সোমনাথ মুখোপাধ্যায়
সেতু বেঁধে দেয় বন্ধনহীন গ্রন্থি
সেতু মানেই হলো যোগাযোগের সহজতা। সীতা দেবীকে দুরাত্মা রাবণের হাত থেকে উদ্ধার করতে রামচন্দ্র সেতু নির্মাণ করেছিলেন উত্তাল সমুদ্রের ওপর দিয়ে। তাঁর পরামর্শদাতা ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন বানর প্রযুক্তিবিদ নল, সহযোগী হিসেবে তাতে হাত লাগিয়েছেন বানর সেনারা। সেই সেতুর পথ পাড়ি দিয়ে রামচন্দ্র পৌঁছে গেলেন লঙ্কায়, উদ্ধার হলেন সীতা দেবী।
আমাদের প্রিয় শহর কলকাতা এবং হুগলি নদীর অন্য পারে থাকা হাওড়া শহরের মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী রবীন্দ্র সেতু ইংরেজদের তৈরি। নির্মাণ প্রযুক্তির দিক থেকে এও এক বিস্ময়। আসলে দূরের দেশ , দূরের মানুষদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে সেতুর ভূমিকা অনন্য। মানুষের তাগিদের পাশাপাশি প্রকৃতিরও বোধহয় একটা অন্যরকম তাগিদ আছে দূরের প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের একাধিক গাছের সেতু আজ তাই বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছে। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃতি জানিয়েছে।
পর্বত আর গহন অরণ্যসঙ্কুল মেঘালয় রাজ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থা মোটেই উন্নত নয়। তাই প্রজন্ম পরম্পরা সেখানকার মানুষ সংযোগ রক্ষার কাজে স্থানীয় জীবন্ত গাছেদের কাজে
লাগিয়ে তৈরি সেতু ব্যবহার করছে আবহমানকাল ধরে। সেই আশ্চর্য সেতুদের কথা এবং তাদের দেখভালের দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিরলসভাবে পালন করে চলেছেন যে মানুষটি ,তাঁর কথা নিয়েই আজকের আলাপচারিতা।
গাছ সেতুর কথা…..
গাছ সেতুর নির্মাণ কাজ আমাদের দেশে ঠিক কবে শুরু হয়েছিল তা আজও অজানা। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসি জনজাতির মানুষদের পুরাণে কথিত আছে যে তাদের সুমহান পূর্ব পুরুষরা নাকি এক মস্ত লম্বা গাছ দড়ির মই বেয়ে এই মাটির পৃথিবীতে নেমে এসেছিলেন একেবারে আকাশ থেকে। খাসিয়া মানুষদের বিশ্বাস,ওই গাছ দড়ির মই হলো আসলে স্বর্গ ও পৃথিবীর মধ্যে যোগসূত্র– সেতুবন্ধ ।এই পথ ধরেই পরবর্তী প্রজন্মের খাসি মানুষেরা নেমে এসেছেন মাটির পৃথিবীতে। নিছকই লোকবিশ্বাস থেকে এমন কাহিনি রচিত হয়েছে। খাসি জনসমাজ আজও একেই বিশ্বাস করেন।
বৃটিশ শাসনামলে এই গাছ সেতুর কথা প্রথম নজরে আনেন হেনরি ইউল। এমন আশ্চর্য সেতু ও তার নির্মাণের কথা তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে প্রকাশ করেন ১৮৪৪ সালে। ইউল সাহেব তাঁর গভীর বিস্ময়ের কথা গোপন করেননি। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান করায় স্থানীয় লোকজন ছাড়া ওখানে পৌঁছনো বেশ কষ্টকর ছিল। তাই খুব বেশি কথা জানা যায়নি। যদিও পরবর্তীতে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই এমন বৃক্ষ সেতুর দেখা পাওয়া গেছে। তবে এই সেতু নির্মাণ প্রকৌশল মেঘালয় রাজ্য থেকে অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল না একটি বিদেশি প্রযুক্তিকে এই অঞ্চলের মানুষেরা সাদরে আত্মস্থ করেছিল তা অবশ্য আজও বলা কঠিন।
সেতু তৈরির কৃৎকৌশল
সেতু - তা সে মানুষের তৈরি হোক অথবা প্রকৃতির, তার আশ্চর্য নির্মাণের পেছনে পাকা মাথার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সব গাছেদের থেকে এমন সেতু নির্মাণ সম্ভব নয়, তাই চাই বিশেষ প্রজাতির গাছ যাদের বায়বীয় মূল থাকে। আমাদের অতি পরিচিত বট গাছ ঠিক এমনটাই। একমাথা ঝুড়ির জটিল জট নিয়ে ঠিক যেন মুণি ঋষি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেহেতু গাছের শিকড় দিয়েই তৈরি হয় খরস্রোতা নদী পারাপারের পথ , তাই গাছের ইচ্ছেতেই বেড়ে ওঠা শিকড়গুলো রূপকারের হাতের জাদুতে,মিলেমিশে সেতু নির্মাণ করে। ফলে এই এলাকার সব সেতুর কাঠামোর মধ্যে পাওয়া যায় ব্যাপক বৈচিত্র্য। নদীর দুদিকে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি তাগড়াই চেহারার গাছকে প্রধান খুঁটি হিসেবে অবলম্বন করে আস্তে আস্তে একটা ঝুলন্ত সেতুর চেহারা নেয় জট পাকানো গুঁড়িগুলো মিলেমিশে। তাই এক একটা সেতু যেন হয়ে ওঠে অসংখ্য জটার বিচিত্র আঁকিবুঁকি।
এই অঞ্চলের মানুষেরা বহুদিন ধরেই Ficus elastica বা রাবার ডুমুর গাছের বায়বীয় শিকড়গুলোকে অসীম ধৈর্য্য সহকারে জুড়ে দিয়ে তৈরি করেছে এই আশ্চর্য গাছ সেতু। খাসি এবং জয়ন্তীয়া জনজাতির মানুষজন পুরুষানুক্রমে এই স্থাপত্যশৈলী রপ্ত করেছেন পরম নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের সঙ্গে। আধুনিক সংযোগ ব্যবস্থার ওপর মুখাপেক্ষী না হয়েই নিবিড় অনুশীলনের মাধ্যমে পূর্বজদের কাছ থেকে পাওয়া এই বিদ্যাকে তাঁরা এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। যতদিন পর্যন্ত থাম হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দুই প্রান্তের গাছ দুটি সুস্থ সবল এবং বর্ধনশীল অবস্থায় থাকে ততদিন এই সেতু টেকসই থাকে, কেননা সুস্থ গাছ থেকে প্রতিবছর নতুন নতুন শিকড়, শাখা শিকড় এবং প্রশাখা শিকড় জন্ম নেয় যা মূল সেতুর আয়ুষ্কালকে লাগাতার বাড়িয়ে চলে। পরিণত অবস্থায় একটি সেতু প্রায় পঞ্চাশ জন মানুষের ভার সইতে পারে। পঁচিশ থেকে তিরিশ বছরে একবার পূর্ণতা পেলে ১০০ বছরেরও বেশি সময় টিকে থাকতে পারে এই প্রাকৃতিক সেতু। সরকারি বিনিয়োগের তোয়াক্কা না করে প্রকৃতি নিজেই বানিয়ে নিয়েছে কার্যকর,টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব এক সংযোগ সাধন। প্রকৃতির দেখভাল করার মানুষ সেবক হিসেবে পাশে থাকলে প্রকৃতি উজাড় করে মেলে ধরেন নিজেকে। মেঘালয়ের গাছ সেতু যেন তারই সাক্ষী।
এক আশ্চর্য স্থপতি
এ বছরের রাষ্ট্রীয় পদ্ম খেতাব প্রদান অনুষ্ঠানে শতাধিক গুণী মানুষের জমায়েতে যাদের কাজ সকলের নজর টেনেছে তাঁদের মধ্যে অন্যতম মানুষটি হলেন মেঘালয় রাজ্যের হ্যালি ওয়র। হ্যালি একজন Unsung Hero –যাঁর কথা এই সেদিন পর্যন্ত দুনিয়ার মানুষের কাছে অজানা ছিল। পুরষ্কার তাঁকে পরিচয়ের নতুন আলোক বৃত্তের মাঝে এনে ফেললেও তিনি আজও অচঞ্চল,অকম্পিত ,স্মিতবাক । প্রকৃতির নীরব সেবকেরা যে এমনই হন। আর তাই খেতাবপ্রাপ্তির গৌরব তাঁদের স্পর্শ করে না, বদলে দিতে পারে না তাঁদের আচরিত জীবনচর্চার পথকে।
হ্যালি ওয়র পেশাগত জীবনে একজন কৃষক। তাঁর পাহাড়তলির ক্ষেত জুড়ে থাকে ঋজু ভঙ্গিতে আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে থাকা সুপারি গাছের সারি। সেই গাছেদের দীঘল কাণ্ডকে জড়িয়ে ধরে বেড়ে ওঠে পান পাতা আর গোলমরিচ লতারা। হ্যালির বাগানে আর আছে রকমারি সব ফলের গাছ – রকমারি বেরি ফল,আনারস, বিশেষ প্রজাতির আপেল। নিজের জমিজমা আর ফসলের নিয়মিত দেখভালের সাথে সাথে গ্রামের নদীর ওপর থাকা গাছ সেতুর তদারকিতে তাঁর সময় কেটে যায় অসীম সৃষ্টির আনন্দে।
হ্যালি মনে করেন প্রজন্ম পরম্পরা যে প্রকৌশলের অধিকারী হয়েছেন তিনি ,তাকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব একান্ত ভাবেই তাঁর। খুব ছোটবেলায় ঠাকুর্দাকে এই বাঁধ তৈরি করতে দেখেছেন হ্যালী , শিখেছেন কীভাবে শিকড়ের জটের মধ্যে বাঁশ বেঁধে বেঁধে তাকে সেতুর পাটাতন বানিয়ে নিতে হয়। সেখান থেকেই শুরু করে,খাসি সংস্কৃতির গৌরবময় সেতু নির্মাণ পরম্পরার আজ তিনি হলেন সার্থক উত্তরসূরি। তাই তাঁর দায়িত্ব হলো এই দক্ষতার পরিবর্ধন পরিমার্জন ও পরবর্তীয়দের মধ্যে এই অনন্য স্থাপত্য কলার সঞ্চালন। অত্যন্ত নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে এই কাজ করে চলেছেন বলেই আজ এমন দুর্লভ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ভাগীদার হয়েছেন হ্যালি ওয়র। পদ্ম সম্মানের অভিভাষণে লেখা হয়েছে – “থ্রু হিজ লাইফ লঙ্ ডেডিকেশন টু দ্যা আর্ট অফ বায়ো - উইভিং লিভিং রুট ব্রিজেস……।” সত্যিই তো তাই। এও যে এক আশ্চর্য বুনন শিল্প। শিকড়ের সঙ্গে শিকড় জুড়ে জুড়ে এক ঠাস বুনটের জমি তৈরি করা। হ্যালি এই কাজের এক দক্ষ বুননকার যিনি এক নিবিড় নিভৃত অনুশীলনের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রেখেছেন খাসি সংস্কৃতির এক আশ্চর্য লোক পরম্পরাকে।
আজ যখন চারদিকে কেবলই বিচ্ছিন্নতার দাপাদাপি , পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতাকে দূরে সরিয়ে দিয়ে এক চরম আত্মকেন্দ্রিকতাকে অবলম্বন করে ভেসে থাকতে চাওয়ার সরব প্রচেষ্টা , ঠিক তখনই শহুরে কোলাহল থেকে দূরে, প্রকৃতির অপার সান্নিধ্যে নিবিড় সম্পর্কের বাঁধনে গাছের বায়বীয় শিকড়গুলোকে কাছে টেনে বেঁধে বেঁধে রাখছেন এক প্রত্যয়ী মানুষ - যিনি সবকিছুকে আগলে রাখছেন পরম মমতায়,পরম জীবনানন্দে। প্রচারের আলোয় এক মাদকতা
মিশে থাকে যা ভুলিয়ে দেয় মানুষের ফেলে আসা দিনের স্মৃতি। হ্যালি, তাঁর একান্ত অনুভবের জীবনের বৃত্তেই আটকে থাকুন। তাতেই যে সকলের কল্যাণ।
8 Comments
এই লেখার সূত্রেই এমন আশ্চর্য সেতুর কথা জানলাম। লেখক নতুন সেতু বাঁধলেন।
ReplyDeleteসেতু দিয়ে পাঠকদের চলাচল বাড়লে তবে না স্বস্তি!
Deleteসেতুর কথা সবাইকে জানিয়ে দিন।
মেঘালয়ের সেতুগুলোর কথা বহু আলোচিত পর্যটক মহলে।কিন্তু সেগুলো যে এভাবে তৈরি করতে হয় সেটা জানা ছিলনা। লেখককে ধন্যবাদ।
ReplyDeleteআমরা যাঁরা ট্যুর করতে যাই তাঁদের অধিকাংশই এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন বোধ করিনা। আজ জনাকয়েক পাঠক আমাকে জানিয়েছেন যে তাঁরা দেখেছেন কিন্তু এতো কথা জানা নেই। লেখকের কাজ হলো এই দুপক্ষের মধ্যে সেতু নির্মাণ করা -- যাঁরা দেখেছেন কিন্তু জানেন না, আর যাঁরা সব কিছু জেনে দেখতে যাবেন। সেতুকথা ছড়িয়ে পড়ুক
ReplyDeleteপৃথিবী হল মানুষের চিড়িয়াখানা... যথার্থ
ReplyDeleteবিচিত্র কাজে ব্যস্ত মানুষদের কথা মাথায় রাখলে তেমনটা মনে হওয়া স্বাভাবিক ।
ReplyDeleteএকটা অজানা বিষয় জানলাম।
ReplyDeleteজানার মাঝে অজানারে করেছি সন্ধান - বিস্ময়ে!
ReplyDelete