জ্বলদর্চি

অণুগল্প : মিথ্যেবাদী মা/মুক্তি দাশ

অণুগল্প 
চিত্র: মহুয়া ব্যানার্জী

মিথ্যেবাদী মা
মুক্তি দাশ

‘হ্যাঁরে সন্তু, তোর নতুন মা কেমন? সত্যি করে বলবি কিন্তু।’
‘কেন, ভালোই তো। খুব ভালো বাবা!’
‘আর তোর ফটো-মা?’

বাসি ফুলের মালা জড়ানো দেয়ালে ঝুলে থাকা মায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে সন্তুর চোখদুটো একটুখানি ছলছল করে উঠল বুঝি! কিন্তু সন্তু পাত্তা দিল না। হাতের তালুর পিঠ দিয়ে চোখদুটো ভালো করে রগড়ে মুছে নিয়ে বলল, ‘ফটো-মা পচা! খালি মিছে কথা বলত।’--

বিনয় এবার সত্যিই অবাক হল। বলে কী! দশ বছরের ছেলে সন্তুকে রেখে তার প্রথমা স্ত্রী মারা যাবার পর একবছরও পূর্ণ হয়নি, বিনয় আবার বিয়ে করেছে। মা-মরা ছেলেটার কথা ভেবেই। দ্বিতীয়বার বিয়ে করার সময় তাঁর একটাই শুধু আশঙ্কা ছিল, সন্তুর কোনো অবহেলা হবে না তো! নতুন মায়ের রোষের শিকার হয়ে যাবে না তো তার নিষ্পাপ ছেলেটা! ভয়ে ভয়েই ছিল। তাই সেদিন ফাঁক বুঝে সে কথাচ্ছলে মা-মরা ছেলেটাকে যাচাই করে নিতে চাইল, সত্যিই তার মনে কোথাও কোনো দুঃখ বা ক্ষোভ দানা বেঁধে উঠেছে কিনা।
🍂

কিন্তু এ কী শুনল বিনয়? নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। সন্তুর কাছে তার নতুন মা নাকি খুব ভালো। শুনে খুশিই হল বিনয়। শুধু খুশি না, রীতিমতন আশ্বস্তবোধও করল সে। যেন বুকের ভেতর জমে থাকা বিশাল একটা ভয়ের পাথর আজ সরে গেল। কিন্তু সন্তু তার নিজের মায়ের সম্পর্কে এরকম কথা বলবে কেন?

হালকা ধমকের সুরে বিনয় বলল, ‘ছিঃ সন্তু, ছিঃ! উনি তোমার নিজের মা। তোমাকে ছেড়ে স্বর্গে গেছেন। আর তুমি ওঁর নামে...তাঁকে মিথ্যেবাদী বলছ? ছিঃ!’

আর একবার চোখদুটো মুছে নিয়ে সন্তু নির্ভীকভাবে বলল, ‘আমার মা ভীষণ ভীষণ মিথ্যে কথা বলত বাবা, তুমি জানো না। আমি দুষ্টুমি করলে বলত, আজ তোর খাওয়া বন্ধ। তারপর জানো তো, খাওয়ার সময় ঠিক চুপিচুপি ডেকে নিয়ে গিয়ে জোর করে খাইয়ে দিত – এমন মিথ্যুক! মিথ্যেবাদী একটা!’

বিনয় স্তম্ভিত। কোনোরকমে শুধু বলতে পারল,‘আর নতুন মা?’
 
সন্তু মুখ নিচু করে বলল, ‘বললাম না, নতুন মা খু-উ-ব ভালো। একটাও মিছেকথা বলে না। একটাও না। কাল দুষ্টুমি করেছিলাম তো, তাই নতুন মা বলেছিল, খাওয়া বন্ধ…তো খাওয়া বন্ধ! আজ এখনো পর্যন্ত কিচ্ছুটি খাইনি বাবা!’

Post a Comment

2 Comments

  1. ভারি সুন্দর হয়েছে "মিথ্যেবাদী মা" গল্পটি। লেখিকাকে আন্তরিক অভিনন্দন।

    ReplyDelete
  2. মনটা খারাপ হয়ে গেল

    ReplyDelete