জ্বলদর্চি

বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস

দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ২৫ শে সেপ্টেম্বর, বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস। এই দিবসটি কেন পালন করি এবং এর গুরুত্ব কি, আসুন সবকিছুই বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
ফার্মাসিস্ট মানেই ওষুধের আড়ালে যাঁদের নীরব দায়িত্ব। স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ফার্মাসিস্টদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন এটি। রোগীর হাতে পৌঁছনো একটি ওষুধের পেছনে থাকে বিজ্ঞান, গবেষণা, মাননিয়ন্ত্রণ, সঠিক সংরক্ষণ এবং নিরাপদ ব্যবহারের দীর্ঘ প্রক্রিয়া। সেই পুরো ব্যবস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকেন ফার্মাসিস্টরা, অথচ সাধারণ মানুষের চোখে তাঁদের ভূমিকা অনেক সময় শুধু ওষুধ সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। বাস্তবে তাঁদের দায়িত্ব ও অবদান তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত।
একজন রোগী যখন চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন নিয়ে ফার্মেসিতে যান, তখন তাঁর হাতে ওষুধ তুলে দেওয়াই ফার্মাসিস্টের একমাত্র কাজ নয়। ওষুধের নাম, মাত্রা, ব্যবহারের সময়, সংরক্ষণের নিয়ম, সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং অন্যান্য ওষুধের সঙ্গে তার পারস্পরিক প্রভাব, এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে ওষুধ সঠিকভাবে ব্যবহার করা চিকিৎসার সাফল্যের অন্যতম শর্ত। আজকের দিনে এই দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগসহ বহু দীর্ঘস্থায়ী রোগে রোগীকে দীর্ঘ সময় ধরে একাধিক ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। একাধিক ওষুধের ক্ষেত্রে ভুল সময়ে বা ভুল মাত্রায় ওষুধ গ্রহণের ঝুঁকি বাড়ে, সেখানে ফার্মাসিস্ট রোগীকে ওষুধ সম্পর্কে সচেতন করে চিকিৎসাকে নিরাপদ ও কার্যকর করতে সহায়তা করতে পারেন।
অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সচেতনতা জরুরি
বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স। 
🍂

প্রয়োজন ছাড়া বা ভুলভাবে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে জীবাণু ধীরে, ধীরে ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে উঠতে পারে, এর ফলে, ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসাও কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। এই পরিস্থিতিতে ফার্মাসিস্টদের সচেতনতা তৈরির ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। রোগীকে বোঝানো যে প্রতিটি জ্বর বা সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করা উচিত নয়, এই বার্তাটি সমাজে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে ফার্মাসিস্টরা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
ওষুধের গুণমান থেকে সংরক্ষণ, দায়িত্ব বহুমুখী
একটি ওষুধ বাজারে আসার পরও তার কার্যকারিতা বজায় রাখার জন্য সঠিক সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, আলো এবং মেয়াদ বিভিন্ন বিষয় ওষুধের গুণমানের সঙ্গে সম্পর্কিত। হাসপাতাল ও ফার্মেসিতে ওষুধের সঠিক সংরক্ষণ, মেয়াদ পরীক্ষা এবং যথাযথ সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে ফার্মাসিস্টদের দায়িত্ব জড়িত। ওষুধের গুণমান নিয়ে সামান্য অবহেলাও রোগীর জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে, তাই ফার্মাসিস্টের পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি সতর্কতা, নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধ অত্যন্ত জরুরি। গবেষণাগার থেকে রোগীর শয্যা পর্যন্ত
ফার্মাসিস্টদের কাজ শুধু কমিউনিটি ফার্মেসি বা হাসপাতালের ওষুধ বিভাগে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন ওষুধের আবিষ্কার, ওষুধের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিয়ে গবেষণা, ওষুধ তৈরির প্রযুক্তির উন্নতি এবং বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যাল ফর্মুলেশন তৈরিতেও তাঁদের ভূমিকা রয়েছে।
একটি নতুন ওষুধ মানুষের ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আগে দীর্ঘ গবেষণা, পরীক্ষা ও মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যায়। এই বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় ফার্মাসিউটিক্যাল বিজ্ঞানীদের অবদান অনস্বীকার্য, ফলে একজন ফার্মাসিস্টকে কেবল ‘ওষুধ বিক্রেতা’ হিসেবে দেখার ধারণা বদলানো সময়ের দাবি। বদলে যাচ্ছে পেশার পরিধি
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার ধরনও বদলাচ্ছে। ইলেকট্রনিক প্রেসক্রিপশন, ডিজিটাল স্বাস্থ্যতথ্য, টেলিমেডিসিন এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ওষুধ ব্যবস্থাপনা ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যসেবাকে আরও পরিবর্তিত করবে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফার্মাসিস্টদেরও নিজেদের জ্ঞান ও দক্ষতা ক্রমাগত বাড়াতে হবে।
তবে, প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, রোগীর সঙ্গে মানবিক যোগাযোগের গুরুত্ব কমবে না। একজন রোগী তাঁর ওষুধ নিয়ে যে প্রশ্ন করেন, উদ্বেগ প্রকাশ করেন বা সমস্যার কথা জানান, তা মন দিয়ে শোনা এবং সহজ ভাষায় নির্ভরযোগ্য তথ্য দেওয়া স্বাস্থ্যসেবারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রয়োজন মর্যাদা ও দায়িত্বের সমন্বয়
বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস তাই শুধুমাত্র একটি পেশাজীবী গোষ্ঠীকে শুভেচ্ছা জানানোর উপলক্ষ নয়। এটি সমাজকে মনে করিয়ে দেয়, নিরাপদ ওষুধ ব্যবহার একটি সম্মিলিত দায়িত্ব। চিকিৎসকের পরামর্শ, ফার্মাসিস্টের নির্দেশনা এবং রোগীর সচেতনতা এই তিনের সমন্বয় চিকিৎসাকে আরও নিরাপদ করে তুলতে পারে। একজন ভালো ফার্মাসিস্টের কাছে পেশাগত জ্ঞান যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি রোগীর প্রতি দায়বদ্ধতা। অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা, ওষুধের সঠিক ব্যবহার বোঝানো, সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা এবং রোগীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া, এসবই স্বাস্থ্যসেবার বৃহত্তর উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত।
বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসে তাই ফার্মাসিস্টদের অবদানকে নতুন চোখে দেখার প্রয়োজন। ওষুধ শুধু একটি পণ্য নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন ও সুস্থতার প্রশ্ন। সেই ওষুধ যেন সঠিক মানুষের কাছে, সঠিকভাবে, সঠিক মাত্রায় এবং নিরাপদ উপায়ে পৌঁছয়, এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের নেপথ্যে থাকা ফার্মাসিস্টদের ভূমিকা তাই নিঃসন্দেহে স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি অপরিহার্য স্তম্ভ।
বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসের বার্তা হোক, নিরাপদ ওষুধ, সচেতন ব্যবহার এবং সুস্থ সমাজ গঠনে ফার্মাসিস্ট ও সাধারণ মানুষের আরও ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্ব।

Post a Comment

0 Comments