মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২১৯
ড. উমা নাগ (শিক্ষাবিদ, সমাজসেবী, তমলুক)
ভাস্করব্রত পতি
তমলুকের মাটির এই মানুষটি তাঁর কর্মগুণে হয়ে উঠেছিলেন তমলুকের প্রোথিতযশা একজন মহিলা। একদিকে শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থেকে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করা, আর অন্যদিকে নিরবচ্ছিন্ন সমাজসেবা এবং নারীমুক্তি কর্মসূচিতে ব্যাপৃত থাকা। এভাবে যে কীর্তি তিনি স্থাপন করেছিলেন একসময়, তা তমলুকের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণযোগ্য ঘটনা।
১৯২৪ সালের ২৬ শে সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তমলুকে বাড়ি হলেও তার জন্ম হয় বিহারের চম্পারণ জেলায় মামার বাড়িতে। বাবা ছিলেন তমলুকের শিক্ষাবিদ হরিপদ নাগ এবং মা নিহারনলিনী দেবী। দাদু প্রসন্ন কুমার নাগও ছিলেন অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি। তিনি ছিলেন অ্যাডভোকেট এবং অনারারি জুডিসিয়াল ম্যাজিস্টেট। স্বাভাবিকভাবেই আদ্যন্ত শিক্ষানুরাগী পরিবারের সন্তান ড. উমা নাগ পারিবারিকভাবেই পেয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার সুযোগ। তিনি তা কাজেও লাগিয়েছিলেন।
ড. উমা নাগের প্রথম পড়াশোনা শুরু হয় তমলুক হিন্দু বালিকা বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে আইনজীবী চণ্ডীচরণ দত্তের স্কুলে পড়াশুনা করেন। ১৯৪০ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। ১৯৪৫ তে তিনি বি.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এডুকেশন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পান। পরবর্তীতে পি এইচ ডি লাভ করেন।
একসময় তমলুক শহরের রাজকুমারী সান্ত্বনাময়ী গার্লস হাইস্কুলে সহপ্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে ধুবুলিয়া উদ্বাস্তু পুনর্বাসন ক্যাম্পের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৫৬ সালে হাওড়া জেলার বালি বঙ্গ শিশু বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকা পদে যোগদান করেন। অতি অল্পদিনের মধ্যে এটিকে তিনি ৫ টি শাখাযুক্ত মালটিপারপাস বিদ্যালয়ে উন্নীত করেন। দক্ষ প্রশাসকের দায়িত্ব কৃতিত্বের সাথে পালনের পাশাপাশি ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে আমেরিকায় উচ্চতর গবেষণার জন্য পাড়ি দেন। অনন্য স্বীকৃতি লাভ করেন সেখানে। দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্য পদও লাভ করেন।
ড. উমা নাগ তাঁর 'সামাজিক পটভূমিকায় তমলুকের স্ত্রী শিক্ষার গোড়ার কথা' গ্রন্থে তমলুকের নারী সমাজের করুণ চিত্র ও শিক্ষার সূচনার ইতিহাস তুলে ধরেছেন। তাঁর বর্ণনায় সান্ত্বনাময়ী গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা সুচরিতা দাশের বিবরণ মেলে। সেসময় তমলুকে শিক্ষিত মানুষজনের সংখ্যা কম ছিলো। দুর্বার স্বাধীনতা আন্দোলনের পীঠস্থান তমলুকে তখন অন্য চিত্র। শিক্ষার পরিবেশ তেমন ছিলনা। ফলে নারীশিক্ষা তো দূর অস্ত। তৎকালীন ব্রাহ্মসমাজের লোকজন অন্য চোখে দেখতে শুরু করে প্রধান শিক্ষিকাকে। কিন্তু নিজের আচরণ, দৃঢ়তা আর উন্মুক্তমনা কুসংস্কার বিরোধী সংস্কৃতিমনস্ক মানসিকতা দিয়ে জয় করলেন রক্ষণশীলতার বেড়া। হয়ে উঠলেন সবার আদরের 'রীতাদি'। সেসময়কার নিষ্প্রদীপ তমলুক তথা তাম্রলিপ্ত শহর আজকের মতো ছিলনা। তিনি স্থানীয় তথা আঞ্চলিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ক নানা প্রবন্ধ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লিখেছেন।
১৯৬৭ সালে দেশে ফিরে আসেন। এরপর রাজস্থানের উদয়পুর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি হোম সায়েন্স বিভাগের ডিন এবং বিভাগীয় প্রধান নির্বাচিত হন। তাঁর কর্মগুণে ইনসপেক্টর অব কলেজেস এর পদ তাঁকে অলংকৃত করতে হয়। পরবর্তীতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ইনস্টিটিউট অব হাউস হোল্ড আর্ট এন্ড হোম সায়েন্স বিভাগে অধ্যাপিকা এবং ডিরেক্টর পদেও (১৯৭০) কাজ । অবসর গ্রহণের পর তিনি তমলুক শান্তি স্মৃতি তাম্রলিপ্ত মহিলা সমিতির প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের সভাপতি পদে আসীন ছিলেন আমৃত্যু। গত ২০১১ এর ১২ ই আগস্ট মৃত্যু হয় এই মহিয়সী মহিলার।
তথ্যঋণ : মন্মথনাথ দাস
0 Comments