স্বপন কুমার দে
আজ শেষ আষাঢ়ের এই ঘন বর্ষায় আকাশ ধূসর মেঘে সমাচ্ছন্ন। সারাদিন বৃষ্টিধারা ঝির্ ঝির্ কিংবা ঝরঝর ধারায় অবিরাম ঝরে পড়ছে। মাঝে মাঝে আকাশের বুক চিরে বিদ্যুতের ঝলকানি ও বজ্রের কড়্ কড়্ শব্দ। বৃষ্টিবন্দী, কর্মহীন দিনে অদূরে অসাড় প্রকৃতিকে দেখে মন ভারাক্রান্ত। জল, স্থল আকাশের একাকার রূপ দেখে ছেলেবেলার গ্রাম্য জীবনের কথা মনে পড়ছে। মনে পড়ছে রতনের কথা। উলাপুর গ্রামের বারো-তেরো বছরের এক অনাথা বালিকা। পিতৃমাতৃহীন, সহায় সম্বলহীন, স্নেহ ভালোবাসা বঞ্চিত এক অভাগিনী রতন। রতনের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয় বিদ্যালয় জীবনে। তখনকার মাধ্যমিক সিলেবাসে অন্যান্য বইয়ের সাথে গল্পগুচ্ছের বেশ কয়েকটি গল্প আমাদের অবশ্য পাঠ্য ছিল। তখন থেকেই ছোটগল্পের স্বল্প পরিসরে বিধৃত এই চরিত্রটি একটি আলাদা স্থান করে নিয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য চর্চা করা আমার মত অল্প জ্ঞানীর পক্ষে দুঃসাহস-- অল্প সাঁতার জেনে সমুদ্র পারাপারের চেষ্টা। কাজেই, সেই দুঃসাহস আমি করতে যাবো না। আমি শুধু আমার কষ্টের ও মনে রাখবার জায়গাগুলো আলোচনা করবো।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বপথিক। সেকথা তিনি নিজেও বারবার বলেছেন, " আমি পথভোলা এক পথিক এসেছি।" একদিকে যেমন এই পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষ সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসা, অন্যদিকে মানব প্রকৃতির বৈচিত্র্যও তাঁর জ্ঞান ক্ষুধাকে বর্ধন করেছে। ভূমি ও ভূমার স্বরূপ নিয়ে অনন্ত জিজ্ঞাসা। ব্যষ্টি ও সমস্টিকে জানবার, লৌকিক ও অলৌকিক জীবনের জ্ঞান সন্ধিৎসার বিশ্বক্ষুধা নিয়ে তিনি সারাজীবন পথ হেঁটেছেন। সাহিত্যের এমন কোনও শাখা নেই যেখানে তিনি বিচরণ করেননি। আবার মানব মনের প্রকৃতি বিশ্লেষণ, পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ-সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো বিজ্ঞানীর বিজ্ঞান ভাবনাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
রবীন্দ্রনাথ যত না লিখেছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি আমাদের ভাবিয়েছেন। জীবনে এত স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করেছেন, কোথায়, কোন্ বিজনে পড়ে আছে জীবনের অমূল্য অনুভূতি সেখানেই আলো ফেলেছেন। অতি যত্নে তুলে এনেছেন পাঠকের সামনে। এও তো লঘু আবিষ্কার নয়। ' পোষ্টমাষ্টার ' তেমনি এক গল্প। মানব মনের সুপ্ত উদারতা কখনো ভেসে উঠে মহাসাগরের বুকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত আবার কখনো বা তলিয়ে যায় সুষুপ্তির অন্ধকারে। কখনো শুষ্ক মরুভূমির বুকে এক পশলা বৃষ্টি চিরপিপাসু তপ্ত ভূমিকে রস স্পর্শে মাতাল করে কখনো না পাওয়ার আক্ষেপে তৃষ্ণায় বুক ফেটে যায়। রতন সেই শুষ্ক প্রাণের প্রতিনিধি।
পৃথিবীর সব সম্পর্কের নাম হয় না। এ যেন শিরোনামহীন এক অবয়ব। এ যেন জনতার দরবারে কোনো বিষয়ের অবয়ব পৌঁছে দিয়ে তাদের হাতেই নামকরণের ভার ছেড়ে দেওয়া। সন্তানের প্রতি বাবা মায়ের স্নেহ, বাবা মায়ের প্রতি সন্তানের শ্রদ্ধা, বন্ধুর প্রতি বন্ধুর ভালোবাসা, স্বামী- স্ত্রী ও প্রেমিক প্রেমিকার মধ্যে প্রেম ইত্যাদি। কিন্তু রতনের সঙ্গে পোষ্টমাষ্টারের সম্পর্কের সরাসরি কোনো নাম দেওয়া যায় না। আমার মনে হয়, এর কারণ দ্বিবিধ। প্রথমতঃ, উলাপুর গ্রামের এক অশিক্ষিত অনাথা মেয়ের সঙ্গে রক্ত সম্পর্কহীন কলকাতার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত চাকরিজীবির কোনোরূপ সম্পর্ক চিন্তা ভাবনার বাইরে। দ্বিতীয়তঃ, রতন একটি ভূমিকাতে সজ্ঞায়িত নয়। কখনো সে অনুগত ও বাধ্য পরিচারিকা, কখনো স্নেহশীলা দিদি, কখনো সন্তানের অমঙ্গল আশঙ্কায় আত্ম পীড়িতা জননী। এছাড়াও তাদের মধ্যে রয়েছে বয়স, শিক্ষা, সংস্কৃতিগত বিরাট ফারাক। তাহলে এখন অনুসন্ধানের বিষয় এর নাম কী এবং কারণ কী।
অনেক ভালোবাসার নাম হয় না, ভালোবাসা দিতে হয়, নিতে হয়। রতন এক অভাগিনী অনাথা। খুব ছোট বেলায় মা বাবা ভাইকে হারিয়েছে সে। ভালোবাসা পাওয়ার কোনো উৎস নেই এবং ভালোবাসা বিলিয়ে দেওয়ার কোনো আধার নেই। অথচ, সেই বেদনা বিধুর বুকে ভালোবাসার চিরন্তন পিপাসা আছে। অল্প বয়সে প্রিয়জনদের হারিয়ে যে গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে তা অন্য কোনও কিছু দিয়ে ভরাট করা যায় না। নীরবে তাদের স্মৃতির বেদনা সে বয়ে নিয়ে চলেছে। স্মৃতি অল্প, কিন্তু বেদনা অতলান্ত। পোষ্টমাষ্টার রতনকে জিজ্ঞেস করছেন, " আচ্ছা রতন, তোর মাকে মনে পড়ে?" তার উত্তরে রতনের মনে হয়েছে বাবার সঙ্গে দুয়েকটি সন্ধ্যার কথা, ছোট্ট ভাইয়ের সঙ্গে মিছিমিছি মাছ ধরা খেলার কথা। এবং এই স্মৃতিটাই তার বেদনাকে সদাই জাগিয়ে রেখেছিল। যে বয়সে তার বাবা মায়ের রক্ষণাবেক্ষণে বেড়ে ওঠার কথা, ভাইয়ের সুখসঙ্গ লাভ করার কথা, সেই বয়সে সে ভাগ্য বিড়ম্বিত একা এবং সম্পূর্ণ একা, নিঃস্ব। ভালোবাসা বর্জিত এক মরুময় দ্বীপে নির্বাসিত। সেই থেকে একটু স্নেহস্পর্শ, একটু ভালোবাসার প্রত্যাশী। পোষ্টমাষ্টারের মধ্যে রতন সেই আপনজনকে দেখতে পেয়েছিল, যার সঙ্গে শৈশবের নিষ্কলুষ ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়া যায়। এই ভালোবাসা নিঃস্বার্থ ও নিষ্কাম।
পোষ্টমাষ্টারের জ্বর হল। সেসময় একান্ত আপনজনের একটু স্নেহস্পর্শ, একটু যত্ন সবাই প্রত্যাশা করে। আমাদের পোষ্টমাষ্টার বাবুটিরও তাই হল, " এই নিতান্ত প্রবাসে ঘনবর্ষায় রোগকাতর শরীরে একটুখানি সেবা পাইতে ইচ্ছা করে। তপ্ত ললাটের উপর শাঁখাপরা কোমল হস্তের স্পর্শ মনে পড়ে।" অর্থাৎ তাঁর মায়ের কথা মনে হল, মাকে দরকার হল। রতন এই শূন্যস্থান পূরণ করতে তৎপর হল," বালিকা রতন আর রতন রহিল না। এই মুহূর্তেই সে জননীর পদ অধিকার করিয়া বসিল, বৈদ্য ডাকিয়া আনিল, যথাসময়ে বটিকা খাওয়াইল, সারারাত্রি শিয়রে জাগিয়া রহিল,..।" এখানে এই গ্রাম্য বালিকাটি যেন তার নিজস্ব গণ্ডী ছাড়িয়ে অনেকটা উঁচুতে পৌঁছে গেছে। রতন এখানে সাধারণ নারী থেকে বিশ্বমানবীতে পরিণত হয়েছে।
' পোষ্টমাষ্টার ' গল্পের পাঠক পাঠিকারা নিশ্চয়ই জানেন এই গল্পের ট্র্যাজেডি এবং সেই ট্র্যাজেডি মহাকাব্যিক বর্ণনায় লেখকের অসাধারণ দক্ষতা পাঠক হৃদয়ে এক অমলিন ব্যথার সঙ্গীত রচনা করেছে। পোষ্টমাষ্টারের মুখ থেকে তাঁর দেশে ফিরে যাওয়ার শুনে একরাশ হতাশা আর বুকভরা শূন্যতা নিয়ে রতন যখন একেবারে বোবা হয়ে গেছে, তখন লেখক লিখছেন, " অনেকক্ষণ আর কেহ কথা কহিল না, মিট্ মিট্ করিয়া প্রদীপ জ্বলিতে লাগিল এবং একস্থানে ঘরের জীর্ণ চাল ভেদ করিয়া একটি মাটির সরার উপর টপ্ টপ্ করিয়া বৃষ্টির জল পড়িতে লাগিল।" পাঠক হৃদয়ও সেই বৃষ্টিপাতের শব্দ ব্যঞ্জনায় নীরব কান্নার ব্যথা অনুভব করতে পারল। রতন আর শুধু উলাপুর গ্রামের এক অজ্ঞাত কুলশীল মেয়ে নয়, সে হয়ে উঠল আমাদেরই ঘরের মেয়ে।
নরম পলিমাটির দেশ এই বাংলা। এখানের মেয়েরা জন্ম থেকেই জননী। অল্প বয়সে সে তার চেয়ে ছোট ভাই বোনের অভিভাবিকা, যৌবনে স্বামী ও সন্তানের প্রতি ভালোবাসা - একই সঙ্গে প্রেম ও বাৎসল্য আবার বৃদ্ধ বাবা মায়ের প্রতি কর্তব্য ও মাতৃত্বভাব। একই সঙ্গে চলে ভালোবাসা ও অনুশাসন। এই জননীভাব একইভাবে প্রবাহিত। পোষ্টমাষ্টার ও রতনের সম্পর্ক দুই অসম বয়সের, অসম অবস্থার সম্পর্ক। সেখানে স্নেহ সেবা নিতে আপত্তি নেই, কিন্তু স্বীকৃতিতে আপত্তি। রতন নামক গ্রাম্য বালিকার মধ্য দিয়ে লেখক এখানে বিশ্ব নারী সত্তাকে উপস্থাপিত করেছেন। ' পোষ্টমাষ্টার ' গল্প বিশ্ব সাহিত্যের সম্পদ, রতন বিশ্ব সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নারী চরিত্র।
আজ শেষ আষাঢ়ের এই ঘন বর্ষায় আকাশ ধূসর মেঘে সমাচ্ছন্ন। সারাদিন বৃষ্টিধারা ঝির্ ঝির্ কিংবা ঝরঝর ধারায় অবিরাম ঝরে পড়ছে। মাঝে মাঝে আকাশের বুক চিরে বিদ্যুতের ঝলকানি ও বজ্রের কড়্ কড়্ শব্দ। বৃষ্টিবন্দী, কর্মহীন দিনে অদূরে অসাড় প্রকৃতিকে দেখে মন ভারাক্রান্ত। জল, স্থল আকাশের একাকার রূপ দেখে ছেলেবেলার গ্রাম্য জীবনের কথা মনে পড়ছে। মনে পড়ছে রতনের কথা। উলাপুর গ্রামের বারো-তেরো বছরের এক অনাথা বালিকা। পিতৃমাতৃহীন, সহায় সম্বলহীন, স্নেহ ভালোবাসা বঞ্চিত এক অভাগিনী রতন। রতনের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয় বিদ্যালয় জীবনে। তখনকার মাধ্যমিক সিলেবাসে অন্যান্য বইয়ের সাথে গল্পগুচ্ছের বেশ কয়েকটি গল্প আমাদের অবশ্য পাঠ্য ছিল। তখন থেকেই ছোটগল্পের স্বল্প পরিসরে বিধৃত এই চরিত্রটি একটি আলাদা স্থান করে নিয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য চর্চা করা আমার মত অল্প জ্ঞানীর পক্ষে দুঃসাহস-- অল্প সাঁতার জেনে সমুদ্র পারাপারের চেষ্টা। কাজেই, সেই দুঃসাহস আমি করতে যাবো না। আমি শুধু আমার কষ্টের ও মনে রাখবার জায়গাগুলো আলোচনা করবো।
রবীন্দ্রনাথ বিশ্বপথিক। সেকথা তিনি নিজেও বারবার বলেছেন, " আমি পথভোলা এক পথিক এসেছি।" একদিকে যেমন এই পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষ সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসা, অন্যদিকে মানব প্রকৃতির বৈচিত্র্যও তাঁর জ্ঞান ক্ষুধাকে বর্ধন করেছে। ভূমি ও ভূমার স্বরূপ নিয়ে অনন্ত জিজ্ঞাসা। ব্যষ্টি ও সমস্টিকে জানবার, লৌকিক ও অলৌকিক জীবনের জ্ঞান সন্ধিৎসার বিশ্বক্ষুধা নিয়ে তিনি সারাজীবন পথ হেঁটেছেন। সাহিত্যের এমন কোনও শাখা নেই যেখানে তিনি বিচরণ করেননি। আবার মানব মনের প্রকৃতি বিশ্লেষণ, পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ-সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো বিজ্ঞানীর বিজ্ঞান ভাবনাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
রবীন্দ্রনাথ যত না লিখেছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি আমাদের ভাবিয়েছেন। জীবনে এত স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করেছেন, কোথায়, কোন্ বিজনে পড়ে আছে জীবনের অমূল্য অনুভূতি সেখানেই আলো ফেলেছেন। অতি যত্নে তুলে এনেছেন পাঠকের সামনে। এও তো লঘু আবিষ্কার নয়। ' পোষ্টমাষ্টার ' তেমনি এক গল্প। মানব মনের সুপ্ত উদারতা কখনো ভেসে উঠে মহাসাগরের বুকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত আবার কখনো বা তলিয়ে যায় সুষুপ্তির অন্ধকারে। কখনো শুষ্ক মরুভূমির বুকে এক পশলা বৃষ্টি চিরপিপাসু তপ্ত ভূমিকে রস স্পর্শে মাতাল করে কখনো না পাওয়ার আক্ষেপে তৃষ্ণায় বুক ফেটে যায়। রতন সেই শুষ্ক প্রাণের প্রতিনিধি।
পৃথিবীর সব সম্পর্কের নাম হয় না। এ যেন শিরোনামহীন এক অবয়ব। এ যেন জনতার দরবারে কোনো বিষয়ের অবয়ব পৌঁছে দিয়ে তাদের হাতেই নামকরণের ভার ছেড়ে দেওয়া। সন্তানের প্রতি বাবা মায়ের স্নেহ, বাবা মায়ের প্রতি সন্তানের শ্রদ্ধা, বন্ধুর প্রতি বন্ধুর ভালোবাসা, স্বামী- স্ত্রী ও প্রেমিক প্রেমিকার মধ্যে প্রেম ইত্যাদি। কিন্তু রতনের সঙ্গে পোষ্টমাষ্টারের সম্পর্কের সরাসরি কোনো নাম দেওয়া যায় না। আমার মনে হয়, এর কারণ দ্বিবিধ। প্রথমতঃ, উলাপুর গ্রামের এক অশিক্ষিত অনাথা মেয়ের সঙ্গে রক্ত সম্পর্কহীন কলকাতার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত চাকরিজীবির কোনোরূপ সম্পর্ক চিন্তা ভাবনার বাইরে। দ্বিতীয়তঃ, রতন একটি ভূমিকাতে সজ্ঞায়িত নয়। কখনো সে অনুগত ও বাধ্য পরিচারিকা, কখনো স্নেহশীলা দিদি, কখনো সন্তানের অমঙ্গল আশঙ্কায় আত্ম পীড়িতা জননী। এছাড়াও তাদের মধ্যে রয়েছে বয়স, শিক্ষা, সংস্কৃতিগত বিরাট ফারাক। তাহলে এখন অনুসন্ধানের বিষয় এর নাম কী এবং কারণ কী।
🍂
পোষ্টমাষ্টারের জ্বর হল। সেসময় একান্ত আপনজনের একটু স্নেহস্পর্শ, একটু যত্ন সবাই প্রত্যাশা করে। আমাদের পোষ্টমাষ্টার বাবুটিরও তাই হল, " এই নিতান্ত প্রবাসে ঘনবর্ষায় রোগকাতর শরীরে একটুখানি সেবা পাইতে ইচ্ছা করে। তপ্ত ললাটের উপর শাঁখাপরা কোমল হস্তের স্পর্শ মনে পড়ে।" অর্থাৎ তাঁর মায়ের কথা মনে হল, মাকে দরকার হল। রতন এই শূন্যস্থান পূরণ করতে তৎপর হল," বালিকা রতন আর রতন রহিল না। এই মুহূর্তেই সে জননীর পদ অধিকার করিয়া বসিল, বৈদ্য ডাকিয়া আনিল, যথাসময়ে বটিকা খাওয়াইল, সারারাত্রি শিয়রে জাগিয়া রহিল,..।" এখানে এই গ্রাম্য বালিকাটি যেন তার নিজস্ব গণ্ডী ছাড়িয়ে অনেকটা উঁচুতে পৌঁছে গেছে। রতন এখানে সাধারণ নারী থেকে বিশ্বমানবীতে পরিণত হয়েছে।
' পোষ্টমাষ্টার ' গল্পের পাঠক পাঠিকারা নিশ্চয়ই জানেন এই গল্পের ট্র্যাজেডি এবং সেই ট্র্যাজেডি মহাকাব্যিক বর্ণনায় লেখকের অসাধারণ দক্ষতা পাঠক হৃদয়ে এক অমলিন ব্যথার সঙ্গীত রচনা করেছে। পোষ্টমাষ্টারের মুখ থেকে তাঁর দেশে ফিরে যাওয়ার শুনে একরাশ হতাশা আর বুকভরা শূন্যতা নিয়ে রতন যখন একেবারে বোবা হয়ে গেছে, তখন লেখক লিখছেন, " অনেকক্ষণ আর কেহ কথা কহিল না, মিট্ মিট্ করিয়া প্রদীপ জ্বলিতে লাগিল এবং একস্থানে ঘরের জীর্ণ চাল ভেদ করিয়া একটি মাটির সরার উপর টপ্ টপ্ করিয়া বৃষ্টির জল পড়িতে লাগিল।" পাঠক হৃদয়ও সেই বৃষ্টিপাতের শব্দ ব্যঞ্জনায় নীরব কান্নার ব্যথা অনুভব করতে পারল। রতন আর শুধু উলাপুর গ্রামের এক অজ্ঞাত কুলশীল মেয়ে নয়, সে হয়ে উঠল আমাদেরই ঘরের মেয়ে।
নরম পলিমাটির দেশ এই বাংলা। এখানের মেয়েরা জন্ম থেকেই জননী। অল্প বয়সে সে তার চেয়ে ছোট ভাই বোনের অভিভাবিকা, যৌবনে স্বামী ও সন্তানের প্রতি ভালোবাসা - একই সঙ্গে প্রেম ও বাৎসল্য আবার বৃদ্ধ বাবা মায়ের প্রতি কর্তব্য ও মাতৃত্বভাব। একই সঙ্গে চলে ভালোবাসা ও অনুশাসন। এই জননীভাব একইভাবে প্রবাহিত। পোষ্টমাষ্টার ও রতনের সম্পর্ক দুই অসম বয়সের, অসম অবস্থার সম্পর্ক। সেখানে স্নেহ সেবা নিতে আপত্তি নেই, কিন্তু স্বীকৃতিতে আপত্তি। রতন নামক গ্রাম্য বালিকার মধ্য দিয়ে লেখক এখানে বিশ্ব নারী সত্তাকে উপস্থাপিত করেছেন। ' পোষ্টমাষ্টার ' গল্প বিশ্ব সাহিত্যের সম্পদ, রতন বিশ্ব সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নারী চরিত্র।
0 Comments