জ্বলদর্চি

চীন দেশের গল্প: ১১(রক্তচোষা ডাইনি)/বাংলা ভাষান্তর : নিখিলেশ ঘোষ

চীন দেশের গল্প: ১১(রক্তচোষা ডাইনি)
বাংলা ভাষান্তর :  নিখিলেশ ঘোষ

(একটি ওয়াই ই  লোককথা। মূল চিনা ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেনঃ জন মিনফোর্ড)

অনেক অনেক দিন আগের কথা। এক পাহাড়ের ঢালু গায়ে এক গাঁয়ের চাষী আপন মনে কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ছিল। এমন সময় বনের ভেতর থেকে এক রক্তচোষা ডাইনি বুড়ি খটখট করে সেখানে এসে হাজির! লোকটাকে দেখেই ডাইনির জিব দিয়ে লাল পড়তে লাগল, সে তাকে জ্যান্ত চিবিয়ে খাওয়ার ফন্দি আঁটলো।ডাইনিটা আর কিছু না বলে টপ করে চাষীর ঠিক সামনে এসে হাজির হল। তারপর পলক না ফেলে লোকটার দিকে কটমট করে তাকিয়ে রইল। ডাইনির ওই রাক্ষুসে চাউনি দেখে তো চাষীর  পিলে চমকে ওঠার জোগাড়! 

কিন্তু চাষী ছিল ভারী বুদ্ধিমান। ভয় না পেয়ে সে মৃদু হেসে ডাইনিকে বলল, "ওগো বনের মাসী, আজই আমাকে খেয়ে তোমার পেট ভরবে না। তার চেয়ে বরং আজ আমায় ছেড়ে দাও। ঘরে আমার একটা হিষ্টিপুষ্টি  মুরগি আছে। আজ রাতে ওটাকে রেঁধে-বেড়ে খাই, কাল দেখবে শরীরটা কেমন নাদুস-নুদুস  হয়েছে। তখন আমায় খেলে তুমিও খেয়ে সুখ পাবে!"

লোভী ডাইনি মনে মনে ভাবল, কথা তো মন্দ নয়! সে ঘাড় নেড়ে তাতেই রাজী হয়ে গেল।যেমন কথা তেমন কাজ! চাষী সেই সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তার হাড়সার মুরগিটা কেটে জম্পেশ করে ভোজ সারল। তবে চতুর চাষী বুদ্ধি করে মাংসের একটা বড় টুকরো না খেয়ে তুলে রাখল। পরের দিন সকালে সেই মাংসের টুকরোটা নিয়ে সে আবার পাহাড়ের ঢালে ডাইনির কাছে গিয়ে হাজির হলো। ডাইনি বুড়ি তো মাংসের টুকরোটা পেয়ে  গপ করে মুখে পুরে নিল। চিবিয়ে গিলে ফেলে বলল, "হুম, মাংস তো বেশ খাসা! এবার বাপু তোমার পালা, আজ আর কোনো ওজর-আপত্তি শুনব না, তোমাকে আমি খাবই খাব!"

চাষী এবার আরও একটু হেসে হাত জোড় করে বলল, "আহা মাসী, তাড়াহুড়ো করো না! আজ আমাকে খেলে তোমার পস্তাতে হবে। আমার গোয়ালে একটা মাদী শুয়োর আছে ! সে কী মোটাসোটা চেহারা!  আজকের দিনটা তর সইলে, ওটাকে সাবাড় করে আমি যখন আরও ডবল মোটা হব, তখন তুমি আমায় এক কামড়েই সাবাড় করে দিও!"

বুদ্ধিহীন ডাইনি বুড়ি আবার লোকটার ফাঁদে পা দিল এবং মস্ত বড় ভোজের লোভে আবারও তার কথায় মাথা নাড়ল। যেই কথা, সেই কাজ! সেই সাঁঝের বেলায় চাষী তার সেই কুচকুচে কালো মোটাসোটা মাদী শুয়োরটাকে কেটে জম্পেশ করে ভোজ সারল। তবে এবারও চতুর চাষী বুদ্ধি খাটাল; মাংসের মস্ত একটা নিরেট টুকরো সে না খেয়ে তুলে রাখল এবং পরদিন সকালে সেটা নিয়ে গিয়ে হাজির হলো বনের সেই ডাইনির ডেরায়।

রাক্ষুসে ডাইনি তো শুয়োরের মাংসের টুকরোটা দেখেই এক হাঁ-য়ে গপ করে গিলে ফেলল। মাংস  খেয়ে ডাইনি তৃপ্তির একটা বড় ঢেকুর তুলে বলল, "আহা! আজ তো আমার পেট পুরোই টইটুম্বুর রে বাপু! আজ আর তোকে খাওয়ার জায়গা নেই। যা, আজকের দিনটা ছেড়ে দিলাম, কাল তোকে একদম মচমচ করে চিবিয়ে খাব।" শুনে তো চাষীর বুক দুরুদুরু করে কাঁপতে লাগল। সে বাড়ি ফিরে এল, ঘরের কোণ-কাণা, হাঁড়ি-কুড়ি সব তন্নতন্ন করে খুঁজল। কিন্তু হায়! ডাইনিকে ভোলানোর মতো ঘরে আর কোনো পশুপাখি বা খাওয়ার জিনিসই অবশিষ্ট নেই! এবার তো নিজের জান বাঁচানো দায়!

চাষী তখন হতাশায় ভেঙে পড়ে দিশেহারা হয়ে ছুটল তার পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছে। চোখের জল ফেলে সে বলল, "ওগো ভাই-বোনেরা, আমার তো মরণ দশা! এক রাক্ষুসে ডাইনি আমায় জ্যান্ত চিবিয়ে খেতে চায়! প্রথম দিন আর দ্বিতীয়  দিন বুদ্ধি করে জান বাঁচিয়েছি। 

কিন্তু আজ আমার ঘরে মুরগিও নেই, শুয়োরও নেই! কাল ডাইনি বুড়ি আমায় আর আস্ত রাখবে না। আমি মরে গেলে তোমরা দয়া করে আমার অনাথ স্ত্রী আর কচি ছেলেমেয়েগুলোকে একটু দেখো ভাই!" চাষীর এই করুণ দশা দেখে পাড়াপড়শীরা বলল, "আরে দূর পাগল! এতটুকু ভেঙে পড়লে চলে? কোনো চিন্তা কোরো না, একদম ভয় পেও না! আমরা থাকতে ডাইনি তোর একটা লোম ও ছুঁতে পারবে না। চলো, আমরা সবাই মিলে এমন এক ফন্দি আঁটি যেন কাল সকালেই ওই অলক্ষ্মী ডাইনিটাকে যম ঘরে পাঠানো যায়!" যেমন ভাবা, তেমন কাজ! গাঁয়ের সবাই মিলে এক গোপন বুদ্ধি আঁটলো এবং পরদিন ভোরে পাহাড়ের সেই ঢালে একত্র হওয়ার কড়া প্রতিজ্ঞা করল।
🍂
পরদিন সূয্যিমামা উঁকি দিতেই চাষী তার কাঁধে কোদালখানা নিয়ে রোজকার মতো পাহাড়ের ঢালে মাটি খুঁড়তে গেল। ওদিকে শয়তান ডাইনি বুড়ি তো আগে থেকেই সেখানে শিকারের আশায় ওত পেতে বসে আছে! তবে দিনের আলোয় পাছে মানুষজন তাকে চিনে ফেলে, সেই ভয়ে সে এক মায়াবী মন্ত্রবলে নিজেকে এক পোড়া গাছের শুকনো গুঁড়ি বানিয়ে চাষীর ঠিক সামনেই জাঁকিয়ে বসে রইল।

খানিক বাদে, লাঠিসোঁটা আর দা-কাস্তে হাতে গাঁয়ের সাহসী প্রতিবেশীরা যখন দল বেঁধে সেখানে এসে পৌঁছাল, তারা চারপাশ চেয়ে সেই অদ্ভুত গাছের গুঁড়িটা দেখতে পেল। তারা তখন চাষীকে চোখ টিপে ইশারায় জিজ্ঞেস করল, "হ্যাঁ রে ভাই, ভালো করে দেখ তো! তোর সামনের এই অদ্ভুত জিনিসটা আসলে কী?"

প্রতিবেশীদের মুখে এই কথা শুনে গাছের গুঁড়ি রূপী ডাইনি বুড়ির তো ভয়ে জান শুকিয়ে যাওয়ার জোগাড়! সে তখন ফিসফিস করে লোকটাকে আড়ালে ডেকে বলল, "আরে মদ্দ, ওদের জলদি করে বলে দে যে ওটা একটা মরা গাছের শুকনো গুঁড়ি বৈ আর কিছু নয়!"চাষী তো কম চতুর ছিল না! সে ডাইনির এই ভয় পেয়ে যাওয়াটা বেশ বুঝে ফেলল। সে এবার নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে ডাইনির সেই কিম্ভূতকিমাকার ফিসফিসে গলার সুর আর অদ্ভুত টান হুবহু নকল করে চেঁচিয়ে পাড়াপড়শীদের বলল, "ওহ! ওদের জলদি করে বলে দে যে ওটা একটা মরা গাছের শুকনো গুঁড়ি বৈ আর কিছু নয়!"

নিজের গলার স্বর হুবহু শুনে ডাইনি বুড়ি তো অপ্রস্তুত হয়ে মহাবিপদে পড়ে গেল! সে তখন রেগেমেগে ফিসফিসিয়ে লোকটার ভুল শুধরে দিয়ে বলল, "ধুর বোকা! আমার কথা নকল করছিস কেন? না! তুই ওটা তোর নিজের গলায় বল!" রসিক চাষী এবার আরও এক কাঠি ওপরে গিয়ে ডাইনির সেই রাগী গলার সুর আরও জোরে নকল করে প্রতিবেশীদের ডেকে বলল, "ধুর বোকা! আমার কথা নকল করছিস কেন? তুই ওটা তোর নিজের গলায় বল!" চাষীর এই কাণ্ড দেখে প্রতিবেশীরা নিশ্চিত বুঝে গেল যে ডাল মে কুছ কালা হ্যায়, ওই গাছের গুঁড়িটাই আসলে সেই ছদ্মবেশী ডাইনি বুড়ি!

প্রতিবেশীরা চাষীর মুখে এমন অদ্ভুত কথা শুনে অবাক হয়ে গেল! তারা চোখ গোল গোল করে বলল, "আরে ভাই, তুই এসব কী আবোলতাবোল বকছিস? আমরা তোর একটা কথাও বিশ্বাস করি না! ওটা যদি সত্যিই বনের মরা গাছের ছাল-বাকল আর শুকনো গুঁড়িই হয়, তবে প্রমাণ দেখাতো দেখি! তোর হাতের ওই ধারালো কোদালখানা দিয়ে ওটার ওপর জম্পেশ করে একটা কোপ বসিয়ে দে!" 

পাড়াপড়শীদের মুখে কোদাল মারার কথা শুনে গাছের গুঁড়ির ভেতর থেকে ডাইনি বুড়ি তো ভয়ে একেবারে শিউরে উঠল! সে আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে চিৎকার করে বলে উঠল, "ওরে বাবারে! তোরা আমায় কোপাতে চাস তো কোপা! কিন্তু খবরদার, কোদালখানা ওপরে তুললেও মারার সময় একদম আলতো করে ছুঁইয়ে দিস। ভুলেও আমার মরণ-ফাঁদ বা দুর্বল জায়গায় কোপ বসাস না যেন!"

চতুর চাষী তো মনে মনে এই সুযোগেরই অপেক্ষা করছিল! সে মুখে এক গাল হাসি এনে বোকা সেজে বলল, "ওগো বনের দিদিমা, তোমার মরণ-ফাঁদ আর দুর্বল জায়গাটা আবার কোনখানে গো? আমায় একটু ভালো করে বাতলে দাও তো, নইলে আমি যদি ভুল করে ওই মোক্ষম জায়গাতেই কোদাল মেরে বসি, তখন তো মহাবিপদ হবে!" 

ডাইনি বুড়ি তখন যমের ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে নিজের রূপ ভুলে বলে উঠল, "ঐ যে, ঐখানটায় রে বাপু! গুঁড়ির গায়ের ঐ যে কুচকুচে কালো দাগটা দেখছিস, ওটাই আমার আসল দুর্বল স্থান। তোরা যা-ই করিস না কেন, ভুল করেও কিন্তু ওটার ওপর একটুও আঘাত করিস না!" চাষী তখন ডাইনির দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে বলল, "আরে না না দিদিমা, তুমি একটুও চিন্তা কোরো না! আমি কি আর তেমন অবুঝ? অবশ্যই আমি ও কাজ করব না!"
এই কথা মুখে বলতে বলতেই, চাষী চোখের পলকে তার হাতের ভারী কোদালখানা দুই হাত দিয়ে মাথার ওপর উঁচুতে তুলল। তারপর আর কোনো দয়ামায়া না দেখিয়ে, নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে ডাইনির বাতলে দেওয়া সেই কালো দাগটার ওপর সজোরে এক কোপ বসিয়ে দিল! ধারালো কোদালের সেই এক কোপেই ছদ্মবেশী ডাইনি বুড়ি বিকট এক চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল এবং তৎক্ষণাৎ তার পাপিষ্ঠ প্রাণের ভবলীলা সাঙ্গ হল। এভাবেই চতুর চাষী আর সাহসী প্রতিবেশীদের বুদ্ধিতে বনের ডাইনির হাত থেকে গ্রামবাসী চিরতরে রক্ষা পেল।

Post a Comment

0 Comments