আবীর ভট্টাচার্য্য চক্রবর্তী
জন্মেছিলাম আশির দশকের মফস্বল শহরে। তখনকার দিনের আর পাঁচটা মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবারের মতই আমার পিতৃগৃহেও রবীন্দ্রপূজার চল ছিল, ভীষণভাবেই ছিল।
পঁচিশে বৈশাখ বা বাইশে শ্রাবণের সবিশেষ উদযাপনের বাইরেও মা-কাকীমার প্রাত্যহিক দুপুরের অবসরে আকাশবাণীর অনুরোধের আসর ছিল,আল্পনায় বা সূচীশিল্পে শান্তিনিকেতনের প্রভাব ছিল,নববর্ষা ঘনিয়ে এলে খিচুড়ি-ডিমভাজার সঙ্গে মায়ের গলায় গুনগুনিয়ে “আবার এসেছে আষাঢ়” ছিল,নওলকিশোরীর পূর্বরাগ উন্মেষক্ষণে ‘মালতীলতা দোলে’-এর নবারুণ লজ্জা ছিল, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন,ছিলেনই…
তারপরে কলেজ বেলা… সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন,চীনের ছাত্র আন্দোলন;বাবা-কাকুদের সান্ধ্যকালীন আলোচনায়,খবরের কাগজের পাতাজোড়া প্রতিবেদনে পাড়ার মোড়গুলিও সরগরম, তরুণ প্রাণে নতুন দোলাচল…বুঝে বা না বুঝে আজীবনের ঠাকুরের কাছে আবার নতিস্বীকার…‘এবার ফিরাও মোরে’…
সেই প্রথম বড়ো হয়ে ওঠা, সেই প্রথম নতুন চোখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে চেনা।
আসলে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য মহীরুহ; কেবলমাত্র কবি, সাহিত্যিক, সংগীতস্রষ্টা বা চিত্রকর হিসেবে নন, এক গভীর মানবতাবাদী চিন্তক হিসেবেও যাঁর ভাবনায় ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিশ্বমানবতার প্রসঙ্গ ছিল এক পরমবোধে দ্রব। এবং সেইজন্যই জন্মের দেড়শো বছর পেরিয়েও খ্যাত-বিখ্যাত,প্রাজ্ঞ বা অর্বাচীন—সবার কাছেই তিনি সমান গ্রহণীয়, যাঁর কথা ভাবতে গেলেই রাশি রাশি শ্রদ্ধার নৈবেদ্য গুরুচরণে নিবেদিত হয় আজও।
তবে এসবের অধিকাংশই তো সেই চিরাচরিত আবেগলালিত সুখ, বাঙালিয়ানার ভ্রম।পরিনত বোধের নির্মোহ দৃষ্টিতে একজন আলোকসামান্য ব্যক্তিত্বের মূল্যায়ন বড়ো সহজ কথা নয়। তবু যদি তাও করতে যাই, প্রথমেই বলতে ইচ্ছে করে, রবীন্দ্রনাথের মানবপ্রেমের কথা। যে মানুষ মানুষের মর্যাদা ও কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেন তাঁর জীবনব্যাপী সকল সৃষ্টিকর্মে, তাঁর ভাবনার সঙ্গে বামপন্থী মানবমুক্তির আদর্শের একটি স্বাভাবিক সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া দুষ্কর নয়। এবং সেই দৃষ্টিভঙ্গীতেই আমার এই সামান্য আলোচনা।
🍂
আলোচনার প্রথমেই মনে রাখি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন উনবিংশ শতাব্দীর একটি উচ্চবিত্ত ও অভিজাত পরিবারের সন্তান। বামপন্থী চেতনার আলোকে রবীন্দ্রনাথকে বিচার করতে গেলে আমাদের এই কথাটি ভালোভাবে মনে রাখতে হবে।কারণ,বামপন্থার মূল লক্ষ্য হলো বুর্জোয়াদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য এবং মানুষের মর্যাদার স্বীকৃতি। এবং রবীন্দ্রনাথ তথাকথিত বুর্জোয়া গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হয়েও তাঁর জীবনভর রচনায় সামাজিক বৈষম্যবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি, শোষিত মানুষের প্রতি তাঁর সহজ সহমর্মিতা, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান এবং মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন।
যদিও কখনও বামপন্থী বলে পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন তাঁর হয়নি, কিন্তু তাঁর চিন্তা ও সাহিত্যকর্মে এমন বহু উপাদান রয়েছে যা প্রগতিশীল ও বামপন্থী চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।মানুষের প্রতি মানুষের শোষণের বিরুদ্ধে তীব্রতর ঘৃণা এবং সমাজের নানাবিধ বৈষম্যের বিরুদ্ধে বারংবার তাঁর মসী অসিরুপ ধারণ করেছে। জমিদার হয়েও অধীনস্থ প্রজা-কৃষকের জীবন, তাদের দুঃখ-কষ্ট ও বঞ্চনাকে গভীরভাবে অনুভব করেছেন। শিলাইদহ, পতিসর ও শাহজাদপুরে জমিদারি তদারকির সময় তিনি গ্রামীণ বাংলার শ্যামকোমল প্রকৃতিই শুধু দেখেননি, দেখেছিলেন ক্ষুধাকাতর অসহায় মানুষের মুখগুলিও। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর অসাধারণ কাব্যঋদ্ধ মননে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।চিত্রা-মানসী-পূরবীর রোমান্টিক কবি হয়েও মানুষ তিনি তাই উপলব্ধি করেন, যে দেশের প্রকৃত শক্তি গ্রামে,সেই গ্রামের মানুষের দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও শোষণমুক্তি না হলে কাব্যচর্চা বৃথা। এবং এই উপলব্ধিই তাঁকে লিখতে বাধ্য করে,
“ওরে তুই ওঠ আজি আগুন লেগেছে কোথা…” এবং তারই ফলশ্রুতিতে আসে বহুধা কাব্যসৃষ্টির মধ্যেও পল্লী উন্নয়নের কাজে আত্মনিয়োজন, নতুন ধরনের শিক্ষাবিস্তারে শান্তিনিকেতন,শ্রীনিকেতনের মাধ্যমে গ্রামীণ পুনর্গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ,এমনকি নোবেল পুরস্কারের সমস্ত অর্থ দানে কৃষকদের জন্য সমবায় ব্যাংক স্হাপন। বামপন্থী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটি ছিল সাধারণ মানুষের ক্ষমতায়ন ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য একজন হিতাকাঙ্ক্ষী মহান মানুষের গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা,যা সমকালীন সময়ের প্রেক্ষিতে অসাধারণত্বের দাবী রাখে।
আবার অন্যদিক দিয়ে দেখলে, প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির নিবিড়তম আত্তীকরণ সত্ত্বেও পাশ্চাত্যের বহমানতা গ্রহণে আমৃত্যু উৎসুক্য তাঁকে এশিয়া মহাদেশের অপরাপর কৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের চাইতে পৃথক আসনে বসিয়েছিল।প্রায় সারা পৃথিবী পরিভ্রমণের সুযোগে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে এক অনন্য প্রাজ্ঞতা দান করেছিল,যা তাঁর বিশ্বকবির পরিচিতির ভিত্তি ছিল।তাঁর আপন কথায়, “আমি পৃথিবীর কবি,যেথা তার যত ওঠে ধ্বনি…”
তাই তথাকথিত প্রতিবাদী হট্টগোলের বাইরে এক নিবিড় শুভবোধের আলো জ্বেলে তাঁর সৃষ্ট চরিত্রেরা তাঁরই মতো নির্মল মানবসেবায় ব্রতী হয়েছেন।
সমাজের নিচুতলার মানুষের জীবনসংগ্রামের চিত্র,কৃষকের অসহায়ত্ব, ক্ষমতাবানের দখলদারী মানসিকতা, সমাজের শ্রেণিগত বৈষম্য, সমানাধিকারের আকুতিতে নারীর আকুলতা, লিঙ্গবৈষম্য তাঁর লেখনীতে প্রাণময় হয়েছে (দেনাপাওনা,মুসলমানির গল্প,শাস্তি, স্ত্রীর পত্র,গোরা,চোখের বালি,ঘরে বাইরে, যোগাযোগ) বারংবার। বাস্তবধর্মী সাহিত্যধারায় ভারতীয় সমাজের বঞ্চিত মানুষের জীবনকে সার্বিকভাবে সাহিত্যিক মর্যাদা দেওয়ার অগ্রদূত প্রকৃতপক্ষে তিনিই।।অন্যদিকে,ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সাহসী প্রতিবাদে, সাম্রাজ্যবাদী অবিচার এবং শোষণের বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ প্রতিরোধেও ঋজুদেহী মানুষটির পথে নেমে কায়িক আন্দোলনটিকেও স্মরণ করি গভীর শ্রদ্ধায় (বঙ্গভঙ্গ রোধ,জালিয়ানওয়ালাবাদের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিস্ সরকারের দেওয়া নাইট উপাধি ত্যাগ)।
তবে এসব সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ ও প্রচলিত মার্কসবাদী চিন্তার মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও ছিল।কারণ, উভয়ের মত-পথ ও প্রকাশভঙ্গী ছিল ভিন্ন।
মার্কসবাদ শ্রেণিসংগ্রামকে সামাজিক পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখে। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ মানুষের মধ্যে সংঘাতের পরিবর্তে সহযোগিতা ও মানবিক ঐক্যের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন,কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে মানুষের মুক্তি কেবল অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে নয়, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের মাধ্যমেই সম্ভবপর হয়। তাঁর কাছে মানুষ কোন বিশেষ শ্রেণির প্রতিনিধি মাত্র নয়; মানুষ এক বৃহত্তর মানবিক সত্তা।
তাই রাশিয়া সফরের পর লেখা “রাশিয়ার চিঠি”-তে রবীন্দ্রনাথ নবগঠিত একটি বিপ্লবী রাষ্ট্র কিভাবে মানবকল্যাণে সার্বভৌম শক্তিপ্রয়োগ করতে পারে তা দেখে চমৎকৃত হয়েছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের শিক্ষা বিস্তার, নিরক্ষরতা দূরীকরণ এবং সাধারণ মানুষের উন্নয়নের প্রচেষ্টার ভূয়সী প্রশংসা করেও তবু ব্যক্তিস্বাধীনতার সংকোচন ও মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছিলেন।কারণ, সামাজিক ন্যায়বিচারকে সমর্থন করলেও মানুষের স্বাধীনতা অধিকতর কাম্য মনে করতেন রবীন্দ্রনাথ।
এবং ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নেও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আদ্যোপান্ত আধুনিক এবং সময়ের চাইতে বেশি কয়েক কদম এগিয়ে থাকা ব্যক্তিত্ব। তিনি মানুষের পরিচয়কে ধর্মের সংকীর্ণ গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। তাঁর মানবধর্মের ধারণা সর্ব বিভাজনের ঊর্ধ্বে। বামপন্থী ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের মতোই তিনি বিশ্বাস করতেন যে মানুষে মানুষে বিভেদ নয়, ঐক্যই সভ্যতার অগ্রগতির পথ।
বর্তমান সময়ে যখন বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা, আগ্রাসী জাতীয়তাবাদ এবং অর্থনৈতিক শোষণের নানাবিধ রূপ সমাজকে গ্রাস করছে, তখন রবীন্দ্রনাথের চিন্তা নতুনভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। বামপন্থী চেতনার আলোকে তাঁর সাহিত্য ও দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা ছাড়া প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
অতএব বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ তথাকথিত তকমাধারী বামপন্থী রাজনীতির প্রবক্তা না হলেও তাঁর মানবতাবাদ, শোষণবিরোধিতা, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থান, গ্রামীণ উন্নয়নের কর্মসূচি এবং সাম্যের আকাঙ্ক্ষা বামপন্থী চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। সামাজিক ন্যায় ও মানবমুক্তির সংগ্রামে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ নয়,সাংস্কৃতিক ও নৈতিক চেতনার সমৃদ্ধিই যে আলোকময় দিশা দেখাতে পারে একটি দেশ বা জাতিকে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন এই মতের প্রবক্তা,এক জ্বাজ্বল্যময় আলোকবর্তিকা।খন্ডিত কোন মতে বা পাত্রে তাঁর মূল্যায়ন অসাধ্য।
0 Comments