জ্বলদর্চি

অণুগল্প : হারাধন ময়রা /সৌম্য পাল


চিত্র  : মহুয়া ব্যানার্জী 

হারাধন ময়রা 

সৌম্য পাল

হারাধন ময়রার দোকানটা গ্রামের মোড়ে, টিনের চাল, কাঠের তাক, আর সারাদিন লেগে থাকা মিষ্টির গন্ধ। ভোর হতে না হতেই তিনি চুল্লিতে আগুন জ্বালান। দুধ ফুটতে ফুটতে ঘন হয়, ঘিয়ে ভাসে সন্দেশ, রসে ডোবে ল্যাংচা। গ্রামের লোক বলে, হারাধনের হাতে নাকি আলাদা আশীর্বাদ আছে, এক কামড়েই মন ভালো হয়ে যায়।
এই কাজটা তিনি পেয়েছিলেন বাবার কাছ থেকে। ছোটবেলায় বাবার পাশে দাঁড়িয়ে হাঁড়ি নাড়তেন, চিনি মাপতেন, ভুল হলে বকুনি খেতেন। বাবার মৃত্যুর পর দোকানটাই তাঁর সংসার, তাঁর ভরসা। বিয়ে করেননি; দোকান আর গ্রামের মানুষই তাঁর পরিবার।
প্রতিদিন বিকেলে স্কুল ছুটির সময় দোকানের সামনে ভিড় জমে। কারও হাতে দু’টাকা, কারও কিছুই নেই। তবু হারাধন কাউকে খালি হাতে ফেরান না। “আজ থাক, কাল দিয়ে দিস” এই কথাটাই যেন দোকানের নিয়ম। অনেকেই শহরে গিয়ে বড় হয়েছে, কিন্তু পুজোয় ফিরলে প্রথমে আসে হারাধনের দোকানে।
একদিন শহর থেকে বড় ব্যবসায়ী এসে দোকান কিনতে চাইল। মোটা অঙ্কের টাকা শুনে সবাই অবাক। হারাধন চুপ করে তাকিয়ে ছিলেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন, “এই দোকানটা শুধু মিষ্টির নয়, মানুষের। এটা বিক্রি করলে আমি নিজেকেই হারাব।”
ব্যবসায়ী ফিরে গেল। হারাধন আবার হাঁড়ি নাড়লেন, মিষ্টির মতোই সহজ, কিন্তু গভীর এক জীবন নিয়ে।
🍂

Post a Comment

0 Comments