গুচ্ছ কবিতা
সুরভী চট্টোপাধ্যায়
বানভাসি কোনও এক শহরে
বৃষ্টি নেমেছে শহরে।
গলি জুড়ে কোমর জলে ভাসছে নিচুতলার নাগরিক জীবনের খেলো টুকিটাকি,
ঘর ডুবেছে পরের পর, ভাতের হাঁড়ি জলে ভেসে নিরুদ্দেশ।
বিছানা বালিশ ফুলে ঢোল, মা চৌকিতে ছোটো বোনকে কোলে নিয়ে বসে আছে চুপ চাপ,
পাশেই কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়ে আছে একটা বাস্তুহারা সাপ।
ভিজে স্যাঁতসেঁতে রাজনৈতিক স্লোগানের তলায়,
বিষ্ঠা ভাসে নগরময়।
রাতের শহরের প্রাণহীন আলো্র নীচে জমে থাকা জলে বড় ভয় ,
আর বড় কষ্ট জলের মধ্যে , শ্বাসহীন, শীতল, মৃত্যুময়।
কে হিসেব রাখে বানভাসি শহরে, কারা বাঁচে মরে, ভেসে যায়, খাবি খায়,
কেউ সাঁতরায়, কেউ গলে পচে মিশে যায় অসারতার অস্থি মজ্জায়।
মা বসে বসে ঢুলছে ভাসন্ত চৌকিতে,
কোলের খোকাও মুখে স্তনবৃন্ত নিয়ে ঘুমোচ্ছে,
সাপটা কখন নেমে অন্যদিকে সাঁতার দিয়েছে খাবারের সন্ধানে।
সস্তার সংসারের ভেসে যাওয়া কুটোকাটার মাঝে,
একটা হাত ভাঙ্গা পুতুল আটকে আছে কোনোক্রমে পাঁচিলের গায়ে।
দুখ জাগানিয়া বৃষ্টিতে সাঁতরে চলছে ছোট্ট মেয়ে এক,
তার সেই প্রতিবন্ধী সন্তানটিকে উদ্ধারের আশায়।
তাদের জন্য লিখব
নরম আলোর মত কিছু লিখতে বড্ড ইচ্ছে করে,
যে আলোতে ঘরছাড়া পরিযায়ী পাখিরা খুঁজে নেবে ফেরার রাস্তা।
সহজ, সত্য এবং সুন্দর কোনও বাক্য ,
যা লিখতে লিখতে ছোট্ট ডলফিনের মত খেলব
আর পাখনা ঝাপটাব সরল অনুসন্ধিৎসায়।
এমন এক শ্লোক, যা পাঠ করতে করতে হে অরণ্য তুমি
আধো ঘুমে, আধো জাগরণে, সুখ শব্দ উচ্চারণে,
নিখাদ ভোর মাখবে মুখে, গায়ে, মাথায়।
ফিরে এস বাসা ভাঙা , লোমহীন বিভারের দল, ফিরে এস কবিতার বুকে।
মায়ের আঁচলের মত কিছু কথা বুনে বুনে তৈরি করেছি নকশী কাঁথা,
তাতে ঢেকে রেখে, দেব ওম রাত জুড়ে।
যে কটা দিন বাঁচব, ছত্রে ছত্রে জোনাকি আঁকব,
শুকনো মাটিতে শ্যাওলা গন্ধে ভিজে শব্দের বৃষ্টি নামাব।
ব্যাঙ, ছোট মাছ, শামুক, শালুক তোমরা প্রাণ ভরে বেঁচো আমার লেখার জলকেলি তে।
আগলে রাখব বুনো ঘোড়ার ভ্রূণকে,আমার গল্পের প্রোটাগনিস্ট করে
মাছরাঙার জন্য লিখব বহুতল ভেঙে তৈরি করা এক নতুন জলাশয়ের উপন্যাস।
ধীরে ধীরে রচনা করব এক আনন্দময় অলৌকিক মহাকাব্য,
শুধু তাদের নিয়ে , যারা হারিয়ে গেছে, হারিয়ে যাচ্ছে অথবা হারিয়ে যাবে,
নীল হিমবাহের পৃষ্ঠভূমিতে রচনা করা আমার সৃষ্টিতে তারা সবাই থাকবে দুধে ভাতে।
আমার মা আসছে
মা, কাশফুলের সাদা দিয়ে পেতেছি বিছানার চাদর,
আকাশের পেঁজা মেঘ দিয়ে বানিয়েছি বালিশ,
তুমি এসে বসবে আমার বিছানায়, বালিশে ঠেস দিয়ে,
হাতে তুলে নেবে সেই অসমাপ্ত সেলাই টা।
পদ্ম ফুলও তুলে রেখেছি মা, তুমি ফুটিয়ে থালায় সাজাবে,
আমরা ঘিরে বসব তোমাকে, হাতে হাতে এগিয়ে দেব এটা ওটা, করব খুনসুটি।
শালুকের ডাঁটির মালা বানিয়ে পরিয়ে দেব তোমার মরাল গ্রীবায়,
তুমি খালি সেই সেই ঝাল ঝাল শাপলার ঘণ্টটা রেঁধো ছোলা দিয়ে।
শেফালি ফুল রাশি রাশি কুড়িয়ে রেখে দেব তোমার জানলার পাশে,
তুমি শুধু মনে করে ছোট বোনটাকে এট্টূ শিউলির পাতা বেঁটে খাইয়ে দিও নিজের হাতে,
যেমন দাও প্রতিবার, আমাদের জ্বরজারি হলে,
উত্তপ্ত কপালটায় ধীরে ধীরে বিলি কাটে তোমার নরম হাত,
জ্বর সেরে যায়, সব ব্যাথা পালিয়ে যায়।
মা, নতুন শাড়ি কিনেছি তোমার জন্য্ , লাল টুকটুকে, তুমি স্নান করে পড়বে,
আমি তোমার কুঁচি ধরে দেব যত্নে, আঁচড়ে দেব চুল, খোঁপায় লাগিয়ে দেব ফুল,
আর তোমার আঁচল ধরে ঘুরে বেড়াব প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে,
একসঙ্গে খাব বুড়ির চুল, তোমাকে জানাব সেই ছেলেটার কথাও,
তুমি যে আমার প্রিয় বন্ধু মা ।
আকশে বাতাসে খালি তোমার গন্ধ এখন মাগো,
মাটির সোঁদা গন্ধের মত প্রাণময়, মধুর,
0 Comments