জ্বলদর্চি

মানুষের দ্বিতীয় জীবন/মইনুদ্দিন সরদার

মানুষের দ্বিতীয় জীবন

মইনুদ্দিন সরদার

মানুষ কখন বেশি স্বপ্ন দেখে? চোখ বন্ধ করলে, না চোখ খুললে?

এই প্রশ্নের উত্তর আমি আজও খুঁজে পাইনি।

ছোটবেলায় মনে হতো, স্বপ্ন শুধু রাতের জিনিস। সন্ধ্যার পর পৃথিবী যখন ধীরে ধীরে অন্ধকারের কাছে আত্মসমর্পণ করত, যখন গ্রামের পথঘাট নিস্তব্ধ হয়ে যেত, যখন জানালার বাইরে দূরের বাঁশবাগানে বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যেত না, তখন ঘুমের ভেতরে এক অদ্ভুত পৃথিবীর দরজা খুলে যেত।

সেই পৃথিবীতে কোনো নিয়ম ছিল না।

এক মুহূর্তে আমি মেঘের ওপর হাঁটছি, পরের মুহূর্তেই সমুদ্রের তলায় হারিয়ে যাওয়া কোনো নগরীর সামনে দাঁড়িয়ে আছি। কখনও মৃত মানুষ ফিরে আসছে, কখনও অচেনা মুখ আপন হয়ে উঠছে, কখনও অসম্ভব ঘটনাও স্বাভাবিক মনে হচ্ছে।

ঘুম ভাঙার পর বুঝেছি—ওগুলো স্বপ্ন।

কিন্তু বড় হতে হতে আমার মনে হয়েছে, রাতের স্বপ্নের চেয়েও বড় আরেক ধরনের স্বপ্ন আছে।

সেটা দিনের আলোয় দেখা যায়।

মানুষ যখন প্রথম আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে—“একদিন আমি ওখানে পৌঁছব”, তখন সে স্বপ্ন দেখে। যখন কোনো দরিদ্র ছাত্র মলিন বইয়ের পাতায় নিজের ভবিষ্যৎ খুঁজে বেড়ায়, তখন সে স্বপ্ন দেখে। যখন কোনো মা সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের অসম্পূর্ণ জীবনটাকে পূর্ণ হতে দেখে, তখনও সে স্বপ্ন দেখে।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, রাতের স্বপ্ন ঘুম ভাঙলে শেষ হয়ে যায়; কিন্তু দিনের স্বপ্ন মানুষকে ঘুমোতে দেয় না।

আমি যত বড় হয়েছি, তত বুঝেছি—মানুষের ইতিহাস আসলে স্বপ্নের ইতিহাস। আগুন আবিষ্কারের আগে কেউ আগুনের স্বপ্ন দেখেছিল। নদী পেরোনোর আগে কেউ ওপারের স্বপ্ন দেখেছিল। আকাশে উড়ার আগে কেউ পাখির ডানায় নিজের ভবিষ্যৎ কল্পনা করেছিল। পৃথিবীর প্রতিটি সৃষ্টি, প্রতিটি আবিষ্কার, প্রতিটি বিপ্লবের জন্ম হয়েছে কোনো না কোনো স্বপ্নের গর্ভে।
🍂
তবু স্বপ্নের সবচেয়ে আশ্চর্য রূপ হয়তো এগুলোর কোনোটাই নয়।

কারণ ঘুমের স্বপ্ন আর জেগে দেখা স্বপ্নের মাঝখানে আরেকটি স্বপ্ন লুকিয়ে থাকে। সেটা হলো মানুষের নিজের ভিতরের স্বপ্ন। যে স্বপ্নের কথা মানুষ কাউকে বলে না। যে স্বপ্নের কোনো ভাষা নেই। যে স্বপ্ন নিঃশব্দে বড় হয়, আবার নিঃশব্দেই হারিয়ে যায়।

কখনও কখনও মনে হয়, মানুষের হৃদয়টাই যেন এক অদৃশ্য স্বপ্নভাণ্ডার—যেখানে পূর্ণ হওয়া স্বপ্নের চেয়ে অপূর্ণ স্বপ্নের সংখ্যাই বেশি। আর সেখান থেকেই শুরু হয় স্বপ্নের আরেকটি রহস্যময় জীবন।

কিন্তু স্বপ্নের গল্প কেবল হারিয়ে যাওয়ার গল্পও নয়।

মানুষের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল সকালগুলোর জন্মও একদিন কোনো স্বপ্ন থেকেই হয়েছিল। যে শিশু প্রথম অক্ষর শেখে, সে একদিন নিজের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে। যে প্রেমিক প্রিয় মানুষের হাত ধরে আগামী দিনের কথা ভাবে, সেও স্বপ্ন দেখে। যে কৃষক বীজ বোনে, যে শিল্পী খালি ক্যানভাসের সামনে দাঁড়ায়, যে কবি সাদা কাগজের দিকে তাকিয়ে থাকে—তাদের প্রত্যেকের ভেতরেই কোনো না কোনো স্বপ্ন কাজ করে।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, স্বপ্ন মানুষকে শুধু ঘুম পাড়ায় না, জাগিয়েও তোলে। অনেক সময় একটি স্বপ্নই মানুষকে দীর্ঘ অন্ধকারের মধ্যেও পথ দেখায়। অনেক সময় একটি স্বপ্নই মানুষকে বারবার ব্যর্থতার পরেও আবার উঠে দাঁড়াতে শেখায়।

হয়তো সেই কারণেই স্বপ্নের ভেতরে আনন্দও আছে, বিষাদও আছে; জাগরণও আছে, আবার ডুবে যাওয়াও আছে। মানুষ কখনও স্বপ্ন দেখে ঘুমিয়ে পড়ে, আবার কখনও স্বপ্ন দেখেই জেগে ওঠে।

আমি প্রায়ই ভাবি, পৃথিবীতে সবচেয়ে নিঃশব্দে হারিয়ে যায় কী? সময়? মানুষ? নাকি স্বপ্ন?

আমার মনে হয়, মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেশি হারিয়ে যায় তার না-বাঁচা জীবনগুলো।

আমরা সাধারণত ভাবি, একজন মানুষ একটি জীবন নিয়েই জন্মায়। কিন্তু বয়স যত বেড়েছে, তত আমার এই ধারণা বদলেছে। এখন মনে হয়, মানুষের শরীর একটি হলেও তার ভিতরে জন্ম নেয় বহু জীবন।

একটি শিশুর চোখে তাকালে আমি কখনও শুধু একটি ভবিষ্যৎ দেখি না। সেখানে একসঙ্গে অনেক সম্ভাবনার আলো জ্বলে। একজন কবি, একজন সঙ্গীতশিল্পী, একজন পথিক, একজন বিজ্ঞানী, একজন প্রেমিক, একজন বিদ্রোহী—কত শত মানুষ যেন তার ভিতরে ঘুমিয়ে থাকে।

কিন্তু জীবন বড় বিচিত্র। সে সবাইকে জাগিয়ে তোলে না। একটি পথ খুলে দেয়, আর বহু পথ নিঃশব্দে বন্ধ করে দেয়।

যে ছেলেটি একদিন সমুদ্রের ওপারে যেতে চেয়েছিল, হয়তো সে কোনোদিন নিজের জেলার সীমানাও পেরোতে পারে না। যে মেয়েটি রঙ দিয়ে পৃথিবী আঁকতে চেয়েছিল, হয়তো সংসারের হিসাবের খাতায় তার দিন ফুরিয়ে যায়। যে মানুষটি গানকে নিজের জীবন করতে চেয়েছিল, সে হয়তো একদিন গানকে বিদায় জানিয়ে অন্য কোনো পেশার কাছে আত্মসমর্পণ করে।

পৃথিবী এসবকে ব্যর্থতা বলে না। বরং বলে—এটাই বাস্তবতা।

কিন্তু বাস্তবতা মেনে নিলেই কি স্বপ্নগুলো মরে যায়?

আমি তা মনে করি না। আমার বিশ্বাস, অপূর্ণ স্বপ্নেরও একটি জীবন আছে।

তারা মানুষের স্মৃতির ভেতরে, দীর্ঘশ্বাসের ভেতরে, নির্জন বিকেলের ভেতরে বেঁচে থাকে। কোনো পুরোনো গান হঠাৎ কেন বুকের মধ্যে অদ্ভুত শূন্যতা জাগায়? কোনো অচেনা পথ কেন মনে করিয়ে দেয়, “এখানে যেন কোনোদিন আসার কথা ছিল”? কোনো সূর্যাস্তের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ কেন মনে হয়, জীবনে কিছু একটা অসম্পূর্ণ রয়ে গেল?

হয়তো সেইসব মুহূর্তে আমাদের ভিতরে ঘুমিয়ে থাকা না-বাঁচা জীবনগুলো কথা বলে।

হয়তো স্বপ্ন শুধু ভবিষ্যতের দিকে ছোড়া কোনো আকাঙ্ক্ষা নয়; স্বপ্ন হলো সেইসব জীবনের স্মৃতি, যাদের আমরা পৃথিবীর আলোয় পূর্ণভাবে বাঁচতে পারিনি।

তখন আমার মনে হয়, মানুষ কেবল তার পূরণ হওয়া স্বপ্ন দিয়ে তৈরি নয়। মানুষ তৈরি তার অপূর্ণ স্বপ্ন দিয়েও।

আর সেই কারণেই স্বপ্নের গল্প কখনও শুধু আনন্দের গল্প নয়; তার মধ্যে বিষাদও আছে, হারিয়ে যাওয়া পথের ধুলোও আছে, আর আছে এমন এক নীরবতা, যার ভাষা আমরা সবাই বুঝি, কিন্তু খুব কম মানুষই উচ্চারণ করতে পারি।

হয়তো সেই কারণেই আমার মনে হয়, স্বপ্নের সঙ্গে মৃত্যুর একটি অদ্ভুত সম্পর্ক আছে।

মৃত্যু যেমন একটি জীবনের সমাপ্তি, তেমনি প্রতিটি অপূর্ণ স্বপ্নও এক একটি নীরব সমাপ্তি। পার্থক্য শুধু এই যে, মানুষের মৃত্যু চোখে দেখা যায়, কিন্তু স্বপ্নের মৃত্যু দেখা যায় না। তার জন্য কোনো শোকযাত্রা বের হয় না, কোনো স্মৃতিফলক গড়ে ওঠে না, কোনো ইতিহাস লেখা হয় না।

যে মানুষটি কবি হতে চেয়েছিল অথচ হতে পারেনি, তার ভিতরে হয়তো একটি কবিতার মৃত্যু হয়েছে। যে মানুষটি পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখেছিল, অথচ সারাজীবন একই আকাশের নিচে আটকে থেকেছে, তার ভিতরে হয়তো একটি দীর্ঘ যাত্রার মৃত্যু হয়েছে। আমরা সেই মৃত্যুগুলো দেখি না, কিন্তু তারা মানুষের হৃদয়ে থেকে যায়—অদৃশ্য ক্ষতের মতো।

তাই কখনও কখনও আমার মনে হয়, স্বপ্ন মৃত্যুর ছোট ভাই। কারণ দুজনেই মানুষকে তার সীমাবদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দেয়।

কিন্তু আবার মনে হয়, এ তুলনাও সম্পূর্ণ সত্য নয়। কারণ মৃত্যু শেষ করে, আর স্বপ্ন শুরু করায়।

একটি স্বপ্ন ভেঙে গেলে মানুষ আরেকটি স্বপ্ন দেখে। একটি আশা নিভে গেলে আরেকটি আলো জ্বলে ওঠে। মানুষের সমস্ত পরাজয়ের মধ্যেও এই যে আবার নতুন করে কল্পনা করার ক্ষমতা, আবার নতুন করে শুরু করার সাহস—সেখানেই স্বপ্নের প্রকৃত বিস্ময়।

হয়তো সেই কারণেই পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র মানুষটিও স্বপ্ন দেখে, আর সবচেয়ে ধনী মানুষটিও। যে শিশুর হাতে খেলনা নেই, সেও স্বপ্ন দেখে; যে বৃদ্ধ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে, সেও দেখে। কারণ স্বপ্ন কেবল ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নয়, স্বপ্ন মানুষের অস্তিত্বেরই একটি অংশ।

আজ এতদিন পরে মনে হয়, মানুষ আসলে দুটি জীবনে বাঁচে।

একটি জীবন সে বাস্তবে বাঁচে।

আরেকটি জীবন সে স্বপ্নে বাঁচে।

বাস্তবের জীবন তাকে পৃথিবীর সঙ্গে বেঁধে রাখে, আর স্বপ্নের জীবন তাকে নিজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।

তাই আজও আমি জানি না, মানুষ কখন বেশি স্বপ্ন দেখে—চোখ বন্ধ করলে, না চোখ খুললে।

শুধু এটুকু জানি, পৃথিবীর সব আলো নিভে যাওয়ার পরও যদি মানুষের ভিতরে একটি স্বপ্ন বেঁচে থাকে, তবে সে সম্পূর্ণ অন্ধকারে হারিয়ে যায় না।

হয়তো সেই কারণেই মানুষ শুধু রুটি, জল কিংবা আশ্রয়ে বাঁচে না।

মানুষ বেঁচে থাকে তার স্বপ্নে।

Post a Comment

0 Comments