জ্বলদর্চি

জঙ্গলমহলের লোকগল্প/জাদুর ঘোড়া/সংগ্ৰাহক- পূর্ণিমা দাস/ কথক- চিত্তরঞ্জন দাস

জঙ্গলমহলের লোকগল্প
জাদুর ঘোড়া

সংগ্ৰাহক- পূর্ণিমা দাস 

কথক- চিত্তরঞ্জন দাস, গ্ৰাম- বেড়াজাল, থানা- নয়াগ্ৰাম, জেলা- ঝাড়গ্ৰাম

বহুদিন আগে দাসপুর গ্ৰামে খোকা নামে এক দরিদ্র চাষি বাস করত। দরিদ্র হলেও সে ছিল খুবই সৎ। কোনোদিন কারোর কোনো ক্ষতি করেনি। কিন্তু তার একটাই দোষ ছিল, সে গরীব। তাই সবসময় তার ঘরে অভাব লেগেই থাকত। চাষবাস করে যা পেত তা অর্ধেকের বেশি জমিদারের খাজনা দিতেই শেষ হয়ে যেত। এই অভাব দূর করার জন্য সে কিছুই করতে পারত না। বাচ্চারা ঠিকমতো খেতে না পেয়ে কান্নাকাটি করত। 

এইসব দেখে কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে শেষপর্যন্ত বউয়ের কথায় খোকা গ্ৰামের মোড়লের কাছে টাকা ধার চাইতে গেল। সে ভালো করেই জানত যে মোড়ল কতটা লোভী ও স্বার্থপর। কিন্তু এছাড়া তার কাছে আর কোনো উপায় ছিল না।

এরপর মোড়লে কাছে পৌঁছে খোকা মোড়লকে বলে-“মোড়লমশাই, মোড়লমশাই আমাকে কিছু টাকা ধার দেবে। এবারে জমিতে ধান লাগানোর জন্য যে চারা কিনব তার জন্য আমার কাছে এক টাকাও নেই। তুমি যদি আমাকে কিছু টাকা ধার দাও তাহলে আমি চাষ করতে পারব। আর হ্যাঁ তুমি কোনো চিন্তা করো না চাষ উঠলে আমি তোমার সব টাকা সুদে আসলে শোধ করে দেব। আর যদি টাকা না দাও তাহলে আমার বউ,বাচ্চা না খেতে পেয়ে মরে যাব। আমাকে দয়া করে কিছু টাকা ধার দাও।”

তখন মোড়ল বলে-“আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে। এত কান্নাকাটি করতে হবে না। দেখ, তোকে বিশ্বাস করে এতগুলো টাকা দিচ্ছি। মনে রাখিস ঠিকসময়ে যেন টাকাগুলো পাই।”
🍂
খোকা বলে-“তুমি কোনো চিন্তা করো না। আমি ঠিকসময়ে সুদসমেত সব টাকা ফেরত দিয়ে দেব।”

এইবলে খোকা মোড়লের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। আর ওই টাকা দিয়ে বীজ কিনে চাষ করে। দিন-রাত পরিশ্রম করে সে সোনার ফসল ফলায়। 

কিন্তু যেদিন ফসল কাটা হবে ঠিক তার আগের দিন রাত্রে খোকার জমির সব ফসল কে যেন খেয়ে নেয়। 

পরদিন সকালে খোকা মাঠে গিয়ে জমির এই অবস্থা দেখে কাঁদতে শুরু করে। তাকে কাঁদতে দেখে গ্ৰামের মানুষরা ছুটে আসে। সবাই হায় হায় করতে থাকে। তাদের মধ্যে একজন বলে-“হায় রে খোকা, তোর একি অবস্থা হল। আর কিছুদিন পরে তো মোড়ল সুদসমেত সব টাকা ফেরত চাইবে, তখন তুই কী করবি?”

এই কথা শুনে খোকা খুবই ভয় পেয়ে যায়। এরপর সে সেখানে আর কিছু না বলে বাড়ি ফিরে আসে। আর বাড়ি এসে তার বউকে সব কথা বলে।

সে তার বউকে বলে-“এখন আমাদের কী হবে বউ? কে যে রাতের আধাঁরে আমাদেরই সব ফসল খেয়ে নিল কে জানে? এদিকে ঘরে অভাব, আর অন্যদিকে মোড়লের সব টাকা ফেরত দিতে হবে। এবার যে আমি কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না।”

তার বউ তখন বলে-“তুমি এভাবে ভেঙে পড় না। তুমি এভাবে ভেঙে পড়লে আমাদের কী হবে বল তো? আমি বলি কী তুমি আর একবার মোড়লের কাছে যাও। আর সব কিছু বলে আরও কিছু টাকা ধার নিয়ে এসো।”

এই শুনে খোকা বলে-“এমনিতেই আগের টাকা শোধ দিতে পারিনি। তার উপর আবার যদি টাকা ধার চাইতে যাই, তাহলে মোড়ল আর আমায় আস্ত রাখবে না।”

তার বউ তখন বলে-“আরে আগে তুমি যাও তো। তারপর কে কী বলছে তা পরে দেখা যাবে। এবার থেকে আমরা সবসময় সজাগ থাকব। যাতে কেউ আমাদের ফসলের ক্ষতি করতে না পারে।”

এরপর খোকা তার বউয়ের কথামতো আবার মোড়লের কাছে টাকা ধার চাইতে যায়। যাতে সে আবার চাষ করতে পারে।

খোকাকে আবার টাকা ধার চাইতে দেখে মোড়ল বলে-“আচ্ছা খোকা তোর লাজ লজ্জা কিছু নেই নাকি রে? আগের টাকা এখনও শোধ করিসনি। তারপরেও কোন মুখে টাকা ধার চাইতে এসেছিস?”

তখন খোকা কান্না ভেজা গলায় বলে-“আমাকে দয়া করো মোড়লমশাই। টাকা ধার না দিলে আমরা না খেতে পেয়ে মরে যাবো। আগের বার তো তুমি শুনেছ আমার ফসলের কী অবস্থা হয়েছে। আর একটিবার আমাকে দয়া করো। আমাকে দয়া করো…….”

এরপর মোড়ল বলে-“আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমি তোকে টাকা ধার দিতে পারি, কিন্তু একটা শর্তে।”

খোকা বলে-“কী শর্ত?”

মোড়ল বলে-“আমি তোকে টাকা দেব। কিন্তু এবার যদি টাকা শোধ করতে না পারিস, তাহলে আমি তোর চাষের জমিটা নিয়ে নেব।”

এই শুনে খোকা বলে-“কী! জমি কেড়ে নেবে? এ কী বলছ তুমি? ওই চাষের জমিটাই যে আমার শেষ সম্বল। ওটা কেড়ে নিলে আমরা সবাই পথে বসব। এইরকম শর্ত দিও না মোড়লমশাই, দিও না।”

মোড়ল বলে-“আমি এতসব কিছু জানি না। এই শর্তে যদি রাজি থাকিস বল। তা নাহলে দূর হয়ে যা এখান থেকে।”

তখন খোকা কোনো উপায় না পেয়ে বলে-“আচ্ছা ঠিক আছে। তোমার শর্তে আমি রাজি।”

এরপর খোকা মোড়লের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। আর তার বউকে বলে-“জানো বউ, মোড়ল আমাকে বলেছে এবার যদি টাকা শোধ করতে না পারি তাহলে ও আমাদের জমিটা কেড়ে নেবে। আর বউ এবারও আমাদের জমির ফসল যদি কেউ খেয়ে নেয় তাহলে কী হবে?”

তার বউ তখন বলে-“তুমি কোনো চিন্তা করো না। এইবার আমরা ফসল কাটার আগের রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে জমি পাহারা দেব। দেখব এইবার কে আমাদের ফসল খায়?”

এরপর তারা আবার ফসল ফলায়। দেখতে দেখতে ফসল কাটার সময় চলে আসে। কিন্তু তাদের মনে কোনো আনন্দ থাকে না। তারা ভয় পায় যে এবারও যদি কেউ তাদের ফসল খেয়ে নেয়, তাহলে মোড়ল তাদের এই জমিটাও কেড়ে নেবে। 

এরপর আগের কথামতো খোকা ও তার বউ ফসল কাটার আগের রাতে জমির কাছে একটি বড়ো গাছের আড়ালে গিয়ে লুকিয়ে জমি পাহারা দিতে থাকে। 

কিছুক্ষণ পরে ওরা দেখতে পায় আকাশ থেকে কী যেন একটা উড়ে আসছে। কাছে আসতে দেখে ওটা আর কিছু নয় ওটা এক পক্ষীরাজ ঘোড়া। ঘোড়াটিকে দেখে খোকা ও তার বউ অবাক হয়ে যায়।

এরপর ওরা দেখে ঘোড়াটি জমিতে নেমে ধান খেতে শুরু করে। ঠিক তখনই খোকা ও তার বউ চুপিচুপি গিয়ে জাল দিয়ে ঘোড়াটিকে ধরে ফেলে। 

জালের ভেতরে ছটপট করতে করতে ঘোড়াটি বলে-“দয়া করে, দয়া করে আমাকে ছেড়ে দাও। আমি কথা দিচ্ছি এরপর থেকে আমি আর কখনো কারোর ফসল খাব না। দয়া করে আমাকে ছেড়ে দাও।”

ঘোড়াটিকে এইভাবে কাঁদতে দেখে খোকা ও তার বউর খুব কষ্ট হয়। তাই তারা ঘোড়াটিকে ছেড়ে দেয়। 

ছাড়া পেয়ে ঘোড়া খুব খুশি হয়। আর খোকা ও তার বউর এরূপ ভালো স্বভাব দেখে জাদু ঘোড়া ওদের কলশি ভর্তি সোনাদানা উপহার দেয়। আর বলে-“তোমরা খুব ভালো ও দয়ালু। তোমাদের এইরকম স্বভাবে খুশি হয়ে আমি তোমাদের এগুলো দিলাম। আমার মনে হয় এগুলো তোমাদের খুব কাজে লাগবে। এইবার তাহলে আমি আসি।”

এইবলে ঘোড়াটি সেখান থেকে চলে যায়। 

এরপর খোকা ও তার বউ ওই সোনাদানা ভর্তি কলশি নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। আর ওই থেকে কিছু বিক্রি করে মোড়লের সব টাকা শোধ করে দেয়। তাদের ঘরে আর অভাব থাকে না। এরপর থেকে খোকা তার বউ বাচ্চাদের নিয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকে।

Post a Comment

0 Comments