জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার : অন্তিম খণ্ড/পর্ব ৬ : ছায়ার অন্তরালে/কমলিকা ভট্টাচার্য

বাঁচার উত্তরাধিকার : অন্তিম খণ্ড
পর্ব ৬ : ছায়ার অন্তরালে
কমলিকা ভট্টাচার্য

আগস্টের শুরু।
লন্ডনের গ্রীষ্ম যেন ধীরে ধীরে শরতের দিকে পা বাড়াচ্ছে। দিনের আলো এখনও দীর্ঘ, কিন্তু বাতাসে কোথাও এক অদ্ভুত শীতলতার আভাস। টেমসের জলও যেন আগের চেয়ে শান্ত। নদীর দুই ধারে সারি সারি প্লেন গাছের পাতায় হালকা হলুদের ছোঁয়া ফুটতে শুরু করেছে। সন্ধ্যা নামলেই নদীর বুকজুড়ে শহরের আলোগুলো দীর্ঘ রেখা এঁকে কেঁপে ওঠে। পর্যটকদের ভিড় আগের মতোই আছে, কিন্তু প্রকৃতি যেন নিঃশব্দে ঋতু বদলের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কিন্তু মানুষের মন?
সেখানে ঝড় আরও ঘন হয়ে উঠছে।
গত এক মাসে আদরের স্মৃতির কিছু কিছু অংশ ফিরে এসেছে। কোনো মুখ স্পষ্ট নয়, কোনো ঘটনার পূর্ণ ছবি নেই। শুধু কিছু অনুভূতি, কিছু নাম, কিছু সুর—যেন ভাঙা আয়নার ছড়িয়ে থাকা টুকরো।
আর সেই কারণেই দৃষ্টির অস্থিরতা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
তার বিশ্বাস এখন একটাই—দর্শন ইচ্ছে করেই আদরের স্মৃতি ফেরাচ্ছে না।

সেদিন সকালে সুসানের বাড়িতে পৌঁছেই দৃষ্টি বুঝতে পারল, আদরের মন আজ অস্বাভাবিক অস্থির।
সে জানলার ধারে বসে টেমসের দিকে তাকিয়ে ছিল। সকালের কোমল রোদ নদীর জলে রুপোলি রেখা এঁকে দিচ্ছে। দূরে একটি পর্যটকবাহী নৌকা ধীরে ধীরে ভেসে চলেছে। কাছের চার্চের ঘণ্টাধ্বনি বাতাসে মিলিয়ে গিয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তির আবহ তৈরি করেছে।
দৃষ্টি ধীরে এগিয়ে এসে পাশে বসল।
— "কী ভাবছ?"
আদর অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— "আজ সকাল থেকে মাথার ভেতর একটা সুর ঘুরছে। মনে হচ্ছে আমি ওটা বহুবার শুনেছি... হয়তো বাজিয়েছিও। কিন্তু যতই ধরতে চাই, ততই যেন হাত ফসকে চলে যাচ্ছে।"
দৃষ্টির বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।
এই অনুভূতিটা সে চেনে।
স্মৃতি কখনও কখনও শব্দে নয়—সুরে ফিরে আসে।
সে আর এক মুহূর্ত দেরি করল না।
ঘরের কোণে রাখা ভায়োলিনটি তুলে নিল।
সুসান বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইলেন।
দৃষ্টি চোখ বন্ধ করে খুব আস্তে Fix You–এর প্রথম সুর তুলল।
নরম, বিষণ্ন, অথচ আশাবাদী।
যেন ভাঙা হৃদয়কে ধীরে ধীরে আলোয় ফিরিয়ে আনার এক আন্তরিক চেষ্টা।
কিছুক্ষণ পর সুসান নিঃশব্দে পিয়ানোর সামনে গিয়ে বসলেন। একই সুরে তাঁর আঙুল ছুঁয়ে গেল কিবোর্ড।
ভায়োলিন আর পিয়ানোর মেলবন্ধনে ঘরটা যেন অন্য এক জগতে ভেসে গেল।
আদর নিঃশ্বাস আটকে শুনছিল।
হঠাৎ তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
সেই সুরের গভীর থেকে যেন আরেকটি বহুদিনের চেনা সুর ধীরে ধীরে জেগে উঠতে লাগল।
দুটি সুর...
একটি পশ্চিমের, একটি বাংলার।
কিন্তু দুটোরই ভাষা এক—অন্ধকার পেরিয়ে আলোর দিকে ফিরে আসা।
তার চোখের সামনে হঠাৎ দৃশ্য বদলে গেল।
লন্ডনের একটি ব্যস্ত রাস্তার মোড়।
গোধূলির সোনালি আলো।
রাস্তার শিল্পীদের ভিড়।
দৃষ্টি চোখ বন্ধ করে Fix You বাজাচ্ছে।
আর তার ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে সে নিজের বেহালায় ধীরে ধীরে জুড়ে দিচ্ছে কবিগুরুর—
"আলোকের এই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও..."
প্রথমে দুটি আলাদা সুর।
তারপর ধীরে ধীরে তারা একে অপরকে জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে।
🍂
একটির বিষণ্নতা অন্যটির আলোর আহ্বানে গলে যাচ্ছে।
যেন এক গান বলছে—
"আমি তোমার পাশে আছি।"
আর অন্য গান উত্তর দিচ্ছে—
"এসো, সমস্ত অন্ধকার ধুয়ে আলোয় ফিরে যাই।"
তাদের বেহালার তারে জন্ম নিচ্ছে এক নতুন সুর—
যেখানে কোনো ভাষার বিভাজন নেই।
শুধু ভালোবাসা আছে।
আশা আছে।
আর আছে ফিরে পাওয়ার প্রতিশ্রুতি।
সেই দৃশ্যের মধ্যেই নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল আদর।
হাসতে হাসতে সে বলছে—
— "দৃষ্টি... দেখেছ? দুটি গান... অথচ কথা এক। একটাতে মানুষ মানুষকে আলোয় ফিরিয়ে আনতে চায়, আর অন্যটাতে মানুষ নিজেকে আলোয় সমর্পণ করে।"
দৃষ্টি হেসে উত্তর দিল—
— "তাই তো  একসঙ্গে বাজালে মনে হয়, ওরা যেন সবসময় একে অপরের জন্যই অপেক্ষা করছিল।"
পরের মুহূর্তেই দৃশ্যটা ঝাপসা হয়ে গেল।
আদরের ঠোঁট কেঁপে উঠল।
সে বিস্ময়ে দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
— "দৃষ্টি..."
দৃষ্টির হাত থেমে গেল।
তার চোখ জলে ভরে উঠেছে।
সুসান ধীরে ধীরে পিয়ানোর সুর বদলে দিলেন।
এবার ঘর ভরে উঠল শুধু—
"আলোকের এই ঝর্ণাধারায়..."
মৃদু হেসে তিনি বললেন,
— "এই গানটা আমার খুব প্রিয়। যখনই মনে হয় পৃথিবীটা একটু বেশি অন্ধকার হয়ে গেছে, তখন আমি এই গানটাই বাজাই।"
আদর কপালে হাত রাখল।
তার চোখ দুটো বিস্ময়ে ভরে উঠেছে।
— "আমি... আমি এই সুরটা চিনি..."
দৃষ্টি তার হাত আলতো করে ধরে বলল,
— "তুমি বাজাতে... আর আমি তোমার সঙ্গে সুর মিলিয়ে দিতাম। তুমি বলতে—পৃথিবীর দুই প্রান্তের দুটি গান, অথচ দুটোই মানুষের ভেতরের আলোকে খুঁজে ফেরে।"

আদর আরও কিছু মনে করার চেষ্টা করতেই মাথার ভেতর তীব্র যন্ত্রণা শুরু হলো।
সব দৃশ্য আবার কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে সোফায় বসে পড়ল।
ক্লান্ত কণ্ঠে বলল—
— "সবকিছু যেন খুব কাছে এসেও আবার দূরে চলে যায়..."
দৃষ্টি তার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে আস্তে বলল—
— "কোনো স্মৃতি কখনও হারিয়ে যায় না, আদর। সে শুধু সঠিক সুরটার অপেক্ষায় থাকে।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
প্রফেসর হ্যারিসনের টেবিলে একের পর এক আন্তর্জাতিক আমন্ত্রণপত্র জমছে। জাপান, জার্মানি, সুইডেন, কানাডা—সব দেশ থেকেই একই অনুরোধ এসেছে।
— "ড. আদর্শ সেনকে সরাসরি দেখতে চাই।"
হ্যারিসন দর্শনকে ডেকে পাঠালেন।
— "আমি আর মিথ্যে বলতে পারছি না।"
দর্শন শান্তভাবে বসে রইল।
— "প্রতিদিন নতুন নতুন অজুহাত দিচ্ছি। কেউ আর বিশ্বাস করছে না।"
— "আমি জানি।"
— "আর কতদিন?"
দর্শন ধীরে বলল,
— "আর একটু সময়।"
হ্যারিসন বিরক্ত হয়ে উঠলেন।
— "তোমার এই 'আর একটু' কথাটাই এখন আমার কাছে সবচেয়ে ভয়ের হয়ে উঠেছে।"
দর্শন নীরব রইল।
কিছুক্ষণ পরে হ্যারিসন ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,
— "তুমি কি সত্যিই আদরের স্মৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছ?"
প্রশ্নটা শুনেও দর্শনের মুখে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না।
— "যতটা প্রয়োজন, ততটাই করছি।"
হ্যারিসন গভীর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
প্রথমবার তাঁরও মনে হলো—দৃষ্টি কি সত্যিই ভুল বলছে না?
সেই রাতেই দর্শন আবার হারগ্রিভের সঙ্গে দেখা করতে গেল।
আজ হারগ্রিভকে আগের চেয়ে অনেক বেশি বিধ্বস্ত লাগছিল।
ঘরে ঢুকেই সে বলল,
— "দর্শন... আজ আমি একটা মানুষকে চিনতে পারিনি।"
— "কে?"
— "আমার নিজের আইনজীবী।"
সে হেসে উঠল, কিন্তু সেই হাসির ভেতরে স্পষ্ট আতঙ্ক লুকিয়ে ছিল।
— "আমার মনে হচ্ছে, আমার মাথার ভেতর কেউ অদৃশ্য হয়ে বাসা বেঁধেছে।"
দর্শন চুপচাপ শুনছিল।
— "তুমি কি মনে করো, আমি অসুস্থ হয়ে পড়ছি?"
কয়েক সেকেন্ড ভেবে দর্শন বলল,
— "আপনার বিশ্রাম দরকার।"
হারগ্রিভ হঠাৎ উঠে দাঁড়াল।
— "না!"
তার গলায় আবার সেই পুরোনো নিষ্ঠুরতার সুর ফিরে এল।
— "আমি মরার আগে আদর্শ সেনের সমস্ত প্রযুক্তি আমার চাই।"
সে দর্শনের দিকে তাকাল।
— "তুমি আমাকে নিরাশ করবে না, তাই তো?"
দর্শন নির্বিকার গলায় বলল,
— "আমি আপনার কাজ শেষ করব।"
হারগ্রিভ তৃপ্তির হাসি হাসল।
সে বুঝতেই পারল না—প্রতিবার দর্শনের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তার স্মৃতির আরেকটি দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে ভারতে অনির্বাণ, ঋদ্ধিমান, ইরা এবং নাতাশার দিনগুলোও আর স্বাভাবিক নেই।
দৃষ্টির সঙ্গে এখন নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে।
নিরাপত্তার কারণে ভিডিও কলে আদরকে তারা দেখেন না। তবু প্রতিদিন আদরের ছোট ছোট পরিবর্তনের খবর দৃষ্টি তাদের জানায়।
একদিন নাতাশা বললেন,
— "আমার খুব ইচ্ছে করছে ওকে একবার দেখতে।"
অনির্বাণ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
— "আমারও।"
ঋদ্ধিমান এতক্ষণ চুপ ছিলেন।
হঠাৎ তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
— "দর্শনের কোনো খবর?"
দৃষ্টি একটু ইতস্তত করে বলল,
— "ও... খুব বদলে গেছে।"
ঋদ্ধিমান শান্ত গলায় বললেন,
— "মানুষকে কখনও শুধু বাইরে দেখে বিচার কোরো না।"
দৃষ্টি আর কিছু বলল না।
কিন্তু তার নীরবতাই বলে দিচ্ছিল—সে আর দর্শনকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
রাত তখন প্রায় সাড়ে দশটা।
দর্শন একা টেমসের ধারে এসে দাঁড়াল।
নদীর জলে লন্ডনের আলো কেঁপে কেঁপে উঠছে।
সে নিজের ডান হাতের দিকে তাকাল।
এই হাত দিয়েই সে হারগ্রিভের স্মৃতি মুছে দিচ্ছে।
এই হাত দিয়েই আদরের গবেষণা শেষ করছে।
এই হাত দিয়েই একদিন হয়তো নিজের সমস্ত অস্তিত্ব অন্যদের জন্য বিলিয়ে দেবে।
হঠাৎ তার সিস্টেমে একটি সতর্কবার্তা ভেসে উঠল—
CORE ENERGY CELL : 89%
সে জানে, প্রতিবার নিজের নিউরাল শক্তি ব্যবহার করে হারগ্রিভের মস্তিষ্কে প্রবেশ করার সময় তার নিজের মূল শক্তিও ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে।
এই পথের শেষ কোথায়, সে জানে।
তবু সে থামে না।
কারণ তার কাছে নিজের বেঁচে থাকার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ—
আদরের ভবিষ্যৎ।
দৃষ্টির নিরাপত্তা।
অনির্বাণ, ঋদ্ধিমান, ইরা ও নাতাশার অসমাপ্ত স্বপ্ন।
দূরে বিগ বেনের ঘণ্টাধ্বনি ভেসে এল।
দর্শন আকাশের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,
— "আর অল্প কিছুদিন... তারপর সব শেষ হয়ে যাবে।"
তার কথা শুনল শুধু রাতের হাওয়া।
আর টেমস নদী।
যে নদী জানে—সবচেয়ে বড় আত্মত্যাগের গল্পগুলো কখনও উচ্চস্বরে বলা হয় না।
সেগুলো নিঃশব্দেই ইতিহাস হয়ে বেঁচে থাকে।
চলবে...

Post a Comment

1 Comments

  1. টানটান সাসপেন্স এবার উন্মোচন করছে ভালোবাসার জলোচ্ছ্বাস। ভালো থেকে মহতের দিকে বাঁক ফিরিয়েছে এই লেখা। অভিনন্দন। 🙏🙏🙏

    ReplyDelete