জ্বলদর্চি

মধুবাবুর অটো - পাস/কমলিকা ভট্টাচার্য

মধুবাবুর অটো - পাস
কমলিকা ভট্টাচার্য 

ঘরের ভিতর হঠাৎ একটা বাজে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।
কল্যাণীদেবীর নাকে পৌঁছানোর আগেই মধুবাবু নাক কুঁচকে বললেন, — "উফ! একটা পচা গন্ধ আসছে!"
কল্যাণীদেবী বিরক্ত হয়ে বললেন, — "উহ্! তুমি আবার!"
বলেই নাকে আঁচল চাপা দিলেন।
মধুবাবু তড়িঘড়ি প্রতিবাদ করলেন, — "না না, আমি নই!"
কল্যাণীদেবী চোখ পাকিয়ে বললেন, — "এই গন্ধ আমার তিরিশ বছরের চেনা। আর প্রতিবারই তোমার একই সংলাপ— 'আমি নই'!"
মধুবাবু গম্ভীর মুখে বললেন, — "দেখো কল্যাণী, এটা কোনো খারাপ জিনিস নয়। এটা হলো শরীরের অতিরিক্ত বায়ুর স্বাধীনতা ঘোষণা!"
কল্যাণীদেবী আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে থেকে জানালা খুলে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন।
মধুবাবু বললেন, — "তোমার যত বাড়াবাড়ি! এখন রাতে জানালা খুলে দাঁড়ালে মশা ঢুকবে। আর তুমি তো জানো, মশারা তোমায় কামড়ায় না।"
কল্যাণীদেবী বললেন, — "কেন?"
— "আমার মতো মিষ্টি বোঝাই রক্ত ছেড়ে কেউ তেতো রক্ত খায় নাকি?"
কল্যাণীদেবী দরজা-জানালা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে বললেন, — "দেখো, আজ থেকে আমরা মৌন থাকব। কেউ কারুর সাথে কথা বলবো না,কোনো কথা বললেই ঝগড়া শুরু হয়।"
মধুবাবুও সম্মতি দিলেন। — "ঠিক আছে। আজ থেকে সম্পূর্ণ মৌন।"
🍂
কল্যাণীদেবী সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে নিয়মমতো সব কাজ সেরে সবে সোফায় বসেছেন।
মধুবাবু মৌনব্রত ভাঙবেন না বলে মোবাইল বের করলেন। চোখে কম দেখেন, আবার চশমাটা কোথায় রেখেছেন তাও মনে নেই।
তিনি লিখতে গেলেন—
"চা কর।"
কিন্তু মেসেজ গেল—
"চাকর।"
কল্যাণীদেবী মেসেজটা পড়ে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে তাঁর মুখের রং পাল্টাতে লাগল।
মনে মনে বলতে লাগলেন"তিরিশ বছর সংসার করার পর আমি এখন চাকর!"
মধুবাবু দেখলেন মুখের অভিব্যক্তি খুব একটা সুবিধার নয়। তিনি তাড়াতাড়ি লিখলেন—
"করবে কি না?"
কিন্তু চোখের দোষে 'ক' হয়ে গেল 'ম'।
মেসেজ পৌঁছল—
"মরবে কি না?"
কল্যাণীদেবীর চোখ ছলছল করে উঠল।
মধুবাবু তো কিছুই বুঝতে পারছেন না। তিনি ভাবলেন, "চা করতে বললাম, এত কষ্ট পেল কেন?"
তিনি আবার লিখলেন—
"আমি করি?"
সেই একই ভুল!
মেসেজ গেল—
"আমি মরি?"
এবার কল্যাণীদেবী কোনো উত্তর না দিয়ে উঠে নিজের ঘরে চলে গেলেন। দরজাটাও ধপাস করে বন্ধ।
মধুবাবু মাথা চুলকে ভাবলেন, — "চা বানাতে এত আপত্তি কেন?"
তিনি আবার মোবাইল হাতে নিলেন। এবার খুব সাবধানে লিখলেন—
"সরি, শরীর খারাপ?"
কিন্তু চোখের দোষে আর অটোকারেক্টের দয়ায় পৌঁছল—
"অশরীরী!"
কল্যাণীদেবী মেসেজটা পড়ে আঁতকে উঠলেন।
— "আমাকে ভূত বলছে!"
মধুবাবু আবার লিখলেন—
"বাইরে এসো, শাকটা গিন্নি রান্না করো।"
মেসেজ পৌঁছল—
"বাইরে এসো, শাকচুন্নি রান্না করো।"
এইবার কল্যাণীদেবী ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে এলেন। মুখে একটাও কথা নেই। সোজা রান্নাঘরে চলে গেলেন। ভাবলেন আজ রান্নাটা সেরে তিনি আজই বাপের বাড়ি চলে যাবেন।এই মানুষের সাথে আর একদিনও নয়।

মধুবাবু এদিকে গিন্নিকে রান্না করে ঢুকতে দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে সোফায় বসে লিখলেন—
"রিমোট কোথায়?"
মেসেজ পৌঁছল—
"কি মোটা!"
রান্নাঘর থেকে শুধু একটা চাপা গর্জন শোনা গেল।
মধুবাবু আঁতকে উঠে লিখলেন—
"কি হল, মিসেস?"
কিন্তু 'হ' আর সেস বাদ পড়ে মেসেজ গেল—
"কিল মি!"
কল্যাণীদেবী বিড়বিড় করে বললেন,
— "তিরিশ বছরের সংসারের শেষে আমাকে এসবও শুনতে হবে!"
এরপর তিনি রেগে লিখলেন—
"মেসেজ বন্ধ করো। আমার মাথা ব্যথা করছে।"
মধুবাবু শেষ চেষ্টা করলেন।
লিখলেন—
"এক কাপ চা খেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।"
মেসেজ গেল—
"এক চাপড় খেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।"
এরপর আর কোনো মেসেজ এল না।
শুধু রান্নাঘর থেকে বেলনটা হাতে নিয়ে কল্যাণীদেবী বেরিয়ে এলেন।
মধুবাবু দূর থেকেই বেলন দেখে বুঝে গেলেন— কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে।
তিনি তাড়াতাড়ি দু'হাত জোড় করে বললেন,
— "মেসেজ না করে তোমাকে একটু ম্যাসাজ করে দিই?"
কল্যাণীদেবী কোনো উত্তর দিলেন না। গম্ভীর মুখে একবার মধুবাবুর দিকে তাকালেন। তারপর আলমারি থেকে তাঁর চশমাটা এনে হাতে ধরিয়ে দিলেন।
মধুবাবু চশমা পরে নিজের পাঠানো মেসেজগুলো পড়ে মাথায় হাত দিয়ে বললেন,
— "আমার দোষ নয়... সব অটোকারেক্টের কীর্তি!"
ঠিক তখনই—
পুঁঁউঁউঁ...
ঘরের ভিতর আবার সেই পরিচিত গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।
কল্যাণীদেবী আঁচল দিয়ে নাক চেপে বললেন,
— "উফ! এইবারও কি অটোকারেক্ট?"
মধুবাবু গম্ভীর মুখে উত্তর দিলেন,
— "না... এটা অটো-পাস!"
এক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর কল্যাণীদেবী নিজেও হেসে ফেললেন।
মধুবাবুও হেসে উঠলেন
আর বললেন," সব ঝগড়ার শেষ হল একটু বায়ু পরিবর্তন।"

সবাইকে জানাই কৌতুক দিবসের শুভেচ্ছা।হাসতে থাকুন ,হাসাতে থাকুন।

Post a Comment

0 Comments