তনুশ্রী ভট্টাচার্য্য
রবীন্দ্রনাথকে কি বিজ্ঞানী বলা যায়? বাক্যটি পড়েই সমুদয় মানুষ রে রে করে উঠবেন জানি কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানমনস্কতা যে উঁচু তারে বাঁধা ছিল আজীবন, সাহিত্যে যেভাবে সেই মননকে বিস্তারিত করেছেন তাতে যে কোনো বিজ্ঞানীর বিজ্ঞান মনস্কতা থেকে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই তিনি। রবীন্দ্র সৃষ্টি সাগরে অন্বেষণ করলে এমন বহু উদাহরণ বা রেফারেন্স পাওয়া যাবে যেখানে পদার্থবিজ্ঞান বা জীববিজ্ঞানের মৌলিক তত্ত্বগুলো সুন্দর ভাবে প্রতিভাত হয়েছে।
খুব ছোটোবেলা থেকেই রবীন্দ্রনাথ ভূগোল বিজ্ঞানের পাঠ পেয়েছেন পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের কাছে থেকে। হিমালয় ভ্রমণকালে ডালহৌসি পাহাড়ে রোজ সন্ধ্যে বেলায় বসে বাবার কাছে শিখতেন আকাশের গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান, সূর্য থেকে গ্রহদের দূরত্ব, গ্রহদের আয়তন, ঘূর্ণন প্রভৃতি জটিল বিষয়। বালক রবি এই সান্ধ্যকালীন জ্যোর্তিবিজ্ঞান চর্চায় খুব আনন্দ পেতেন। মাত্র বারো বছর বয়সে লিখে ফেললেন সুচারু গদ্য -- 'গ্রহগণ জীবের আবাসভূমি'। প্রকাশ পেল অক্ষয় কুমার দত্তের তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায়। সাধনা, ভারতী, বালক পত্রিকায় নিয়মিত লিখতে লাগলেন বৈজ্ঞানিক সংবাদ ,মানবশরীর,দেবতায় মনুষ্যত্ব আরোপ, ইচ্ছামৃত্যু, গতি নির্ণয়ের ইন্দ্রিয়, উদয় অস্তের সূর্য, ঈথার প্রভৃতি বিচিত্র বিষয়ের ওপর ছোটো ছোটো নিবন্ধ। পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানের অগ্রগতির সংবাদ বাহক বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ঠাকুর বাড়িতে আসত এবং তিনি যে সেগুলো সম্বন্ধে অবহিত থাকতেন তা বলাই বাহুল্য। সতেরো থেকে তেত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি বেশ কয়েকটি বৈজ্ঞানিক নিবন্ধ লেখেন।
🍂
অজস্র রবীন্দ্র সঙ্গীতে আমরা পাই তাঁর বিজ্ঞান চেতনা। পৃথিবী সৃষ্টি রহস্যে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা আর ভারতীয় উপনিষদের ব্যাখ্যার সম্মিলন ঘটছে তাঁর সঙ্গীতে। আকাশভরা সূর্য তারা বিশ্বভরা প্রাণ, মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল মাঝে আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে ,প্রথম আদি তব শক্তি আদি পরমোজ্জ্বল জ্যোতি তোমারি হে গগনে গগনে প্রভৃতি অজস্র গানে তিনি সেই অজ্ঞেয় শক্তিকেই সম্বোধন করেছেন। পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানে তখনো বিগব্যাং থিয়োরী আবিস্কার হয় নি। এক দুর্মর রহস্য জালে আটকা পড়ে আছে পৃথিবী সৃষ্টির রহস্য। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ একের পর এক গানে সেই আদি শক্তিকে চিহ্নিত করছেন । প্রভাত সঙ্গীত কাব্যগ্রন্থের 'সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়' কবিতা ভারতীয় পুরাণের কাব্যিক ভাষ্য---'দেশশূন্য কালশূন্য জ্যোতি:শূন্য মহাশূন্য--'পরি চতুর্মুখ করিছেন ধ্যান।' এর অনেক পরে বিজ্ঞান বলছে এক মহাশূন্য থেকেই প্রচন্ড বিস্ফোরণে পৃথিবীর সৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথ বৈজ্ঞানিক সত্যকে কাব্যিক সত্যে রূপান্তরিত করলেন।
যত দিন এগিয়েছে ততই রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞানমনস্কতা নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন। সমুদ্রের প্রতি, বৃক্ষ বন্দনা, নবজাতক, পৃথিবী --প্রতিটি কবিতাতেই পদার্থবিজ্ঞানের স্ফুলিঙ্গ পাওয়া যায়।
সাতকড়ি দত্ত , সীতানাথ দত্ত প্রভৃতি শিক্ষকের কাছে ছোটোবেলায় বিজ্ঞানের ছোটো ছোটো রহস্য গুলি হাতে কলমে করে সমাধান করতেন। রবীন্দ্রনাথ বলছেন ,'প্রতি রবিবার সীতানাথ দত্ত বিজ্ঞান পড়াতে আসতেন । তিনি যন্ত্রতন্ত্রযোগে বিজ্ঞান পড়াতেন। যে রবিবার আসতেন না সেটিকে রবিবার বলে মনে হোত না'। বোঝাই যাচ্ছে বালক রবি বিজ্ঞানের প্রতি কতটা আকৃষ্ট ছিলেন। অলডাস হাক্সলি, লকইয়ার ,নিউকোম্ব প্রভৃতি লেখকদের বিজ্ঞান ব্যাখ্যা সম্বলিত বইগুলি ছিল তাঁর অত্যন্ত পছন্দের। আর সেখান থেকেই রসদ পেয়ে কবিতায় গানে ঘটাচ্ছেন তার প্রতিফলন। সঙ্গে আছে উপনিষদের জ্ঞান।
'দেখিলাম চাহি, শতশত নির্বাপিত নক্ষত্রের নেপথ্য প্রাঙ্গনে --নটরাজ নিস্তব্ধ একাকী।' পৃথিবী সৃষ্টি তত্বের দুর্জ্ঞেয় ভাষ্য এইভাবেই কবিতায় লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ। পৃথিবী কবিতায় ইঙ্গিত দিচ্ছেন সেই প্রবল বিস্ফোরণের, মহাকালের শূন্যতার ---
অনাদি সৃষ্টির যজ্ঞহূতাগ্নি থেকে বেরিয়ে এসেছিলে
সংখ্যাগণনার-অতীত প্রত্যূষে;
বাড়ির ছেলেরা গেল কলকাতা মেডিকেল কলেজের লাশকাটা ঘরে মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ দেখতে। ঠাকুর বাড়ির ছেলেরা এইভাবেই শিক্ষিত হোত সে সময়ে। ফিরে যে যার মতো করে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করল। সে সময়ের কিশোর রবি বহু বছর পরে সেই অভিজ্ঞতা থেকে লিখলেন 'কঙ্কাল' নামের অসাধারণ ছোটো গল্পটি। বস্তুত ল্যাবরেটরি, রবিবার শেষকথা,--- তিনসঙ্গী নামে পরিচিত এই তিনটি ছোটো গল্পতেই রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানের প্রতি প্রেম ও চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।
বিজ্ঞানী বন্ধু জগদীশচন্দ্রের যাবতীয় বৈজ্ঞানিক কার্যকলাপ সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের ঔৎসুক্য ছিল অপরিসীম। সব খুঁটিনাটি বিষয় তিনি খোঁজ রাখতেন। ১৯০১ সালে বঙ্গদর্শনে বন্ধুর সাফল্যে 'আচার্য জগদীশের জয় বার্তা' নামে প্রবন্ধ লিখলেন। এর পরেই লিখলেন সেই অমোঘ প্রশ্ন-- 'জড় কি সজীব ?' নামে একটি নিবন্ধ। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন জ্যোর্তিবিজ্ঞান আর জীববিজ্ঞান ছিল তাঁর পছন্দের বিষয়।
এবং শেষ বয়সে তিনি বিজ্ঞানের পত্র পত্রিকা ছাড়া কিছুই পড়তেন না। প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবীশকে রাশিবিজ্ঞানে উৎসাহিত করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। নিজের ছেলে রথীন্দ্রনাথ আর জামাই নগেন্দ্রনাথ দুজনকেই কৃষিবিজ্ঞান পড়াতে পাঠালেন আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। এমনকি নাতি নীতুকেও প্রিন্টিং টেকনোলজি পড়তে জার্মানি পাঠালেন। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতেন অবলীলায়। জাভা ভ্রমণকালে আকৃষ্ট হয়েছিলেন বাটিকের কাজে। কাপড় আর চামড়ার ওপর আলপনা দেওয়ার পদ্ধতি। শান্তিনিকেতনে সেটির প্রয়োগ ঘটালেন নিজ উদ্যোগে। আজ সেটি বিশ্বজোড়া খ্যাতির অধিকারী। সম্প্রতি সেটি জি আই ট্যাগ পেয়েছে (যদিও বিতর্ক আছে) । শেষ বয়সের দিকে চিঠি গুলোতে বিজ্ঞানের অনুসন্ধিৎসার ব্যগ্র প্রকাশ থাকত। ছিয়াত্তর বছর বয়সে লিখলেন 'বিশ্ব পরিচয়' নামে একটি গ্রন্থ যেটিকে বেসিক সায়েন্সের পর্যায়ে ফেলা যেতে পারে এবং এটি উৎসর্গ করলেন বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বোস কে। এবং এই বইটির বিশেষ প্রবন্ধ গুলো স্কুল পাঠ্য হওয়া দরকার বলে মনে করি কারণ সেগুলো যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে লেখা। বিজ্ঞানের প্রাথমিক ভীতি কেটে যাবে ছোটো ছোটো প্রবন্ধগুলো পড়লে এবং ভাষা অত্যন্ত সহজ সরল বলে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের খুব উপকারে লাগবে বলেই আমার বিশ্বাস। অন্য একজন অধ্যাপকের ওপর এই গ্রন্থটির লেখার ভার দিয়েছিলেন কিন্তু সেখানে অগ্রগতি না হওয়ায় রবীন্দ্রনাথ নিজেই লিখতে শুরু করেন। কলকাতায় লেখা শুরু হলেও বইটি আলমোড়া ভ্রমণ কালে শেষ হয়। সেখানে দেখা পান আর একজন স্নেহাস্পদ বিজ্ঞানী বশীশ্বর সেনের। তাঁকে লেখাটি পড়িয়ে নেন এবং তিনি খুশি হয়েছেন জানালে রবীন্দ্রনাথ এটি ছাপার ব্যবস্থা করেন।
বিজ্ঞানী হাইজেনবার্গ ও সামার ফিল্ড জাপান যাবার পথে জোড়াসাঁকোয় আসেন কবির সঙ্গে দেখা করতে। একজন কবির বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ না থাকলে দুই বিজ্ঞানী কেনই বা আসবেন। আইনস্টাইনের সঙ্গে তিনবার সাক্ষাৎ হয়। কোয়ান্টাম তত্ত্ব থেকে আপেক্ষিকতা বাদ, চেতনা, সত্য ও সুন্দর নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু দুজনেই নিজ নিজ ব্যাখ্যায় অটুট ছিলেন। একজন মহাবিজ্ঞানী, একজন মহাকবি। বিশ্ব দর্শন দুজনের দু রকম হবে --খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। এর বেশ কিছুদিন পরে কবি লিখলেন সত্য সুন্দরের চেতনার বিখ্যাত কবিতা শ্যামলী কাব্যের 'আমি'-- 'আমারই চেতনার রঙে পান্না হোল সবুজ চুণী উঠল রাঙা হয়ে আমি চোখ মেললুম আকাশে জ্বলে উঠলো আলো পুবে পশ্চিমে।' বৈজ্ঞানিক সত্যকে কাব্যিক সত্যে রূপান্তরিত করলেন কবি।
রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞান চর্চা এতটাই নিখুঁত ছিল যে একটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। 'ছবি' কবিতায় লিখেছেন
তুমি কি কেবলই ছবি শুধু পটে লিখা
ঐ যে সুদূর নীহারিকা
যারা করে আছে ভিড় আকাশের নীড়
বহুবছর পরে কবি লিখছেন ঐ 'ভিড়' কথাটা লেখা ঠিক হয় নি। কারণ মাটির পৃথিবী থেকে ঐ নীহারিকাপুঞ্জকে ভিড় করে আছে মনে হলেও আসলে এক একটি নক্ষত্র বিস্তর দূরত্বে আছে। হাওড়া স্টেশনের মতো অতিকায় আয়তনের জায়গায় যদি ছ টি ধুলিকণা রাখা যায় তবে তারা যেমন দূরত্বে থাকবে তেমন দূরত্বে এক একটি নক্ষত্র আকাশে থাকে। বিজ্ঞানী স্যার জেমস জীনস এর উপমা থেকে এটি জেনে কবি অনায়াসে বললেন ভিড় বলা ভুল হয়েছে। বিজ্ঞানমনস্কতার এ এক উৎকৃষ্ট প্রমাণ।
শুধু কি বিজ্ঞান ? ভূগোলের নিখুঁত প্রয়োগ তিনি সিদ্ধহস্ত। আফ্রিকা কবিতাটিতে একজন ভূবিজ্ঞানীর মতো ভৌগোলিক ভাবে আফ্রিকা সৃষ্টির কাহিনী বর্ণনা করেছেন।
পৃথিবী, বৃক্ষ বন্দনা প্রভৃতি কবিতায় ভৌগোলিক ভাষ্যকে কাব্যিক ভাষ্যে উপস্থাপন করেছেন। বর্ষা ঋতুর গান 'মন মোর মেঘের সঙ্গী' গানে একজায়গায় বলছেন 'বায়ু বয় পূর্ব দিগন্তে হতে'--- বর্ষা ঋতুতে বাতাস যে পূর্বদিক থেকেই বয় তার পূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যায় এই গানে।
উদাহরণ বাড়তেই থাকবে।
বস্তুত যে কোনো বিষয়ে চরম নিখুঁত হওয়া , যাচাই করা এবং জীবন সত্যকে সম্মানিত করাই বিজ্ঞান মনস্কতা। আর সেখানে রবীন্দ্রনাথ একশো শতাংশ সফল। তাই তাঁর মতো বিজ্ঞানমনস্কতা নিয়ে কাব্য সৃষ্টি করাটা এক রোম্যান্টিক ভাবালুতায় ভরপুর কবির বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ যা আজো আমাদেরকে বিস্ময়াবিষ্ট করে আর এখানেই নিশ্চিত বলতে পারি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য আজো নতুন এবং পৃথিবীর বিদগ্ধ মানুষের এত প্রিয় ও গ্রহণযোগ্য। এখানে কল্পনা নিছক কল্পনা নেই ,কল্পনায় মিশে আছে বিজ্ঞানের যুক্তি।
আজ সর্বত্র বিজ্ঞানের জয়জয়কার। সে পদার্থবিজ্ঞান ই হোক বা মনোবিজ্ঞান হোক । কিন্ত সে সময় যখন এই বাংলায় তথা ভারতবর্ষের সবে বিজ্ঞান অনুসন্ধিৎসা উঁকি দিচ্ছে তিনি তখন তাকে আলিঙ্গন করে বিজ্ঞান চর্চায় ব্যাপৃত হলেন কাব্যচর্চার পাশাপাশি। ফ্রয়েডের সঙ্গেও রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ হয়েছিল এবং রবীন্দ্রনাথের মনস্তাত্ত্বিক গল্প উপন্যাস আজো জনপ্রিয় এবং মনুষ্য চরিত্রের নতুন দিক উন্মোচন করে চলেছে।
বস্তুত মানববিদ্যার অনুশীলন যদি গল্প উপন্যাস কবিতা হয় তবে সেখানে যুক্তি ও আবেগের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি। আর তখনই তা চিরকালীন সাহিত্য হয়ে উঠতে পারে। বিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্য মেনেই রবীন্দ্র সাহিত্য ডায়নামিক --dynamic ---আর তাই রবীন্দ্র সাহিত্যের চিরকালীন আবেদন যুগে যুগে বাড়বে বৈ কমবে না--- শুধু এই কারণেই। আর এই কারণেই রবীন্দ্রনাথকে বিজ্ঞানী বলা যেতে পারে।
0 Comments