জ্বলদর্চি

ঘৃতকুমারী/ভাস্করব্রত পতি

বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১৩৬
ঘৃতকুমারী

ভাস্করব্রত পতি

কারও কারও অভিমত, ঘৃতকুমারীর আদি বাসস্থান আফ্রিকান মরুভূমি এলাকা এবং মাদাগাস্কার। অন্তত ৬০০০ বছর আগে মিশরে উৎপত্তি লাভ করে বলে অনেকে উল্লেখ করেছেন। যদিও আমাদের ভারতে এটির ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই। অথর্ববেদ, চরক সংহিতায় ঘৃতকুমারীর কথা রয়েছে। তাই এর আদি বাসস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত বলা যায়না। 

অথর্ববেদে একে 'তরুণী' নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে ৩৬। ১২১। ২ সূক্তে রয়েছে --
'যেন বহসি সহস্রং যেনাগ্নিং প্রতি জাগৃহি।
যোনৌ যুবানান্ তরুণী কৃন্বানা বাতাংসী ত্বয়ি তন্তুমেতম্।।'
অর্থাৎ যজ্ঞকার্যে এবং এই দেহকার্যে আশয়ের পার্থক্য থাকায় গ্রহণী শক্তির প্রয়োজন সর্বাগ্রে। তারই জন্য ঋষিগণ এই তরুণী ভেষজের প্রশংসা ক'রেছেন। তরুণী ছাড়াও ঘৃতকুমারী পরিচিত অজরা, গৃহকন্যা, কুমারী, সুকণ্টকা নামেও। একে ইংরেজিতে Indian aloe, Medicinal aloe, Burn plant বলে। এছাড়াও হিন্দিতে ঘিউকুমারী, বনভস্তকী, কুঠবেপাট, ফারসিতে দরখতেসিন্ন, অসমীয়াতে মুসবর, কোঙ্কণীতে ঘিত্বকঞ্চন, কন্নড়ে লোয়িমর, তেলুগুতে পিন্নগোরিকণ্টলবন্দ, মারাঠীতে কোরকড, কোরফাল্টা বলে। 

চরক সংহিতার (বিমান অষ্টম অধ্যায়) তিক্তক স্কন্ধে এবং সিদ্ধিস্থানেও 'তরুণী' নামের উল্লেখ পাই। চরক সংহিতার বিমানস্থানের অষ্টম অধ্যায়ের ১৬৫ গুচ্ছে লেখা আছে, শ্লেষ্মরোগের ক্ষেত্রে যেসব ভেষজ বেশি কার্যকরী, তাদের মধ্যে অন্যতম এই তরুণী। আবার সিদ্ধিস্থানের দশম অধ্যায়ের ২২ নম্বর শ্লোকেও জানানো হয়েছে শ্লেষ্মবিকারের ক্ষেত্রে তরুণীর রস খুবই ফলপ্রসূ। 

আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য এই 'ঘৃতকুমারী' নামকরণের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন, "নারীকে বলা হয় 'ঘৃতকুম্ভ সমা নারী'। অর্থাৎ সামান্য তাপ সঞ্চারিত হ'লেই তাঁরা উত্তপ্তা হন বা গ'লে যান। কারণ ঘৃত শব্দটি অন্বিত হ'য়েছে ঘৃত অর্থাৎ যা ক্ষরিত হয় অথবা যা দ্বারা বহ্নি দীপ্ত হয়। এই তরুণী বা কুমারী ভেষজও সামান্য তাপ ও চাপ পেলেই ক্ষরিত হয় এবং সেই তরুণীরসও অগ্নিকে দীপ্ত রাখে। এইজন্য আমাদের দেশে সেই কুমারীকে আরও স্পষ্ট ক'রে বোঝাবার জন্য ঘৃত শব্দ সংযোগে বিশেষিত করা হ'য়েছে। তাই তার প্রচলিত নাম 'ঘৃতকুমারী'।"
চাষ করা হয়েছে ঘৃতকুমারী

এর বিজ্ঞানসম্মত নাম Aloe indica Royle। যদিও আগে এর নাম ছিল Aloe barbadensis Mill। একে Aloe vera ও বলে। Liliaceae পরিবারভুক্ত এই গাছের আরও কিছু প্রজাতি হল --
Aloe chinensis 
Aloe elongata 
Aloe flava 
Aloe indica 
Aloe lanzae 
Aloe maculata 
Aloe perfoliata var. vera Lin
Aloe rubescens 
Aloe variegata 
Aloe vera Mill
Aloe vera var. chinensis 
Aloe vera var. lanzae 
Aloe vera var. littoralis  
Aloe vulgaris 
কাথিয়াবাড় অঞ্চলের জাফিরাবাদে যে ঘৃতকুমারীর প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যায়, তার বিজ্ঞানসম্মত নাম Aloe abyssinica Lam। যেটি কিনা আবিসিনিয়া দেশ থেকে আগত। 

আনারস গাছের মত দেখতে ঘৃতকুমারীর শিকড়, শাখা থেকেই নতুন চারা গজায়। মোটামুটি এক দেড় ফুট উঁচু হয়। এদের পাতাগুলি বেশ পুরু এবং নরম। পাতার নিচের অংশ খানিকটা বৃত্তাকার। উপরের অংশ সমান। পাতার দু'ধারেই করাতের মত কাঁটা রয়েছে। পাতার ওপরের সবুজ ছালের ভিতরে মেলে মাংসল পিচ্ছিল লালার মত ঈষৎ সাদা শাঁস। ঘৃতকুমারীর এই নির্যাসের মধ্যে থাকে Aloin, Isobarbaloin, Emodin, Chrysophanic acid, Uronic acid ইত্যাদি। এদের পুষ্পদণ্ড সরু লাঠির মতো। লেবু রঙের ফুল ও ফল হয় শীতের শেষে। বানিজ্যিক ভাবে ঘৃতকুমারীর চাষ করছেন অনেক চাষী। এখন বাজারে এর চাহিদা ব্যাপক। 
ঘৃতকুমারীর পাতার কাঁটাযুক্ত প্রান্তদেশ

এদের নরম শাঁসে উৎকট গন্ধ পাওয়া যায়। সেটি তেতো স্বাদের। ঘৃতকুমারীর হলুদ রংয়ের নির্যাস শুকিয়েই তৈরি হয় মুসব্বর। এই মুসব্বর আবার চার প্রকারের হয় -- (১) সক্রোটাইন, (২) আরবিক, (৩) জাফিরাবাদ এবং (৪) মহীশূর। জাফিরাবাদের মুসব্বরই ভারতে বেশি চলে। তবে গুণগত দিক থেকে আরবের মুসব্বরই সবচেয়ে সেরা। আর মহীশুর মুসব্বর ব্যবহৃত হয় শিল্পকার্যে। 

শ্লেষ্মার ধাত, অর্শ, এগজিমা, ব্যাথা যন্ত্রনা, পেট ফাঁপা, অগ্নিমান্দ্য, ক্রিমি, প্রস্রাবের সময় শুক্র স্খলন, ঋতুবন্ধ ইত্যাদি রোগের নিরসনে ঘৃতকুমারীর ব্যবহার বেশ পুরোনো। মুখমণ্ডল পরিস্কার পরিচ্ছন্ন এবং উজ্জ্বল রাখতে ঘৃতকুমারীর নির্যাস মাখার চল দেখা যায়।

🍂

Post a Comment

0 Comments