জ্বলদর্চি

দূর দেশের লোকগল্প— ৩০২/হাতিরা ভোজের নেমন্তন্ন খায় না /কেনিয়া (আফ্রিকা)/চিময় দাশ

দূর দেশের লোকগল্প— ৩০২

হাতিরা ভোজের নেমন্তন্ন খায় না 

কেনিয়া (আফ্রিকা)

চিময় দাশ

[অনেক রকম জাতির মানুষের বাস কেনিয়ায়। তাদের মধ্যেই আছে কাম্বা জাতি। কাম্বা মানুষরা মনে করে হাতি হলো শক্তি আর বুদ্ধির প্রতীক। হাতি কীভাবে পৃথিবীতে এসেছে, তাই নিয়েও গল্প আছে তাদের।] 

এক গ্রামের মোড়ল খুব বুড়ো। তবে, ভারি জ্ঞাণী মানুষ সে। যেকোনও সমস্যায় পড়লে, গাঁয়ের লোকেরা তার কাছে গিয়ে হাজির হোত। মোড়লও উপযুক্ত পরামর্শই দিত সবাইকে। 

একদিন এক গরীব লোক বুড়োর কাছে গিয়ে হাজির। গাঁয়ের ভিতর সবার চেয়ে গরীব সে। সে গিয়ে মোড়লকে বলল, "তুমি তো জানো, আমি কত গরীব। আর যে পেরে উঠছি না।‘’ 

--"সে তো জানি। এ আর নতুন কথা কী?” মোড়ল জবাব দিল। লোকটা বলল—"তুমি বলে দাও, কী ভাবে বড়লোক হবো আমি?"

মোড়ল একটু হাসল। বলল— “একেবারে বড়লোক হতে চাও? অন্য কিছু না?” 

লোকটা বলল—"এতদিন গরীব ছিলাম। এবার আমি বড়লোকই হতে চাই। তুমি শুধু একটা উপায় বলে দাও।“

মোড়ল বলল, " তাহলে এক কাজ করো। তুমি ভেড়া পালন করো গিয়ে।"

গরিব লোক বলল, "ভেড়া পালন? সে অনেক কষ্টের কাজ। ওটা আমি করব না। অন্য কোনও উপায় বলো তুমি।"

মোড়ল বলল, "তাহলে গরু পোষ।"

গরিব লোক বলল, "ওটাও অনেক ঝামেলার। অন্য কিছু বলো।"

শেষে মোড়ল তাকে একটা মলম দিয়ে, বলল, "এটা নিয়ে যাও। বাড়ি গিয়ে তোমার বউয়ের ওপরের দুটো দাঁতে লাগিয়ে দিও। তার পর দ্যাখো, তোমার অবস্থা ফেরে, কি না।"

লোকটা এটা মেনে নিল। ঘরে ফিরে এসে, বউয়ের সামনের দুটো দাঁতে মলম লাগিয়ে দিল। ক’দিন গেল না। তার বউয়ের দাঁত দুটো বড় হতে হতে, একদিন একেবারে হাতির দাঁত হয়ে গেল। লোকটাকে তখন পায় কে? 

সে করল কী, বউয়ের সেই দাঁত দুটো কেটে বাজারে বিক্রি করে দিল। হাতির দঁত বলে কথা। অনেক টাকা পাওয়া গেল বিক্রি করে। এই ভাবে বার দুই-তিন হোল। দাঁত বাড়ে। বাজারে বিক্রি করে অনেক টাকাও পাওয়া যায়।

কিন্তু সমস্যা হোল অন্য জায়গায়। যত দিন যায়, তার বউয়ের শরীরটা আস্তে আস্তে বড় হতে লাগল। গায়ের চামড়া মোটা, কুঁচকানো আর ধূসর হয়ে গেল। তার পর একদিন আরও মারাত্মক কাণ্ড। হাতি হয়ে, ঘরের বউ বনে চলে গেল। বনে গিয়ে, সেখানে অনেকগুলো বাচ্চারও জন্ম হোল হাতির।

হাতিটা তো আসলে ছিল গরীব চাষির বউ। ভালো করে খাওয়াই জুটত না তার। এখানে বনে এসে অঢেল খাবার-দবার। সারা দিনে কাজও নাই কোনও। খায়-দায় আর ঘুরে বেড়ায়। ভারি আনন্দে দিন কাটে। 

আনন্দে থাকতে থাকতে, এক অবাক কাণ্ড। বড় বড় চার-চারটে ডানা গজিয়ে উঠল হাতির পিঠে। প্রথমে একটু অবাক হয়ে গেল হাতি। তার পর ভারি আনন্দ হোল মনে। এত বড় চেহারা নিয়ে আকাশে উড়তে পেরে, ভারি গর্বও হোল তার। 

এদিকে একদিন মনে একটা ভাবনা এলো বিধাতা পুরুষের। সারা দুনিয়ে তাঁর নিজের হাতে গড়া। সেকারণে, সারা দুনিয়ায় ঘুরেও বেড়াতে হয় তাঁকে। বেশ হয়রানির কাজ সেটা। তিনি হাতিকে বাহন করে নিলেন। হাতির পিঠে চেপে, ঘুর বেড়াতে লাগলেন।

এতে হাতিও খুশি খুব। এত জীব থাকতে, তাঁকেই বিধাতা বেছে নিয়েছেন, এই নিয়ে হাতির খুব গুমোর। দেমাকে মাটিতে পা-ই পড়ে না তার। এতো বড় দুনিয়া। বিধাতা যখন যেখানে যাবেন, হাতির ডাক পড়ে। হাতির পিঠে চেপেই যাওয়া-আসা করেন তিনি।

এইভাবে চলতে লাগল। কেটে যেতে লাগ্ল যগের পর যুগ। তারপর একদিন মানুষ গড়লেন বিধাতা। দুনিয়া জোড়া এত কাজ। একা আর পেরে উঠছিলেন না তিনি। তাই অনেক ভেবেচিন্তে মানুষদের এনেছেন পৃথিবীতে। অনেক উপকার হয়েছে। অনেক কাজের ভার নেমে গেছে ঘাড় থেকে। সবই মানুষরা নিজেরা করে নেয়। বিধাতাকে আর ছোটাছুটি করে বেড়াতে হয় না। 

🍂

কিন্তু তাতে ঝামেলা হয়ে গেল হাতিদের। কোথাও যেতে হচ্ছে না এখন। ওড়াউড়ি নাই। ঘরে বসে বসে ডানাগুলোতে বাত ধরে যাওয়ার জোগাড়। তারা করল কী, নিজেরাই মাঝে মাঝে বেরিয়ে পড়তে লাগল। চার-চারটে ডানা মেলে, এদিক ওদিক উড়ে বেড়াতে লাগল। 

তাতেই যত বিপত্তি। উড়তে উড়তে কখনো কারো মাটির বাড়ির উপর গিয়ে নেমে পড়ল ধপাস করে। তাতে বাড়িটাই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল। মাঝে মাঝেই গিয়ে নেমে পড়তে লাগল লোকের ভরা ফসলের খেতে। খেয়ে-দেয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে একেবারে লণ্ডভন্ড করে দেয়।

চারদিক থেকে অভিযোগ আসতে লাগল। শুনত শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেল বিধাতার। শেষমেশ একটা উপায় এলো তাঁর মাথায়। একটা গোপন ফন্দি আঁটলেন বিধাতা। হাতিদের একটা বিরাট ভোজের আয়োজন করলেন। অনেক দিন অনেক সেবা করেছে তাঁর। একটা দিন অন্তত পেট ভরে খাওয়াবেন তাদের। 

নেমন্তন্ন পেয়ে হাতিরা তো আনন্দে একেবারে আটখানা। যেখানে যত হাতি ছিল, সবাই এসে হাজির হয়েছে। সব্বাই। বিধাতা পুরুষের মনে কী আছে, তা তিনিই জানেন। এলাহি আয়োজন করেছেন খাবারের। খেয়ে শেষই করতে পারছে না হাতিরা। 

ভোজপর্ব যখন শেষ হোল হাতিদের, তখন একেবারে মাঝরাত। নড়বার ক্ষমতা নাই কারোরই। সেই ভোজের সভাতেই ঘুমে ঢলে পড়ল হাতিরা। এই সুযোগটাই  খুঁজছিলেন বিধাতা।। তিনি চুপিচুপি হাতিদের ডানাগুলো কেটে দিলেন।

একটা ডানা নিয়ে অনেক নকশা আঁকলেন। সেগুলো তিনি ময়ুরদের দিয়ে দিলেন। সেই থেকেই ময়ূরদের এতো গুমোর। এমন সুন্দর নকশাকাটা পেখম এই দুনিয়ায় আর কারও নাই। 

বাকি  ডানাগুলো নিয়ে কী করা যায়—ভাবতে ভাবতে কলাগাছের কথা মনে পড়ল বিধাতার। ঐটুকুন একটা গাছ। একসাথে এতগুলো ফল দেয় গাছটা। ডানাগুলো তিনি কলা গাছে লাগিয়ে দিলেন। সেই থেকেই কলা গাছের এত বড় বড় পাতা। দুনিয়ার আর কোনও গাছ নাই, যাদের পাতা এতো বড়। 

সকাল হোল। হাতিরা ঘুম থেকে উঠল। ছোটছোট কুতকুতে চোখ হাতিদের। তারা দেখল, তাদের কারও পিঠেই আর সাধের ডানাগুলো নাই! সব যেন উধাও হয়ে গিয়েছে। খুব মন খারাপ হয়ে গেল হাতিদের। রেগেও গেল খুব। সেই সাথে লজ্জা হল তাদের। রইল পড়ে বিধাতার ভোজসভা। সেখান থেকে পালিয়ে গেল হাতির দল। সেদিন থেকে আর কারও ভোজের নেমন্তন্ন খেতে যায় না হাতিরা।

Post a Comment

0 Comments