পর্ব ২৪
প্রীতম সেনগুপ্ত
উচ্চতর ভাবের বিচার ও শ্রীরমণ মহর্ষি
নিজস্ব বিচারবুদ্ধির উচ্চতরভাবের প্রয়োগ শ্রীরমণ মহর্ষির জীবনে আমরা দেখতে পাই। এই বিষয়ে একটি ঘটনা তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন এইরকম ---
“আমি চিরকালের মত মাদুরা ছাড়ার ছ'সপ্তাহ আগে আমার জীবনে সেই মহান পরিবর্তন হয়ে গেল। এটা নিতান্ত আকস্মিক। আমি আমার কাকার বাড়ির দোতলার ঘরে একলা বসেছিলাম। আমার প্রায় কোনদিন কোন অসুখ হত না, আর সেদিন আমার শরীরে কিছুমাত্র অসুস্থতা ছিল না। কিন্তু হঠাৎ একটা দারুণ মৃত্যুভয় আমাকে এসে ধরল। স্বাস্থ্য কিছু খারাপ ছিল না যার জন্য এরকম হতে পারে। এটা যে কেন হল তার জন্য বা ভয়ের কারণ সম্বন্ধে চিন্তা করলাম না। কেবল অনুভব করলাম আমি এখন মারা যাচ্ছি আর এ সম্বন্ধে কি করা যায় ভাবতে লাগলাম। আমার ডাক্তার, আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধুবান্ধবদের ডাকার কথা একবারও মনে হল না। মনে হল এই সমস্যাটাকে সেইক্ষণে আমায় নিজেকেই সমাধান করতে হবে।
মৃত্যুভয়ের আঘাতে আমার মন অন্তর্মুখী হল, আমি আমার মনকে মনে মনেই বললাম, ‘এখন মৃত্যু এসে গেছে, এর অর্থ কি? কি মারা যাচ্ছে? এই শরীরটাই মারা যায়।’ আমি তৎক্ষণাৎ মৃত্যুর অভিনয় করা শুরু করে দিলাম। হাত পা ছড়িয়ে শক্ত হয়ে শুয়ে পড়লাম। শ্বাসরুদ্ধ করে, দুই ঠোঁট শক্ত করে চেপে ধরলাম যাতে ‘আমি’ বা অন্য কোন শব্দ উচ্চারণ না হয়। আমি নিজেকেই বললাম, ‘তাহলে শরীরটা এখন মরে গেল। এটাকে এখন শ্মশানে বয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। এটা ছাই হয়ে যাবে। কিন্তু এই শরীরের মৃত্যু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমিও কি মরে যাব? আমি কি শরীর? আমার শরীর কোন কথা বলে না, এটা জড়, কিন্তু আমি আমার ব্যক্তিত্বের পূর্ণ শক্তি অনুভব করছি, তাছাড়া নিজের অন্তরে একটা ‘আমিত্ব’ও বোধ করছি। সুতরাং আমি শরীরের অতিরিক্ত আত্মা। শরীরের মৃত্যু হয় কিন্তু আত্মাকে মৃত্যুর স্পর্শ করতে পারে না। তার অর্থ আমি অমর আত্মা।’ এগুলো কেবলমাত্র শুষ্ক বিচার নয় পরন্তু জীবন্ত সত্যের মত কোনরূপ মানসিক প্রক্রিয়া ছাড়াই স্পষ্ট আমার মধ্যে বিদ্যুতের মত ঝলকে উঠল। ‘আমি’ একটা কিছু স্পষ্ট সত্য, আমার বর্তমান অবস্থার একমাত্র সত্য, আর আমার যাবতীয় সচেতন শারীরিক ক্রিয়াশীলতা সেই ‘আমি’তে কেন্দ্রিত রয়েছে। সেই মুহূর্ত থেকে ‘আমি’ বা আত্মা নিজের ওপরই একটা প্রবল আকর্ষণে কেন্দ্রীভূত হল। মৃত্যুভয় চিরকালের জন্য চলে গেল। আত্মস্থিতি সেই থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে লাগল। অন্য চিন্তাগুলো সানাই-এর সরগমের মত আসে যায় কিন্তু ‘আমি’টা যেন প্রধান শ্রুতির মত পোঁ ধরেই আছে আর তার ওপর যতসব রাগ ও রাগিণী খেলে যাচ্ছে। শরীর যাতেই ব্যস্ত থাক না কেন, কথা বলা, পড়া বা অন্য কিছু, আমিটা কিন্তু সেই ‘আমি’তেই ধরা আছে। এই ঘটনা হওয়ার আগে আমার নিজের সম্বন্ধে কোন স্পষ্ট ধারণা ছিল না আর তার প্রতি কোন আকর্ষণও ছিল না। আমি এর প্রতি কোন অনুভবনীয় বা প্রত্যক্ষ আগ্রহও অনুভব করিনি, তাতে স্থায়ীভাবে থাকা তো দূরের কথা।” ( রমণ মহর্ষি ও আত্মজ্ঞানের পথ, আর্থার ওসবোর্ণ, অনুবাদ: শ্রীমতী পূর্ণিমা সরকার )
জনৈক্য পাশ্চাত্য জিজ্ঞাসু প্রল ব্রান্টন শ্রীরমণ মহর্ষিকে জিজ্ঞাসা করেন -- ‘আপনি যে আত্মার কথা বলেছেন তার স্বরূপ কি? আপনি যা বলেছেন তা যদি সত্য হয় তবে এই অবস্থায় মানুষের দুটি আত্মা থাকতে হবে।’ ‘আমি’ যে সমষ্টিগত অবিনাশী আত্মা ও প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে একইরূপে বিরাজমান, এটা উপলব্ধি হওয়ার ফলে শ্রীরমণের মৃত্যুভয় চিরতরে অদৃশ্য হল। এমনকি একথা বলাও ঠিক হয় না যে, তিনি জানতেন যে, তিনি বিশ্ব চেতনার সঙ্গে একাত্ম, তাহলে মনে হবে যে এটা জানার জন্য একটা পৃথক ‘আমি’ ছিল, অন্যপক্ষে তাঁর সেই ‘আমি’টাই সেই পরম চৈতন্য। ফল ব্রান্টনের প্রশ্নের উত্তরে শ্রী রমণ জানান --- ‘একজনের দু’টি পরিচয় বা দু'টি আত্মা হওয়া কি সম্ভব? এই বিষয়টা বুঝতে গেলে মানুষকে আগে আত্মবিশ্লেষণ করতে হবে। কারণ সে অন্যেরা যেমন ভাবে, সেইরূপে বহুকাল ধরে ভাবতে অভ্যস্ত আর সে তার প্রকৃত ‘আমি’ স্বরূপের সম্মুখীন হয়নি। তার কাছে তার প্রকৃত স্বরূপের চিত্র নেই, সে অনাদিকাল থেকে নিজেকে শরীর বা মস্তিষ্ক বলে নির্ধারণ করে এসেছে। সেইজন্য আমি তোমায় ‘আমি কে’ রূপ বিচার চালিয়ে যেতে বলেছি।
তুমি আমায় প্রকৃত আত্মার কথা বর্ণনা করতে বলেছ। কি বলা যেতে পারে? এটা সেই যা থেকে ব্যক্তিগত সত্তার উৎপত্তি হয় আর যাতে সেই সত্তাকে আবার লয় হয়ে যেতে হবে। (ক্রমশ)
0 Comments