বাঙালির শিক্ষাগুরু বিদ্যাসাগর
অর্হণ জানা
মায়ের পাঠানো ছোট ভাইয়ের বিয়ের চিঠি পেয়ে বাড়ি যাওয়ার জন্য ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের অধ্যক্ষ মার্শাল সাহেবের কাছে ছুটি চাইলেন ঈশ্বরচন্দ্র। ব্রিটিশ অধ্যক্ষ যখন ছুটি দিতে চাইলেন না, তিনি সে চাকরি ছেড়ে দিতে চাইলেন। কারণ, মা যেতে বলেছেন। তাঁকে যেতেই হবে।
ঈশ্বরচন্দ্রের মা ভগবতী দেবী সেই কুসংস্কারাচ্ছন্ন যুগেও ছিলেন অত্যন্ত আধুনিক চিন্তার অধিকারিণী এক নারী। বিদ্যাসাগর তাঁর মাকে দেবীর মতো শ্রদ্ধা করতেন। মা যা বলতেন, তিনি সঙ্গে সঙ্গে তা পূরণ করতেন।
মাতৃভক্তি ছিল তাঁর চরিত্রের অন্যতম গুণ। মনে করা হয়, বিদ্যাসাগরের সংস্কার আন্দোলন ও মুক্তচেতনার নেপথ্যে ছিলেন তাঁর মা। বীরসিংহ গ্রামে তিনি মায়ের নির্দেশেই স্কুল, অবৈতনিক ছাত্রাবাস আর দাতব্য চিকিৎসালয় গড়েন। শীতের হাত থেকে গ্রামের বাসিন্দাদের বাঁচানোর জন্য মায়ের নির্দেশেই নৌকো ভরতি করে কম্বল নিয়ে যান। কত মেয়ের যে বিয়ে দিয়েছিলেন তার ইয়ত্তা নেই! ঝড়ে পড়ে যাওয়া কত লোকের ঘর গড়ে দেন। তাঁর বিধবা বিবাহ চালু করার পেছনেও নাকি ছিল এই মায়েরই অবদান।
সেবার ছুটি পেয়ে রাতে ঝড়জলের মধ্যেই বাড়ির পথে রওনা হন তিনি। দামোদর নদী তখন উত্তাল। আবহাওয়াও খুব খারাপ। নদী পারাপারের জন্য কোনও নৌকা নেই। তখন তিনি ফুসে ওঠা ভয়ংকর নদী সাঁতরে বাড়ি যান। কারণ একটাই, মা ডেকেছেন।
ঈশ্বরচন্দ্রের জন্ম হয় ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর। আজকের পশ্চিম মেদিনীপুরের বীরসিংহ গ্রামে ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম হয়। কিন্তু তখন তা ছিল হুগলি জেলায়। বালক ঈশ্বরচন্দ্র শিশু বয়সেই গ্রামের চতুষ্পাঠী শিক্ষা সমাপ্ত করেন। এরপর তিনি দরিদ্র পিতার হাত ধরে পদব্রজে কলকাতায় আসেন। এই কলকাতাই হয়ে ওঠে ঈশ্বরচন্দ্রের কঠোর পরিশ্রমের সংগ্রামী শক্তির কেন্দ্র। তিনি মেধা বলে সমস্ত দারিদ্র্যকে উপেক্ষা করে প্রবেশ করলেন সংস্কৃত কলেজে। একের পর এক শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন এবং ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি লাভ করেন। এরপরেই শুরু হয় তাঁর মহান কর্মজীবন।
শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যাসাগরের অবদান তুলনাতীত। তিনি ইংরেজদের জানান, প্রথাসিদ্ধ সংস্কৃত পাঠের বদলে নতুন নিয়মে শিক্ষাপদ্ধতির সূচনা করার কথা। রবীন্দ্রনাথ তাঁর শিক্ষা বিস্তারের মূলে দেখেছিলেন মনুষ্যত্ববোধকে।
ছাত্রদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি পাঠোপযোগী বহু গ্রন্থ রচনা করেন। প্রথম শ্রেণীর শিক্ষার্থীর জন্য বর্ণবিন্যাস অনুযায়ী তিনি লেখেন সহজ ও সাবলীল ভাষায় ‘বর্ণপরিচয়’। তিনি বহু অনুবাদ রচনাও করেছেন। হিন্দির ‘বেতাল পচ্চীসী’র অনুবাদ ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’, কালিদাসের ‘অভিজ্ঞানম্ শকুন্তলম্’-এর গ্রন্থানুবাদ ‘শকুন্তলা’, শেক্সপিয়রের ‘কমেডি অফ এররস্’ অনুকরণে ‘ভ্রান্তিবিলাস’। এ ছাড়াও ‘বোধোদয়’, ‘কথামালা’, ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ প্রভৃতি গ্রন্থগুলি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
স্কুল-পরিদর্শক থাকাকালীন বিদ্যাসাগর হ্যালিডে ও বেথুন সাহেবের সঙ্গে পরামর্শ করে বাংলার প্রতি প্রান্তে প্রায় পঞ্চাশটি হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। পরবর্তীতে সরকার অর্থ সাহায্য বন্ধ করে দিলে তিনি নিজের পকেট থেকে স্কুলগুলির ব্যয়ভার বহন করেন। বর্তমান সমাজে স্ত্রী-শিক্ষার যেটুকু অগ্রগতি হয়েছে তার পথনির্মাতা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।
তিনি বিধবা বিবাহ প্রচলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। বহু বাক্বিতণ্ডা, তর্কাতর্কির পর বিদ্যাসাগরের সহযোগে ১৮৫৬ সালে বিধবা-বিবাহ প্রথা আইনতভাবে লিপিবদ্ধ করেন তৎকালীন ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহাউসি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সম্পর্কে লিখতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন, ‘মাঝে মাঝে বিধাতার নিয়মের এরূপ আশ্চর্য ব্যতিক্রম হয় কেন, বিশ্বকর্মা যেখানে চার কোটি বাঙালি নির্মাণ করিতেছিলেন সেখানে হঠাৎ দুই-একজন মানুষ গড়িয়া বসেন কেন, তাহা বলা কঠিন।’ রবীন্দ্রনাথের মতে, বাঙালির মধ্যে যে দু'-একজন মানুষ ছিলেন, তার মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর একজন।
একবার বিদ্যাসাগরের সঙ্গে দেখা করতে এসে রামকৃষ্ণ বললেন, 'এতদিন ডোবায় ছিলাম, আজ সাগরে এসে মিশলাম।' বিদ্যাসাগর বললেন, 'সাগরে যখন এসেছেন, তখন লোনা জল খেয়ে যান খানিক।' 'লোনা জল কেন? তুমি কি অবিদ্যার সাগর? তুমি যে বিদ্যার সাগর।' ঈশ্বরচন্দ্র শুধু বিদ্যার সাগর কিংবা দয়ার সাগরই ছিলেন না, তিনি ছিলেন কর্মেরও সাগর।
১৮৯১ সালের ২৯ জুলাই ৭১ বছর বয়সে এই মহামানবের মহাপ্রয়াণ ঘটে। সে সময় অনুসন্ধান নামের এক খবরের কাগজ তাঁর মৃত্যুসংবাদ দিয়ে লেখে--- বাঙালির শিক্ষাগুরু, বাংলাভাষার জন্মদাতা, কত অনাথ-আতুরের সহায়-সম্বল জগৎকে কাঁদিয়ে বাংলাকে শোকে ডুবিয়ে অনন্তধামে চলে গেলেন। আজ সেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ২০৬তম জন্মদিবস।
🍂
0 Comments