়ে ভৈরব গাছের তলায় বসে ঝোলা থেকে বার করল তার আড় বাঁশিটি। সুর তুলল বাঁশিতে। খানিকক্ষণ হাঁ করে শুনল অর্ক।তারপর ঝোপেঝাড়ে বৈঁচি, সিয়াকুল খুঁজে খুঁজে খেতে লাগলো। হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল জলার দিকে। সেখানে দুলতে লাগলো বট গাছের ঝুরি ধরে ।

 হাঁ হাঁ করে ছুটে এল ভৈরব,’নামো বলছি। ওটা পেত্নী বটগাছ। ও গাছের ধারে পাশে কেউ যায় না, তুমি দোল খাচ্ছ সাহস তো কম নয়!’

নেমে এসে একটু চুপ করে বসল। তারপর একটা পাপিয়া পাখি ডাকতেই আবার উঠে পড়ল। খুঁজে বের করতে চেষ্টা করতে লাগল পাখিটাকে। অনেকক্ষণ পর পাপিয়াটাকে যখন খুঁজে পেল ঠিক তখনই সেটা উড়ে গেল। পিছনে পিছনে ছুটল সে। 

 পিছনে ভৈরব হাঁক দিল, ‘বেশিদূর যেও নি। রাস্তা হেরি যাবে’।

অর্ক পাখির দিকে চোখ রেখে ছুটছে। শুনতে পেল কিনা কে জানে! পাখি এই গাছ থেকে ওই গাছে উড়ে যায়। অর্ক দৌড়ায় তার পিছু পিছু । পাখিটার যখন আর চিহ্ন পাওয়া গেল না তখন উপর থেকে চোখ নামিয়ে দেখল জঙ্গলটা এক্কেবারে অচেনা। গাছগুলো বড় বড়, ঘন লতাপাতা জড়িয়ে আছে। বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব। নিচটা স্যাতস্যাতে। গা ছমছম করে উঠল তার। কোনদিক থেকে যে এসেছিল সেটা কিছুতেই ঠাওর করতে পারলো না। সবদিক একই রকম লাগছে। কি করে বাড়ি ফিরবে এখন? কেন যে পাখিটার পিছনে ছুটল ! চোখে জল এসে গেল তার। 

(পরের অংশ পরের পর্বে)