জ্বলদর্চি

দূর দেশের লোকগল্প— ২৯৪ অকৃতজ্ঞের দুর্দশা /নাইজেরিয়া (আফ্রিকা)/চিন্ময় দাশ

দূর দেশের লোকগল্প— ২৯৪

 অকৃতজ্ঞের দুর্দশা

 নাইজেরিয়া (আফ্রিকা)

চিন্ময় দাশ


অনেক কাল আগের কথা। এক বনে তিন বন্ধু ছিল। একটা চিতাবাঘ, এক শেয়াল আর এক হায়না। বেশ মিলমিশ তিনজনের। যেখানেই যায়, তিনজনে যায়। যা কিছু খায়, তিনজনেই খায়। পার্থক্য কেবল একটাতেই। শিকারের বেলায় অন্যরা থাকে না। বাঘ একলাই শিকারে যায়।

এ ব্যবস্থাটা বাঘের নিজের। বাকি দুজন আপত্তি করছিল—আমরা ঘরে বসে থাকব কেন? আমরাও থাকব সাথে।

বাঘ জবাব দিয়েছে—আমি থাকতে তোমরা কেন হয়রাণ হতে যাবে। দরকারটাই বা কী? তাছাড়া, আমাদের তিনজনের খাওয়া। বড়-সড় শিকার না হলে চলবে না। সে তো আর তোমাদের কাজ নয়। তোমরা করলে, ছোটখাট কিছু শিকার করবে। তাতে কী হবে? তাছাড়া, তার দরকারটাই বা কী? আমি যা আনব, তাতে আমাদের তিনজনের বেশ চলে যাবে। 

শেয়াল আর হায়েনা ভেবে দেখল, দারুণ ব্যবস্থা। কোন খাটাখাটুনি নাই। দিনের পর দিন দিব্বি ঘরে বসে ভোজ খেয়ে যাওয়া যাবে।

তবু মুখরক্ষার জন্য, শেয়াল বলল—কিন্তু বন্ধু, খাবো আমরা তিনজন। আর, শিকার করবে তুমি একা। সেটা কি ভাল দেখায়?

বাঘ হাসি মুখ করে বলল—এতে খারাপ দেখাবার কী আছে? আমাদের সম্পর্ক তো বন্ধুত্বের।

আর কেউ কথা বাড়ায়নি। সেদিন থেকে এই ব্যবস্থাটাই চলছিল। চলে আসছে, তার কারণ, ব্যবস্থাটা বাকি দুজনের পক্ষে মোটেই মন্দ নয়। আর, বাঘের পক্ষেও মন্দ নয়। কেন না, শিকার তো তাকে করতেই হোত। বাকি দুজনের পেট আর কতটুকু?

কিন্তু এ ব্যবস্থাটা বেশিদিন টেকেনি। বেশি দিন টেকেনি তিনজনের গলাগলি বন্ধুত্বটাও। সেই ঈর্ষা করার মত বন্ধুত্বটা আজ আর নাই। 

বাঘও আজ আর শিকার করে এনে, বাকি দু’জনকে ভাগ দেয় না। আগেকার দিনে কী হোত? শিকার করে, সেখানেই খেতে বসে যেত না চিতা। বাসায় নিয়ে আসত। তিন জনে মিলে একসাথে খেত।

এখন আর সেটা করে না চিতা। শিকার করেই বড় একটা গাছ খুঁজে নেয় সে। শিকার মুখে নিয়ে, সোজা একেবারে মগডালে উঠে পড়ে। সেখানে বসেই ভোজ সারে। মাংসের একটা টুকরোও জোটে না শেয়াল আর হায়েনার কপালে। 

🍂

তাদের এত সুন্দর, এত গভীর বন্ধুত্বটা টিকল না কেন, সেটা এবার বলা যাক।  

একদিন হয়েছে কী, বাঘের শরীরটা মোটেই ভালো নাই। শিকারে যাওয়া একেবারেই সম্ভব নয়। তাই শেয়ালকে ডেকে বলল—ভাই, শেয়াল! আজ তুমি একটু শিকারে যাও। 

শেয়াল যেন আকাশ থেকে পড়ল—কেন, বন্ধু? আজ হঠাৎ এ কথা কেন? 

বাঘ বলল-- আজ শরীরে তেমন যুৎ নাই আমার। দৌড়ে পেরে উঠব না। 

সে কথা শুনে তো চক্ষু চড়কগাছ শেয়ালের। সে নিজের জন্য এটা-ওটা চুরি-টুরি করে, কোনও রকমে চালিয়ে নেওয়ার লোক। কিন্তু বাঘের পেট ভরাতে গেলে তো বড় শিকার চাই। সেটা করবার শক্তি কোথায় তার? এদিকে বড় শিকার ছাড়া, তিনজনের পেটও ভরবে না। তাও আবার বাঘের পেট।

আসলে, শেয়ালের সমস্যা অন্য। এতদিন বসে বসে খেয়ে, শরীরও ভারি হয়ে গেছে তার। সঙ্কটে পড়ে গেলে, সুড়ুৎ করে সটকে পড়বে, তার উপায় নাই। 

গলা একেবারে খাদে নামিয়ে, শেয়াল বলল—নাহে, বন্ধু। আমারও আজ শরীরটা ভাল নাই। ভারি ক্লান্ত লাগছে। তুমি বরং হায়নাকে বল।

বাঘ তখন হায়েনাকে বলল—শুনলে তো, ভাই। আজ আমার শরীরটা ভাল নাই। শেয়ালও যেতে পারবে না বলছে। তুমি আজ আমাদের জন্য শিকারটা করে আনো। 

হায়েনা দেখল, ভারি ঝামেলা তো। বেশ চলছিল। আজ আবার এ কী উটকো আপদ। তিন জনের, বিশেষ করে বাঘের খাদ্য জোগাড় করা কি চাট্টিখানি কথা না কি? 

সে করুণ মুখ করে বলল—তোমাদের বলা হয়নি, বন্ধুরা। আমার তো পায়ের যন্ত্রণা। কাল সারা রাত ঘুমাতে পারিনি আমি। এই পা নিয়ে, কী করে শিকারে যাই আমি? 

সব শুনল বাঘ। কিন্তু বুঝতে কোনও অসুবিধা হোল না। এতদিন ঘরে বসে বসে আমার শিকার করে আনা খাবারে দিব্বি পেট ভরালে দুজনে। আজ একটা দিন আমার বিপদের সময়, এই ব্যবহার তোমাদের? এই তোমাদের বন্ধুত্ব? ঠিক আছে, দেখাচ্ছি মজা।

মুখে বলল—সব তো বুঝলাম, হে। কিন্তু কেউ না গেলে, তো স্রেফ উপবাসে দিন কাটাতে হবে। 

হায়েনা তাড়াতাড়ি বলল—তাতে এমন কিছু এসে যাবে না। গরম কালের কথাই ধরো না। সব দিন কি খাবার জোটে আমাদের? আজ বিশ্রাম নিয়ে সেরে ওঠো তুমি। কাল বেরোবে তখন। 

শেয়াল তো বুদ্ধিমান জীব। কথাও বলে মাপামাপি করে। সে বলল—অত চিন্তার কী আছে এতে? শরীর যখন খারাপ, একটা দিন উপোষ দেওয়াই তো তোমার পক্ষে ভালো। দেখবে, কাল কেমন শরীরটা ঝরঝরে লাগবে। বাড়তি শক্তি নিয়ে বেরোতে পারবে কাল। হাতেনাতে ফল পেয়ে যাবে তুমি। 

বাঘ এসব কথার কোন জবাব দিল না। মনে ভাবল, ফল তোমরাও পেয়ে যাবে কাল, একেবারে হাতেনাতেই। আমাকে সেরে উঠতে দাও।

শরীর সেরেছে। আবার শিকারে বেরিয়েছে চিতা। ফিরল একটা নধর হরিণ টানতে টানতে। পেট চুঁই-চুঁই করছে। 

এমন একটা শিকার হয়েছে দেখে, জল ঝরতে লেগেছে শেয়ালের জিভ থেকে। হায়েনা ঠোঁট চাটতে লেগেছে। কাল সারাদিন কিচ্ছুটি পেটে পড়েনি তাদেরও।  

সব দেখেও, কোনও কিছুই দেখল না চিতা। মুখে হরিণের টুঁটি কামড়ে ধরা। দুই সাগরেদের দিকে চেয়েও দেখল না একবার। সর-সর করে সামনের একটা গাছে উঠে পড়ল।

চিতার কাণ্ডকারখানা দেখে, শেয়াল আর হায়েনার মুখ হাঁ হয়ে গেছে। কিছুই মাথায় ঢুকছে না তাদের। এমনটা তো কোনও দিন হয় না। অবাক হয়ে উপর দিকে চেয়ে রইল তারা দুজনেই।

কতক্ষণ পরে, শেয়াল আর থাকতে না পেরে, বলল—এটা কী হল, বন্ধু? শিকার নিয়ে গাছে চড়ে পড়লে যে? 

গাছের একেবারে মগডালে চড়ে উঠেছে চিতা। সেখান থেকেই বলল—আমি এতদিন জানতাম, তোমরা আমার বন্ধু। আসলে তোমরা দুটিতে অলস আর ধূর্ত। হতভাগা সব। দুটোই তোমরা বদমায়েসের ধাড়ি।

শেয়াল আর হায়েনার মুখে কথা নাই। কী জবাব দেবে তারা এ কথার? 

চিতা বলল-- এটাই বহাল রইল আজ থেকে। নিজের মত শিকার করব। নিজেই খাব। একটা টুকরোও যাতে তোমাদের কপালে না জোটে, সেটাও মাথায় রাখব। মাংসের একটা কুচিও নীচে পড়তে দেব না।

কিছুই বুঝতে পারছে না দু’জনে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে।

চিতা আবার বলল—মাংস যা বাড়তি হবে। সব তুলে রেখে যাব এখানে। একটা টুকরোও নীচে ফেলব না। 

নিজেদের দুর্ভোগের কথা বুঝে গেছে দুজনেই। আকাশের বাজ এসে ভেঙে পড়েছে দুজনের মাথায়। তারা কাকুতি-মিনতি করতে লাগল। দোষ কবুল করল। আর কোনও দিন এমন ভুল আর হবে না। এমনই সব নানান ছেঁদো কথা। কিন্তু চিতাকে এক্টুও টলানো গেল না। কানেই তুলল না কোনও কথা। আয়েস করে মাংস চিবাতে লাগল। 

আজও দেখা যায়, শিকার ধরে, গাছে চড়ে যায় চিতারা। ভোজনপর্বটা তারা ওপরেই সেরে নেয়। আর, শেয়াল হায়না? সেদিন থেকেই তাদের দুর্দশার দিন শুরু। আজও তারা মূলত উচ্ছিষ্টভোজী। শিকার করে খাওয়া সেরে, বাঘ বা সিংহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যা ফেলে যায়, তাই দিয়ে পেট চলে তাদের!

Post a Comment

0 Comments