জ্বলদর্চি

খামালু/ভাস্করব্রত পতি

বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১৪৩
খামালু

ভাস্করব্রত পতি

কোনও ব্যক্তির গুণ বা কার্যকারিতাহীন পরিচয় বোঝাতে তাঁকে 'খামালু' বলে ডাকা হয়। অর্থাৎ কোনও কর্মের নয়। যদিও এটি অত্যন্ত উপকারী এবং এর গুণগত মান যথেষ্ট। বাজারে চাহিদাও ভালোই। এটি আফ্রিকা, উত্তর অষ্ট্রেলিয়া এবং এশিয়ায় প্রচুর পরিমাণে জন্মায়। আমাদের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে এর দেখা মেলে। 

খামালুকে বিভিন্ন নামে চেনা যায়। এই ঘন বর্ষায় তরতরিয়ে বেড়ে ওঠে জঙ্গলে বা বাড়ির পোড়ো জায়গায়। বেশ লম্বা লতানো গাছ। পানপাতার মতো পাতা। সংস্কৃতে দণ্ডালু এবং ওড়িয়াতে অম্বআলু (স্তম্ভাকার) বলে।  এছাড়াও একে গাছ আলু, মাচা আলু, পোস্তা আলু, ব্যাঙ্গালু, মেটেআলু, গইচ্চা আলু, ঝোড়া আলু, চুপড়ি আলু, গেছো আলুও বলে। ফরিদপুরের ভাষায় বলে গৈরা আলু। রাজশাহীর ভাষায় এগুলোকে গড় আলু বলে। একে ঝোড়াআলু্ বলে, কেননা এই গাছের নিচে অর্থাৎ মাটির গভীরে বড়সড় ঝোড়ার মতো কন্দ বা আলু জন্মায়। 

এই কন্দ জাতীয় সব্জিটি পরিচিত Aerial Potato, Cheeky Yam, Purple Yam, Parsnip Yam, Potato Yam, Bitter Yam, Aerial Yam নামেও। খামালুর বিজ্ঞানসম্মত নাম Dioscorea bulbifera। যা Dioscoreaceae পরিবারের অন্তর্গত। অতি অযত্নেই এই আলু বনে জঙ্গলে জন্মায়। এখন অবশ্য বাড়ির পাশে বা পতিত জমিতে জৈব সার দিয়ে এই খামালুর চাষ করা হচ্ছে। 
খামালুর বুলবিল বা কক্ষমুকুল

এটি মাটির তলায় বা গাছের গোড়াতে জন্মায়। অন্য গাছকে বা কোনও মাচাকে  জড়িয়ে বেয়ে বেয়ে বাড়তে থাকে। খামালু গাছের মুল মাটি থেকে খাদ্য সঞ্চয় করে মোটা থামের আকার ধারণ করে মাটির নিচে আকারে আয়তনে বাড়তে থাকে। আর গাছের ডালে ফলের মত ঝুলন্ত অংশগুলো কিন্তু খামালু গাছের ফল নয়। এগুলি খাদ্য সঞ্চয়ী কক্ষমুকুল। প্রকৃতপক্ষে এগুলো হল বায়বীয় রূপান্তরিত কান্ড। উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় বলে বুলবিল। এই বুলবিল সংগ্রহ করে মাটির মধ্যে বড় গর্ত খুঁড়ে ছাই ও মাটি দিয়ে ভর্তি করে লাগালে তা থেকে পরবর্তীতে নতুন চারাগাছ জন্মায়। ঐ গাছের নিচে মাটির গভীরে অনেক বড় আকারের আলু হয়। যা কিনা ওজনে ২-৫ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। যা মাটি খুঁড়ে সংগ্রহ করে বহু মানুষ। বিশেষ করে জঙ্গলের সাথে যাঁদের জীবনের ওতপ্রোতভাবে সম্পর্ক জড়িয়ে থাকে সেইসব গরিবগুর্বো সাধারণ মানুষের কাছে এই আলু মহার্ঘ্য স্বরূপ। 
জঙ্গলে এভাবেই জড়িয়ে উঠেছে লতানো খামালু গাছ

খামালুর কক্ষমুকুল বা বুলবিল পুড়িয়ে খেতে খুব উপাদেয় এবং মজাদার। এর মধ্যে থাকে ডায়াসকোরিন নামের এক বিশেষ ধরনের উপাদান। যা কিনা জন্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশ কার্যকরী এবং গুরুত্বপূর্ণ। এই বুলবিলগুলি কোথাও কোথাও ডায়রিয়া, বদহজম, আন্ত্রিক, কনজাংটিভাইটিস ইত্যাদি রোগের উপশমকারী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অষ্ট্রেলিয়ার একটি বিখ্যাত অনুষ্ঠান 'কুলামা'র তৃতীয় দিনে এর কন্দ রান্না করে খাওয়ার রীতি রয়েছে।
🍂

Post a Comment

0 Comments