তৃতীয় পর্ব
স্বাতী ভৌমিক
প্রকাশবাবু পথ দুর্ঘটনায় গত আড়াই মাস ধরে গৃহবন্দী। তাঁর শরীরের বামদিক এখনো ঠিকঠাক কাজ করছে না। এদিকে সমৃদ্ধিও বড় হচ্ছে। সাংসারিক নানা খরচের পাশাপাশি আনুষঙ্গিক আরো অনেক খরচ খরচের অংক বাড়িয়ে তুলেছে।
প্রকাশবাবু হুইল চেয়ারে বসে বসে কি সব কাজ করছিলেন। এমন সময় সুভাষিনী ধীর পায়ে এক কাপ চা হাতে ঘরে ঢুকে একটু উপস্থিতিজ্ঞাপক কাশির আওয়াজ করে বক্তব্য বিষয়ের ভূমিকার অবতারণা করে বলল- "এই যে শুনছো, তোমার জন্য চা এনেছি।" প্রকাশবাবু ইদানীং একটু বেশীই খিটখিটে মেজাজের হয়ে গিয়েছেন।বলে উঠলেন, "হ্যাঁ তা এনেছো যখন, তা নিয়ে আর বলার কী আছে? রেখে দাও- ঠিক খেয়ে নেব।"সুভাষিনী এহেন কথার কারণ না বুঝলেও খুব একটা অপ্রতিভ হলো না। কারণ স্বামীর ইদানীং ব্যবহারে মাধুর্যের থেকে তিক্ততা একটু বেশিই থাকে। এটাও সে প্রায় সহ্যের আওতায় এনে ফেলেছে। তবে মাঝে মাঝে চোখের জল যে তার শরিক হয় না- তেমন একা বা অসহায় সে নয়। প্রকাশবাবুর কথায় হাওয়া বুঝে সুভাষিনী চায়ের কাপ রেখে চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
🍂
ইদানীং অফিস থেকেও চাপ আসছিল প্রকাশবাবুর। অনেকদিন অফিসের কাজ নানাভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। অফিসের বড়বাবু আকারে ইঙ্গিতে অন্য কাউকে কাজে নিযুক্ত করার কথা ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন। কিন্তু প্রকাশবাবু খুব অসুবিধে না হলে কাজে ফাঁকি দেওয়ার মানুষ কিন্তু নন। তবুও কাজের জায়গায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দয়া মায়ার পরিসর নিতান্তই কম থাকে। প্রকাশবাবু নানা চাপে কেমন যেন একটু বদলে যাচ্ছেন! সুভাষিনীর সাথে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খুব একটা কথা তিনি আজকাল বলেনও না। মেয়ের সাথে মেয়ের দস্যিপনায় একটু মজা মাঝে মাঝে পান বটে, তবে সংসারের নানা চিন্তায় তাও বিঘ্নিত হয়।
সমৃদ্ধি বাবার ঘরে হঠাৎই ঢুকে পড়লো এবং বাবার কোলের কাছে এসে দাঁড়ালো। প্রকাশবাবু বুঝতে পারলেন মেয়ের তাঁর সাথে খেলার আবদার রয়েছে। প্রকাশবাবু মেয়ের দিকে তাকিয়ে একটু হাসার চেষ্টা করে এক চিলতে হাসি হেসে বললেন, "আমার অনেক কাজ মা, তুমি মায়ের কাছে যাও।" সমৃদ্ধি অত শত না বুঝে বাবার হাত ধরে টানতে লাগলো- জেদ করল। এই টানাটানির জেরে হঠাৎই টেবিলের উপরের চায়ের শূন্য কাপখানা মেঝেতে পড়ে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল। প্রকাশবাবু মেয়ের গালে সজোরে এক থাপ্পড় দিয়ে বললেন, " যেতে বলেছিলাম না, কাপটা ভেঙে গেল তো! সুভাষিনী...... সুভাষিনী......
স্বামীর ডাকের সুর শুনেই সুভাষিনী বুঝে গিয়েছে আজ আরও এক ঝামেলা হয়েছে। ছুটে এসে দেখল, সমৃদ্ধির দুগাল বেয়ে অঝোরে জল ঝরছে , গালের এক পাশ লাল হয়ে গিয়েছে আর কাপটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। স্বামীর দিকে তাকিয়ে দেখলো, তার চোখে মুখে তীব্র বিরক্তির ভাব। সুভাষিনীর দিকে তাকিয়ে প্রকাশবাবু বললেন, " সারাদিন করোটা কী! মেয়েটাকে একটু সময় দিতে পারো না ? ঘরে আছি বলে কী আমার কাজের কোন চাপ নেই!"
সুভাষিনী কথা না বাড়িয়ে নীরবে ভাঙা কাপের টুকরো, প্লেট আর সাথে মেয়েকে কোলে নিয়ে তাড়াতাড়ি সেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
ক্রমশ
0 Comments