দূর দেশের লোকগল্প-- ২৯৬
সাপের সর্বনাশ
আরব (এশিয়া)
চিন্ময় দাশ
আরব দেশের একজন বণিক উটের পিঠে চড়ে ভ্রমণে বেরিয়েছেন। দিন দুই বাদে, এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছালেন, যেখানে একই কাফেলা (দল)-এর অন্যান্যেরা যাত্রা শুরুর আগে, আগুন জ্বালিয়েছিল। বেশ জোরে বাতাস বইছিল। সেই বাতাস জ্বলন্ত কয়লার ওপর ফুঁ দিয়ে শিখা তৈরি করেছিল। আগুনের ফুলকিগুলো জঙ্গলের ওপর দিয়ে উড়ে উড়ে গিয়ে, আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল শুকনো কাঠে। যার ফলে, পুরো প্রান্তরটি দাউদাউ করে জ্বলছিল। একেবারে টিউলিপ ফুলের বিছানার মতো লাগছে বিছানো প্রান্তরটিকে।
সেই আগুনের মাঝখানে আটকে পড়েছিল এক বিশাল সাপ। আগুনের লেলিহান শিখা ঘিরে ফেলেছে বেচারাকে। পালানোর কোনও পথ নাই। এবার সে মাছের মতো পুড়তে থাকবে। বা, খাওয়ার টেবিলের তিতির পাখির মতো কাবাব হতে চলেছে। সাপটার বিষাক্ত চোখ দুটো থেকে রক্ত ঝরছিল। হঠাৎ একজন মানুষ আর উটটিকে দেখে, সে সাহায্যের আশায় মিনতি করল—
"দয়া করে একটু করুণা করো আমাকে। এই বিপদ থেকে উদ্ধার করে দাও আমায়। আল্লাহর দোহাই তোমাকে।“
বণিকটি ছিল একজন ভালো এবং ঈশ্বরভীরু মানুষ। নিজের চোখে সাপের সেই আর্তনাদ আর করুণ দশা দেখলেন। মনে মনে ভাবলেন: এই সাপটি অবশ্যই মানুষের শত্রু। কিন্তু খোদাতালারই তো সৃষ্ট জীব। আজ এই বিপদে দয়া না করাটা সঠিক হবে না। সঙ্কটাপন্নকে করুণা করলেই কর্তব্য পালন করা হবে। পরকালে আমিও ঈশ্বরের করুণা পেতে পারব।
বর্শা ছিল বণিকের সাথে। বর্শার মাথায় চটপট একটি জিন-ব্যাগ (saddle-bag) বেঁধে, সেটা সাপের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। সাপটি বিপদ থেকে রেহাই পাওয়ার আনন্দে ব্যাগের ভেতরে ঢুকে পড়ল এবং আগুন থেকে রক্ষা পেল।
বণিকটি সাপকে ব্যাগ থেকে বের করে দিয়ে বললেন—“তোমার যেখানে ইচ্ছা চলে যাও। তবে তোমার এই জীবন রক্ষার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভুলো না। এখন থেকে লোকচক্ষুর অন্তরালে নির্জন কোণ বেছে নাও। এবং মানুষজনকে কষ্ট দেওয়া বন্ধ করো। কারণ, যারা এমনটা করে, তারা ইহকাল এবং পরকালেও খোদার দরবারে অসৎ হিসেবেই গণ্য হয়।“
বণিক আবার বলল—"ঈশ্বরকে ভয় করো। কাউকে কষ্ট দিও না। এটাই প্রকৃত মুক্তি।“
সাপটি চুপ করে শুনছিল। তার মুখে হাসি। উত্তর দিল—“ওহে যুবক, শান্ত হও। সত্যি বলতে কী, আমি তোমাকে আর তোমার এই উটটিকে দংশন না করে, এখান থেকে যাব না। কারণ সুযোগ পেয়েও কাউকে ছেড়ে যাওয়া আমার স্বভাব নয়।“
বণিকটি ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন— “সে কী? তা কী করে হয়? আমি কি তোমার উপকার করিনি? মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনিনি তোমাকে? তার এই প্রতিদান? আমার পক্ষ থেকে ছিল করুণা। তাহলে, তোমার পক্ষ থেকে কেন এই অন্যায়?”
সাপটি বলল—“তুমি দয়া দেখিয়েছ, একথা সত্যি। কিন্তু ভেবে দ্যাখো, তা একটি অযোগ্য পাত্রে দেখিয়েছ। তুমি ভালোই জানো যে আমি মানবজাতির জন্য ক্ষতিকারক এক প্রাণী। ফলে, যখন তুমি আমাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচালে, তখন তুমি নিজেকে সেই একই নিয়মের অধীন করলে, যা কোনও যোগ্য পাত্রের বিরুদ্ধে করা মন্দ কাজের শাস্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়।“
বণিকের মুখে কথা জোগাচ্ছে না। সাপ বলে চলেছে—"তাছাড়া, তুমি জানো না,সাপ এবং মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের শত্রুতা রয়েছে। যারা দূরদর্শী, তারা শত্রুর মাথা গুঁড়িয়ে দেওয়াকেই বিবেচনার কাজ বলে মনে করে। তোমার সুরক্ষার জন্য আমার ধ্বংস অনিবার্য ছিল। কিন্তু দয়া দেখাতে গিয়ে, তুমি তোমার সতর্কতা হারিয়েছ। এখন তোমাকে দংশন করা আমার জন্য আবশ্যক, যাতে অন্যরা তোমার এই দৃষ্টান্ত থেকে শিক্ষা নিতে পারে।“
বণিক মৃত্যুভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। চিৎকার করে বললেন—“ওহে সাপ, ন্যায়ের বিচারকে আহ্বান করো। কোন ধর্মে এটি লেখা আছে বা কোন আচরণে বলা হয়েছে যে, ভালোর প্রতিদান মন্দ দিয়ে দেওয়া উচিত। কিংবা, দুনিয়ায় কেউ কোনও দিন একথা বলেছে যে, উপকার করার আনন্দকে আঘাত ও কষ্ট দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত?”
সাপ জবাবে বলল—“মানুষের মধ্যে তো এমনই নিয়ম। কোনও দিন উপকারীর যোগ্য মর্যাদা দাও না তোমরা। আমি কিন্তু তোমাদের নীতি অনুযায়ীই কাজ করছি। তোমরা নিজেরা যা বছরের পর বছর ধরে দেখিয়ে এসেছ, আজ সেটারই একবারের জন্য প্রতিদান নাও।“
বণিক বৃথাই মিনতি করতে লাগলেন। সাপটি বারবার একই উত্তর দিচ্ছিল—“আমি তো তোমার সাথে মানুষের মতোই আচরণ করছি। ভুল কোথায় আমার?”
নাজেহাল হয়ে বণিক বললেন— “ঠিক আছে। চলো, আমরা সাক্ষী ডাকি। যদি তুমি তোমার দাবি প্রমাণ করতে পারো, আমি তোমার ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করব।“
সাপটি চারদিকে তাকিয়ে, দূরে একটি গরুকে ঘাস খেতে দেখে বলল—“চলো, আমরা ঐ গরুটার কাছে যাই। তাকে এই বিষয়ে সঠিক বিচার জিজ্ঞেস করি।“
যখন তারা গরুর কাছে পৌঁছাল, সাপ বলল, "ওহে গরু, বলতে পারে, উপকারের প্রতিদান কী?"
গরুটি বলল—“যদি তুমি আমাকে মানুষের আচরণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো, তাহলে বলবো, ভালোর প্রতিদান সবসময় মন্দই হয়।“
বণিক অবাক হয়ে বলল—"বলছোটা কী, তুমি?”
গরু জবাব দিল—"উদাহরণ হিসাবে, আমার নিজের কথাই বলি তাহলে। আমি দীর্ঘকাল ধরে একজন কৃষকের বাড়িতে ছিলাম। নিয়মিত বাছুর জন্ম দিতাম। তার ঘর দুধ ও ঘি দিয়ে ভরিয়ে দিতাম। তার পুরো পরিবারের জীবিকা এবং তার সন্তানদের জীবন আমার ওপরই নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু একদিন আমি বুড়ো হয়ে গেলাম। বাচ্চা জন্ম দেওয়া বন্ধ হয়ে গেল। দুধ এলো না আমার বাঁটে। তখন কী করেছে দেখতে পাচ্ছো না? দূর-দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে গোয়াল থেকে। এখন হয় চরে খাও। নয় বাঘ-ভালুকের পেটে যাও।“
বণিকের মুখে কথা নাই। গরু বলল—"আমার কথা শেষ হয়নি। বনে চরে চরে একটু মাংস হয়েছে আমার শরীরে। পুরণো মালিকের ঠিক চোখে পড়ে গিয়েছে। গতকাল একজন কসাই নিয়ে এল। তার কাছে বিক্রি করে দিয়েছে আমাকে। এবং শুনে রাখো, আমার জবাইয়ের দিনও ঠিক হয়ে গিয়েছে।“
সাপটি বলল—“তুমি গরুর কথা শুনলে। এবার দ্রুত মরার জন্য প্রস্তুত হও।“
বণিক চিৎকার করে উঠলেন—“একমাত্র সাক্ষীর ভিত্তিতে মামলার রায় দেওয়া আইনসঙ্গত নয়। সেজন্য চল, আমরা অন্য একজন সাক্ষী ডাকি।"
সাপটি চারদিকে তাকিয়ে, একটা পাতাশূন্য, ন্যাড়া গাছ দেখতে পেল। সাপটি বলল—“চল, আমরা ওই গাছের কাছে আবেদন করি।“
দুজনে একসাথে গাছের কাছে গেল। সাপটি তাকে বলল—“ওহে গাছ, ভালো কাজের প্রতিদান কী বলতে পারো?”
গাছটি বলল—"কেন পারবো না। আলবৎ পারি। এই তোমার সাথেই তো একজন মানুষ আছে। এদের কথাই ধরো। উপকারের প্রতিদান মন্দ ও আঘাত দিয়েই ফেরত দেয় এরা।“
বণিক বলল—"সে আবার কী কথা?”
--"ঠিক কথাই বলছি আমি।“ গাছ বলল—”যা বলছি, তার প্রমাণ আমি নিজেই দিচ্ছি। আমি এমন এক গাছ, যে এই শূণ্য প্রান্তরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও, একসময় বেশ সতেজ ও সবুজ ছিলাম। এবং সবার সেবা করতাম। যখনই মানুষজন কেউ রোদের তাপ ও ক্লান্তিতে অতিষ্ঠ হয়ে এই পথে আসত, তারা আমার ছায়ায় বিশ্রাম নিত। কেউ কেউ তো ঘুমিয়েও পড়তো। আর যাবার বেলায় কী করতো? তখন বিচার করতে বসতো—কোন সরু ডালটি তীরের জন্য ভালো হবে। কোন মোটা আর বাঁকা ডালটি লাঙল তৈরির কাজে লাগবে। কিংবা গুঁড়ি থেকে কত সুন্দর তক্তা তৈরি করা যেতে পারে! এইসব।“
বণিক এবারও চুপ। কী জবাব দেবে এসব কথার? গাছ বললো—“যাদের কাছে কোনও কুড়ুল বা করাত থাকে, যাবার সময় তারা দরকার মতো আমার ডালপালা কেটে নিয়ে চলে যায়। এভাবেই, যাদের আমি আরাম ও শান্তি দিয়েছিলাম, তারা আমাকে কেবল বেদনা ও আঘাত দিয়েই পুরস্কৃত করেছে।“
সাপটি বলল—"তোমার চাহিদা মতো, এখানে দু-দুজন সাক্ষী হয়ে গিয়েছে। সুতরাং, তোমার মনস্থির করো। এবার আমি আমার কর্তব্য করি।“
বণিক বললেন—"সত্যিই, বুঝতে পারছি, উপকারীর প্রতিদান সবসময় আমরা দিই না। তবে, কথায় বলে না—বার বার তিন বার। দু’বার হয়েছে আমাদের । শেষবারের মতো, আর একজন সাক্ষী নেওয়া হোক। তার রায়ের পর, একটি কথাও বলব না আমি।“
তখনই একেবারে অলৌকিকভাবে এক শিয়াল সেখানে দাঁড়িয়ে সব তর্ক শুনছিল। সে সামনে এগিয়ে এল। সাপটি তাকে দেখে চিৎকার করে উঠল—"ভালোই হয়েছে। স্বয়ং পণ্ডিত এসে গিয়েছে। এই শিয়ালকেই বিচার করতে বলা যাক।“
কিন্তু বণিক কিছু বলার আগেই, শিয়াল চেঁচিয়ে বলল—"ওহে বণিক, তোমরা কি জানো না যে ভালোর প্রতিদান সবসময় মন্দই হয়? কিন্তু তুমি এই সাপের জন্য এমন কী ভালো কাজ করেছ, যার জন্য তুমি শাস্তির যোগ্য হলে?”
বণিক তখন সেদিনের পুরো ঘটনাটা বলে গেলেন।
শিয়াল উত্তর দিল—“তোমাকে দেখে তো একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি বলেই মনে হচ্ছে। তাহলে, তুমি আমাকে একটি মিথ্যা কথা বলছ কেন? একজন সৎ মানুষের পক্ষে মিথ্যা বলা কীভাবে সমীচীন হতে পারে?”
সাপ বলে উঠল—"না, না। মিথ্যে নয়। মানুষটি সত্যি কথাই বলছে। কারণ, এই দেখো সেই ব্যাগটি। এটার মধ্যে ভরেই তো এ আমাকে উদ্ধার করেছিল। এর মধ্যে মিথ্যা বা ভুল তো কিছু নাই।“
শিয়াল অবাক হওয়ার ভান করে, সাপকে বলল—"আচ্ছা উজবুক তো। তুমি জানো না, আমি হলাম শিয়াল পণ্ডিত! দুনিয়াশুদ্ধ লোক জানে এ কথা। আমি কীভাবে বিশ্বাস করব, তোমার মতো এত বড় একটা সাপ, এই ছোট্ট একটা থলের ভিতর ধরে যেতে পারে?”
সাপের আর ধৈর্য ধরছে না। সে বলল—“আমাকে সন্দেহ করো যদি, আমি আবার ব্যাগের ভেতর ঢুকছি। নিজের চোখে দেখে নাও। সব সন্দেহ মিটে যাবে।“
শিয়াল বলল—হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। এটাই কাজের কথা। সত্যিই যদি আমি তোমাকে থলেটার ভিতরে দেখি, তবেই আমি বিশ্বাস করতে পারি, এই বণিক সত্যি তোমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিল। তবেই তো বিবাদের মীমাংসাও করে দিতে পারব।“
এই শুনে বণিক তাঁর থলের মুখটি খুলে দিলেন। এদিকে সাপও শিয়ালের অবিশ্বাস দেখে, মনে মনে বিরক্ত। কথার কচকচিতে সময়ও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সে সুড়সুড় করে থলেটার ভেতরে ঢুকে পড়ল। সেটা দেখামাত্রই শিয়াল চিৎকার করে উঠল—"শয়তানটা ফাঁদে পড়ে গিয়েছে। এক মূহুর্তও দেরি নয় আর। মুখ আটকে দাও থলের।“
শিয়ালের এই ইঙ্গিতটি লুফে নিলেন বণিক। থলের মুখটি শক্ত করে বেঁধে দিলেন। শিয়াল বলল—"একটা কথা মনে রেখো, যখন তুমি তোমার শত্রুকে ধরে ফেলেছ, তখন তাকে আর কোনো সুযোগ দিও না। শত্রু যখন পরাজিত হয় এবং তোমার নিয়ন্ত্রণে থাকে, তখন তাকে কোনও দয়া না দেখানোই জ্ঞানীদের নীতি। আর, এই কথাটাও মনে রেখো—শত্রুর শেষ রাখতে নাই।“
পণ্ডিতের এই ইঙ্গিতটা বুঝতেও কোন অসুবিধা হোল না বণিকের। হাতে ধরা থলেটা তুলে একটা পাথরে উপর সজোরে এক আছাড়।
ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে গেল সাপের।
0 Comments