মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২২১
ক্ষীরাইয়ের শহীদগণ (পিংলা, পশ্চিম মেদিনীপুর)
ভাস্করব্রত পতি
১৯৩০ সালের ১১ ই জুন পূর্ণিমার দিন (২১ শে জৈষ্ঠ্য, ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ, বুধবার) পিংলার ক্ষীরাই গ্রামে চৌকিদারী কর বন্ধের আন্দোলনকে দমাতে মেদিনীপুরের তৎকালীন জেলাশাসক জেমস পেডীর নির্দেশে ঘটেছিল এক রক্তক্ষয়ী ঘটনা। রক্তস্নাত হয়েছিল এখনকার মাটি। গ্রামের মাটি লাল হয়ে উঠেছিল সেদিন। হতবাক হয়েছিল শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষজন। ঘৃণা, ক্ষোভ, রাগে ফেটে পড়েছিল বাংলার মানুষ। মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত শান্তিকামী ক্ষীরাইয়ের সাধারণ গ্রামবাসীদের জীবনে সেদিন নেমে এসেছিল গভীর অমানিশা।
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পিংলা থানার ক্ষীরাই গ্রামের হাড়হিম করা সেই ঘটনা পরবর্তীতে পরিচিতি লাভ করে 'বাংলার জালিয়ানওয়ালাবাগ' হিসেবে। আসলে পিংলার ঘটনার ১১ বছর আগে ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল বৈশাখী উৎসবের দিন পাঞ্জাবের অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগ উদ্যানে ব্রিটিশ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও ডায়ারের নির্দেশে নিরস্ত্র জনতার ওপর নির্বিচারে এবং নৃশংসভাবে গুলি চালানো হয়। বর্বরোচিত সেই ঘটনায় শত শত মানুষ নিহত হন। আহত হন আরও বেশি। এখানে সেদিন রাওলাট আইনের প্রতিবাদে এবং দুই নেতা সইফুদ্দিন কিচলু ও সত্যপালের গ্রেফতারের বিরুদ্ধে সভা ডাকা হয়েছিল। মানুষজন ছিল সম্পূর্ণ নিরস্ত্র। তাঁদের নির্বিচারে হত্যা করে ব্রিটিশ পুলিশ। সেই ঘটনার প্রতি বাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'নাইট' উপাধি ত্যাগ করেছিলেন। ঠিক এরকম ঘটনা ঘটেছিল পশ্চিমবঙ্গের অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার পিংলা থানার প্রত্যন্ত ক্ষীরাই গ্রামে।
রক্তস্নাত ক্ষীরাইতে ১৫ ই আগস্ট মধ্যরাতে শহীদদের সম্মান জানাতে উদ্যোগ
জালিয়ানওয়ালাবাগের মতো এখানেও সম্পূর্ণ নিরস্ত্র মানুষজনের ওপর সেদিন নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিল ৭০-৮০ জনের সশস্ত্র পুলিশ। 'বাইশ শহিদের স্মৃতির ক্ষীরাই' প্রবন্ধে গবেষক অরিন্দম ভৌমিক (আনন্দবাজার পত্রিকা, ১২/০৮/২০১৯) লিখেছেন, "ক্ষীরাই গ্রামের বিদ্রোহের খবর পৌঁছয় মেদিনীপুরের জেলাশাসক জেমস পেডির কাছে। পেডি তখন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পীড়নে যথেষ্ট দুর্নাম কুড়িয়েছেন। ক্ষীরাইয়ের বিদ্রোহীদের বাগে আনতে তিনি দমনের পথই নিলেন। সেদিন ১৯৩০ সালের ১০ জুন। বাংলা সন-তারিখ অনুযায়ী, মঙ্গলবার, ২৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৩৭ বঙ্গাব্দ।
জেলাশাসক পেডি ৭০-৮০ জনের সশস্ত্র পুলিশ নিয়ে পিংলা থানায় উপস্থিত হয়। পরের দিন ১১ জুন ছিল পূর্ণিমা। জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা। সকালবেলায় পুলিশ রণকৌশল ছকে নেয়। পুরো বাহিনীকে ছোট ছোট দলে বিভক্ত করা হয়েছিল। সেই দল হানা দেয় ক্ষীরাই গ্রামে। যাঁদের নামে পরোয়ানা ছিল তাঁদের বাড়িতে হানা দিতে শুরু করে পুলিশের এক একটি দল। কিন্তু পুলিশ আসার খবর আগেই পেয়ে গিয়েছিলেন গ্রামবাসী। তাঁরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। কাউকে ধরতে না পেরে পুলিশ বাড়িঘর ভাঙচুর করতে শুরু করল।
শহীদ বেদীর গাত্রে লেখা রয়েছে শহীদদের নাম
পুলিশ যখন গ্রাম দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তখনই বেজে ওঠে শাঁখ। তখনকার বিপদ সংকেত ছিল শাঁখের শব্দ। মহিলারা শঙ্খধ্বনি দিয়ে সকলকে সচেতন করে দেন, গ্রামে পুলিশ এসেছে বলে। এক জায়গায় জমতে শুরু করেন গ্রামবাসীরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই বড় পুকুরের পূর্ব পাড়ের মাঠে বিশাল জমায়েত। সমবেত জনতা গর্জে ওঠে, 'সবাইকে বন্দি করতে হবে'। গ্রামবাসীদের বেশিরভাগই নিরস্ত্র ছিলেন। কেউ কেউ পান-বরোজের ছোট ছোট বাঁশের লাঠি হাতে নিয়ে এসেছিলেন বটে। কিন্তু তাঁরা কেউই পুলিশকে আক্রমণ করার কোনও চেষ্টা করেননি। পুলিশ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার জন্য প্রথমে শূন্যে গুলি চালায়। কিন্তু গ্রামবাসীরা তাতে কেউ ভয় পাননি। এর পরই পুলিশ কোমরের নীচ লক্ষ্য করে গুলি চালায়। কিন্তু মাঠ ছেড়ে যাননি কেউই। গ্রামবাসীরা ভয় পেয়ে না পালানোয় সম্ভবত আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল পুলিশ। এবার শুরু হয় সরাসরি গুলিবর্ষণ।"
'মেদিনীপুরের জালিয়ানওয়ালাবাগ : ক্ষীরাই হত্যাকাণ্ড' প্রবন্ধে (তাম্রলিপ্ত, ১২/০৮/২০২২) গবেষক জয়দেব মালাকার লিখেছেন, "ক্ষীরাই দিঘির পূর্বপাড়ে এই হত্যালীলা ঘটনার পর, দাম্ভিক পুলিশবাহিনী ভারী বুটের গম্ভীর আওয়াজের কম্পন তুলে দশটার পর গ্রাম ছেড়ে মেদিনীপুর সদরে ও পিংলা থানায় ফিরে যায়। গ্রামের মানুষ ভীত শঙ্কিত হয়ে কিছু সময়ের জন্য গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যায়। গ্রামজুড়ে কয়েক ঘণ্টা বিরাজ করে শ্বাশানের স্তব্ধতা। ভুলুষ্ঠিত প্রাণহীন দেহগুলি মাঠের মধ্যে পড়ে থাকে। পিপাসার্ত বেদনাকাতর আহতরা জলের জন্য আর্তনাদ করতে থাকলে দু-একজন মহিলা ঘটনা ঘটার বেশ কিছু পরে আহতদের জল দেন।
পিংলা থানার পার্শ্ববর্তী ডেবরা থানা থানার কংগ্রেস নেতা বিপিনবিহারী দে'র নেতৃত্বে বলাইচন্দ্র হাজরা, মোহিনীমোহন পতি প্রমুখ অন্যান্য কংগ্রেস কর্মীদের নিয়ে দুপুরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। আহতদের চিকিৎসার জন্য মেদিনীপুর নিয়ে আসেন। কয়েকজন আহতকে মেদিনীপুর হাসপাতালে, কয়েকজন আহতকে মেদিনীপুর রামকৃষ্ণ সেবাশ্রমে শুশ্রূষা জন্য ভর্তি করা হয়। পুলিশের অনুমতি সাপেক্ষে ডাঃ সুরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত তাঁর পুত্র উষানাথ ও কম্পাউণ্ডার গুলিবিদ্ধ আহতদের গুলিসমূহ নিষ্কাসন করেন। মোট ২৬ জন আহতদের মধ্যে যাঁরা গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন তাঁরা হলেন- ক্ষীরাই গ্রামের গয়ারাম ওঝা, ভূষণচন্দ্র খাঁড়া, ত্রৈলক্যচরণ জানা, ভজহরি খাঁড়া, কার্ত্তিকচন্দ্র মাঝি, পঞ্চানন সাঁতরা, কুঞ্জপুর গ্রামের কুঞ্জবিহারী ভক্তা, সিতিবিন্দা গ্রামের পুলিনবিহারী জানা, কুলতাপাড়া গ্রামের কালাচাঁদ মাঝি, সাহাড়দা গ্রামের যজ্ঞেশ্বর জানা।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পিংলা থানা ঘটনাস্থল থেকে মৃতদেহ বহনকারী পুরুষোত্তমপুরের পুলিনচন্দ্র দাস, পবনচন্দ্র দাস, নাড়মা গ্রামের সত্যেশ্বর মাইতি, ভূপতিচরণ মান্না, অটলবিহারী দাস সহ ত্রিশজনের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৪১, ১৪৬, ১২০ এ ও বি ধারায় মামলা দায়ের করা হয়। ধৃতদের মেদিনীপুর জেলে ৩/৪ মাস আটক করে রাখা হয়। একমাত্র অটলবিহারী দাসের ছয় মাসের কারাদণ্ড হয়। অভিযুক্তদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন চৌকীদারী ট্যাক্স বন্ধ আন্দোলনের প্রবক্তা দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমল।"
কিন্তু ব্রিটিশ পুলিশ তাঁদের রিপোর্টে এই ঘটনার বিবরণে সঠিক তথ্য প্রকাশ করেনি। ক্ষীরাইয়ে গুলি চালনার ঘটনায় সহকারী পুলিশ সুপার, খড়গপুর এস. এন. চট্টোপাধ্যায় (ক্যাম্প, পিংলা থানা) ১১.৬.৩০ তারিখে এক প্রতিবেদনে লিখেছিলেন -- "আজ সকালে খড়গপুরের সহকারী পুলিশ সুপারিন্টেনডেন্ট, ইন্সপেক্টর জে. এম. কার এবং সাব-ইন্সপেক্টর এইচ. এন. মল্লিক, জে. এন. তিওয়ারি ও এফ. হক-এর সঙ্গে, পিংলা থানা থেকে প্রায় ভোর ৪টা ৩০ মিনিটে ক্ষীরাইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হন, কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় কংগ্রেস স্বেচ্ছাসেবকের বিরুদ্ধে জারি করা ওয়ারেন্ট কার্যকর করার জন্য। খবর পাওয়া গিয়েছিল যে ক্ষীরাইয়ের লোকজন পার্শ্ববর্তী গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণ করবে এবং সেই উদ্দেশ্যে ১০.৬.৩০ তারিখ সন্ধ্যায় সুরেন্দ্র দাসের নেতৃত্বে কুঞ্জপুর হাটে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। আরও জানা গিয়েছিল যে তমলুক থেকে একশো স্বেচ্ছাসেবক এসে স্থানীয় লোকজনকে শক্তিশালী করেছে। দলটি একজন হেড কনস্টেবল ও ৩৪ জন কনস্টেবলসহ ক্ষীরাইয়ে পৌঁছায়, যাদের মধ্যে ১৫ জন মাস্কেট দিয়ে সজ্জিত ছিল। গ্রামে পৌঁছানোর আগেই শঙ্খধ্বনি শোনা যায়। বলা হয়, এটি লোকজনকে সমবেত হওয়ার সংকেত ছিল। দলটি গ্রামে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দলে বিভক্ত পুরুষদের ভিড় বিভিন্ন স্থানে লোকজনকে দেখা যাচ্ছিল। যাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি ছিল সেই বিপিন দাসকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হয়। তবে তাঁকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। কিন্তু ভিড় থেকে আলাদা হয়ে পড়া এক জন রিং লিডারসহ চার জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এদিকে খবর পাওয়া যায় যে গ্রামের সংলগ্ন চাষ করা জমিতে একটি বিশাল জনতা সমবেত হয়েছে। সহকারী পুলিশ সুপারের নির্দেশে দলটি সঙ্গে সঙ্গে সেখানে যায়। জনতাটি, যা সংখ্যায় হাজারেরও বেশি বলে মনে হচ্ছিল, অত্যন্ত উদ্ধত আচরণ করছিল এবং বড় বড় বাঁশের লাঠি নিয়ে সশস্ত্র ছিল। তাদের লাঠি নামিয়ে রাখতে বলা হয়। তারা অস্বীকার করলে লাঠিসজ্জিত পুলিশ অফিসার ও কনস্টেবলরা তাদের উপর চার্জ করে। কিন্তু তা ফলপ্রসূ হয়নি; বরং জনতা পাল্টা লাঠিচার্জ করে এবং পুলিশের দিকে মাটির ঢেলা ছুড়তে থাকে। আর কোনো বিকল্প না থাকায় একাধিকবার সতর্কবার্তা দেওয়ার পর সহকারী পুলিশ সুপার সশস্ত্র বাহিনীকে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। সময়টি ছিল আনুমানিক সকাল ৭টা।
যেহেতু অস্ত্র বহনকারী পুলিশ সদস্যরা নিরস্ত্র শাখার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং স্পষ্টতই খুবই দুর্বল নিশানাবাজ ছিলেন, তাই প্রথম দফার গুলিবর্ষণে তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি এবং জনতা আরও কাছে এগিয়ে আসে। এরপর পৃথকভাবে গুলি চালানো হয় এবং সদস্যদের বারবার নিচের দিকে লক্ষ্য করতে বলা হয়। এতে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় এবং প্রায় ১০ জন লোক আহত বা নিহত হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। তখনই গুলি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরপর পুলিশ দলটি একটি উঁচু ও সুবিধাজনক অবস্থানে সরে যায়। কারণ গুলি বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার পরও জনতা পুরোপুরি ছত্রভঙ্গ হয়নি, কেবল কিছুটা পিছিয়ে গিয়েছিল। পর্যাপ্ত বাহিনী না থাকায় আহত বা নিহতদের হেফাজতে নেওয়া সম্ভব হয়নি, যেমনটি সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করার জন্যও যথেষ্ট শক্তি ছিল না। ফলে মৃত ও আহতদের দাঙ্গাকারীরাই সরিয়ে নিয়ে যায়। উপলব্ধ বাহিনীকে গ্রামের উপর অভিযান চালিয়ে দাঙ্গাকারীদের, মৃত ও আহতদের হেফাজতে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী মনে করা হয়নি।
পুলিশ যে স্থানে অবস্থান নিয়েছিল সেখানে এক ঘণ্টারও বেশি সময় অপেক্ষা করার পর দলটি থানা অভিমুখে রওনা দেয় এবং সেখানে অতিরিক্ত বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করে। মোট ৪৬ রাউন্ড গুলি চালানো হয়, যার মধ্যে ৪২ টি ছিল বাক শট এবং ৪ টি ছিল বুলেট। হেড কনস্টেবল ও অন্যান্য সদস্যদের মোট ১৫০ টি বুলেট এবং ১৫০ টি বাক শট দেওয়া হয়েছিল।"
এতে ১১ ই জুন (১৯৩০) ঘটনাস্থলে মারা যান ১০ জন এবং ঐদিন আরও ৯ জন মারা যান। পরের দিন ১২ ই জুন ১ জন এবং আরও পরে ২ জন মেদিনীপুর হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। সবমিলিয়ে মোট ২২ জন শহীদ হন ক্ষীরাইয়ের বুকে গুলি চালানোর ঘটনায়। ক্ষীরাইয়ের সেইসব শহীদরা সকলেই মেদিনীপুরের সন্তান। মেদিনীপুরের মানুষ রতন। হয়তো তাঁদের সকলের নাম অনেকেই জানেনা। কিন্তু তাঁরা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। সেইসব মৃত্যুঞ্জয়ী শহীদরা হলেন --
১. ভীমাচরণ জানা, মালিগ্রাম
২. গোপীনাথ খাঁড়া (গুণীন্দ্র), কুঞ্জপুর
৩. অধরচন্দ্র সিং, পূর্ব ক্ষীরাই
৪. অদ্বৈতচরণ ধাড়া, পূর্ব ক্ষীরাই
৫. নরেন্দ্রনাথ পাড়ই, পূর্ব ক্ষীরাই
৬. বাবুলাল জানা, পূর্ব ক্ষীরাই
৭. ঈশ্বরচন্দ্র মণ্ডল, কুলতাপাড়া
৮. নরেন্দ্রনাথ দাস, পূর্ব ক্ষীরাই
৯. গোবিন্দচরণ সিংহ, কুঞ্জপুর
১০. পূর্ণেন্দু ঘোড়ই (পুনু), গোবর্ধনপুর
১১. লক্ষ্মণচন্দ্র বেরা, সিতিবিন্দা
১২. রামপদ বেরা (রামচাঁদ), সিতিবিন্দা
১৩. মহেশ্বর মাইতি, রাজমা
১৪. শ্রীমন্তচরণ মাইতি, দণ্ডশিরা
১৫. জগন্নাথ ভক্তা, কুঞ্জপুর
১৬. কালাচাঁদ মাঝি, কুলতাপাড়া
১৭. ত্রৈলোক্যনাথ গুছাইত, রাত্রাপুর
১৮. উপেন্দ্রনাথ পালই, কুলতাপাড়া
১৯. গোবিন্দচন্দ্র দে, কাঁটাপুকুর
২০. ধনঞ্জয় মণ্ডল, পূর্ব ক্ষীরাই
২১. ধরণীধর জানা, পূর্ব ক্ষীরাই (হাসপাতালে মৃত্যু হয়)
২২. বিপিনবিহারী খাটুয়া, মালিগ্রাম (মেদিনীপুর হাসপাতালে মারা যান)
এই ঘটনার পর আনন্দবাজার পত্রিকায় এর বিবরণে লেখা হয়েছিল -- "জুন মাসের প্রথম ভাগে কাঁথি ও তমলুকের মত মেদিনীপুর সদর মহকুমার পিংলা থানার অধীন ক্ষীরাই ও পার্শ্ববর্তী গ্রাম সমূহে ট্যাক্স বন্ধ আন্দোলন শুরু হয়।
সরকার পক্ষ হইতেও তাহার বিরুদ্ধে বিশেষ প্রচার চলিতে থাকে। পঞ্চবিংশ বৎসর বয়স্ক সবলদেহ যুবক ভীম জানাই আন্দোলনের প্রাণ স্বরূপ ছিলেন। ৯ জুন তারিখে পিংলার দারোগা পুলিশ সহ ক্ষীরাই গ্রামে উপস্থিত হয় এবং গ্রামবাসীদের আন্দোলন বন্ধ করিতে বলে। তাহাতে তাহারা অসম্মত হয়। পুলিশ ভয় দেখাইয়া চলিয়া যায়। পরদিন ১০ জুন সকাল বেলা পিংলা থানার বড় দারোগা খড়াপুরের বড় দারোগা ও সদর থানার দারোগা প্রায় পঞ্চাশ জন বন্দুকধারী পুলিশসহ ক্ষীরাই গ্রামে উপস্থিত হয় এবং দেবেন্দ্রের বাড়ি যাইয়া তাহার খোঁজ করে। দেবেনের স্ত্রী বন্ধ দরজার আড়াল হইতে দেবেন বাড়ি নাই জানায়। পুলিশ ঘরের দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে ও দেবেনের গর্ভবতী স্ত্রীকে প্রহার করে। কোলের শিশুকে মাটিতে আছাড় দিয়া ফেলিয়া দেয়।
স্ত্রীলোকটির চিৎকারে ও শঙ্খের সংকেতধ্বনিতে আকৃষ্ট হইয়া অল্পকাল মধ্যে দুই শতাধিক লোক জমায়েত হয়। পুলিশ তাহাদিগকে চলিয়া যাইতে বলে কিন্তু তাহারা জিজ্ঞাসা করে বিনা কারণে স্ত্রীলোকটির ও শিশুটির উপর অত্যাচার করা হইল কেন? জনতার এই ঔদ্ধত্যে পুলিশ ক্ষুব্ধ হইল এবং তৎক্ষণাৎ চলিয়া না গেলে গুলি করিবে বলিয়া ভয় দেখাইল। ভীম জানা ও তাহার সহকর্মী আরো দু-তিনজন বক্ষেত্মোচন করিয়া বলিল- গুলি করিবেন করুন, প্রাণের ভয়ে পলাইব না। তবে জানিয়া রাখুন আমরা মহাত্মা গান্ধীর অহিংস মন্ত্রে দীক্ষিত, অহিংস আদর্শে অনুপ্রাণিত ও মহাত্মাজির ধর্মযুদ্ধে নিরত। সাধারণ লোকের এত সাহস, পুলিশের আদেশ এমনভাবে অবহেলা করিবার মতো স্পর্ধা দেখিয়া পুলিশ মুহূর্ত কালে মোহাবিষ্টের ন্যায় থাকিয়া পর মুহূর্তে গুলি চালাইল। ভীম জানা ও অপর ১০ জন দেহের পুরো ভাগে গুলিবিদ্ধ হইয়া ধরাশায়ী হইল। পরম আশ্চর্যের বিষয় নিহত ব্যক্তিদের কেহই বুক বা দেহের সম্মুখভাগ ছাড়া দেহের পশ্চাৎ ভাগে বিদ্ধ হন নাই। প্রায় ৩০ জন লোক আহত হয়। তাহাদের মধ্যে দুইজন পরে মেদিনীপুর হাসপাতালে মারা যায়। উক্ত ব্যক্তিদ্বয়ের একজন হাসপাতালে ক্ষতস্থান ধৌত করিবার সময় একদিন বলিয়াছিলেন- 'গান্ধী বল, আর কতদিন এ যাতনা ভুগিব'। পুলিশ ঘটনার পরে কিছু দূরে যাইয়া এক বড়পুকুর পাড়ে তিন চার ঘন্টা অপেক্ষা করিয়া চলিয়া যায়। গ্রামবাসীগণ শবদেহগুলি কলিকাতায় লইয়া যাইবার জন্য নিকটবর্তী স্টেশনে লইয়া যায়। রেল কোম্পানি সে সুবিধা না দেওয়ায় সন্ধ্যার অব্যবহিত পরে স্টেশনের নিকটবর্তী ভূমিখন্ডে শবদেহগুলির সৎকার করে। পরদিন সকাল বেলা পুনর্বার পুলিশ ক্ষীরাই গ্রামে প্রবেশ করে এবং যেসব স্থানে রক্ত জমিয়াছিল, তাহা ধুইয়া পরিষ্কার করিতে চেষ্টা করে। যেসব জায়গার রক্ত ধুইয়া ফেলা অসম্ভব সেসব স্থানের রক্তের দাগ মাটি চাঁছিয়া উঠাইয়া লইয়া যায়।"
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের মতো ক্ষীরাই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদেও সর্বত্র ঝড় ওঠে। সেসময় মেদিনীপুরের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ সমাবেশে সংঘটিত হয়। লবণ আইন অমান্য ও চৌকীদারী ট্যাক্স বন্ধ আন্দোলন আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। পেডীর নির্দেশে ঘটা দাসপুরের চেঁচুয়াহাট এবং ক্ষীরাই গণহত্যার প্রতিশোধ নিতে বিপ্লবীরা শপথ নেয়। ১৯৩১ এর ৭ ই এপ্রিল গনহত্যার নায়ক পেডীকে খুন করা হয় মেদিনীপুর কলিজিয়েট স্কুলের শিক্ষা প্রদর্শনীর মঞ্চে। 'বেঙ্গল ভল্যান্টিয়ার্স' এর সদস্য বিপ্লবী বিমল দাশগুপ্ত এবং জ্যোতিজীবন ঘোষ গুলি করে হত্যা করেন ক্ষীরাই ও চেঁচুয়াহাট গনহত্যার মাস্টারমাইন্ড জেলাশাসক পেডীকে। চেঁচুয়াহাটের ১৪ জন এবং ক্ষীরাইয়ের ২২ জন শহীদের তর্পণ সম্পন্ন করেন বাংলার বিপ্লবীরা। আজ ক্ষীরাইতে গ্রামবাসীদের উদ্যোগে ১৩৬১ বঙ্গাব্দে স্থাপিত হয়েছে একটি শহীদস্তম্ভ। এই শহীদস্তম্ভে মোট ১৬ জন শহীদের নাম থাকলেও আদপে সেদিনের ঘটনায় মৃত্যু হয় ২২ জন গ্রামবাসীর। তাই সকলের দাবি, এখানে ঐ বাইশ শহীদেরই নাম উল্লিখিত হোক।
তথ্যঋণ : পিংলা থানার স্বাধীনতা আন্দোলন, ড. গোবিন্দ প্রসাদ কর
0 Comments