জ্বলদর্চি

নীরব বিকেলের সুর/প্রিয়া কুন্ডু নন্দী

অণুগল্প 

নীরব বিকেলের সুর

প্রিয়া কুন্ডু নন্দী 

স্কুলের শেষ দিনের শেষ ঘণ্টাটা যখন বাজল, রিমা আর অর্কের বুকের ভেতরটা যেন একটা চেনা সুর আচমকা থেমে গেল। বারো বছর একই স্কুলে, বেঞ্চে পাশাপাশি বসে কাটিয়েছে। টিফিন ভাগ করে খাওয়া, পরীক্ষার নোটস তৈরি করা, আবার বৃষ্টিভেজা বিকেলে এক ছাতার নিচে হেঁটে বাড়ি ফেরা—সবকিছুই এত স্বাভাবিক ছিল, এর গভীরে লুকিয়ে থাকা অন্য এক অনুভূতিকে দুজন কখনো তলিয়ে দেখেনি। শুধু নরম আলো দুজনে গায়ে মেখে দিন কাটিয়েছে।
কিন্তু আজ পরিস্থিতি আলাদা। দুজনেই কলেজের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। তবে অর্ক‌ যাবে অনেক দূরে—পড়াশোনার জন্য, সে যাচ্ছে বিদেশের এক নামী মহাবিদ্যালয়ে।
সেদিন বিকেলে ওরা বসেছিল সেই চেনা লেকের ধারের বেঞ্চে। আকাশ জুড়ে মেঘেদের আলপনা। ঠিক যেমন মেঘ ওদের মনের মধ্যে জমা হয়েছে। অর্ক ব্যাগ থেকে একটা ডায়েরি বের করে রিমার দিকে এগিয়ে দিল।
অর্ক বলল, “এটা তোর জন্য।” রিমা ডায়েরিটার দিকে চেয়ে বলে, “এটা দিচ্ছিস কেন?” অর্ক চোখদুটো নামিয়ে বলে, “সেখানে গিয়ে হয়তো ফোনে রোজ কথা হবে না, তাই...। তোর মনে কোনো কথা জমা হলে এটায় লিখে রাখিস।”
🍂

রিমা ডায়েরিটা হাতে নেবার সাথে নরম আঙুলগুলোর সাথে অর্কর হাত ছুঁয়ে যায়। ক্ষণিকের মুহূর্তেই একটা বিদ্যুতের তরঙ্গ খেলে গেল দুজনের শরীরে। রিমা ডায়েরির পাতা ওলটাতেই দেখল, পাতার প্রথমে অর্কর হাতের লেখা। লেখা আছে—“দূরত্ব শুধু কিলোমিটারের, বাকিটা তো তুই  জানিস...”
রিমা অর্কর চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে আজ কোনও দুষ্টুমি নেই, আছে দুজন দুজনকে কাছে হারানোর ভয় আর এক অদ্ভুত আকুলতা। এতগুলো বছর ধরে যে ভালবাসা বন্ধুত্বের আবরণে ঢাকা ছিল, আজ বিদায়ের ঘণ্টাধ্বনি ওদেরকে এক লহমায় স্পষ্ট বুঝিয়ে দিল। ওরা বুঝতে পারল, এতদিন তারা দুজন দুজনকে স্রেফ 'ভালো বন্ধু' ভেবে এসেছে, তা আসলে ছিল এক গভীর, নিটোল নীরব প্রেম।
রিমার চোখের কোণে জল আর অর্কর রিমার হাতটাকে শক্ত করে ধরার অনুভূতি নীরবে বুঝে যায়। বিদেশের দূরত্ব হয়তো ওদের শরীরকে আলাদা করবে, কিন্তু এই নীরব প্রেমের সুতোয় বাঁধা হৃদয় দুটোকে ছিঁড়ে ফেলার সাধ্য কোনো মানচিত্রের নেই।

Post a Comment

0 Comments