জ্বলদর্চি

মিশেল ফুকো ও সভ্যতার প্যানঅপ্টিকন সংকট/ চন্দন সেন


মিশেল ফুকো ও সভ্যতার প্যানঅপ্টিকন সংকট

 চন্দন সেন 


১৭৫৭। ফ্রান্সে একজন রাজদ্রোহীকে শাস্তি দেওয়া হবে, কারণ অজস্র সাধারণ রাজভক্তদের সাথে ঝামেলা এড়ানো শান্তিপ্রিয় মানুষদের প্রায় নীরব সাক্ষ্যে প্রমাণিত হচ্ছে লোকটা রাজাকে খুন করার চেষ্টায় ছিল। অতএব লোকটাকে ধরা হল, আর্ত বিস্মিত আর প্রতিবাদী মানুষটার কাছ থেকে আত্মপক্ষ্য সমর্থনে কোনো কথা শোনা হল না। লোকটার শরীর পোড়ানো হচ্ছিল, ছেঁড়া হচ্ছিল, ঘোড়া দিয়ে টেনে চেরা হচ্ছিল। অজস্র মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। 

ফ্রান্সের আধুনিক কালের বিখ্যাত দার্শনিক মিশেল ফুকো (Michel Foucault) এই দৃশ্যটার বিবরণ দিয়ে বললেন, - এমনই ছিল পুরনো ক্ষমতার ভাষা। ক্ষমতা মানে রাষ্ট্রক্ষমতা। তখন ক্ষমতা তার শক্তি দেখাতো শরীরের উপর - গোপনে নয় প্রকাশ্যে, জেলের ভেতর নয়, খোলাখুলিভাবে, নগ্নভাবে ও নির্মমভাবে। - যাতে বাকি সব্বাই মানে চারপাশে জড়ো হওয়া সাধারণ মানুষ সব্বাই দৃশ্যটা দেখে এবং ভয় পায় এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্য দেখায়। ফুকো দেখালেন ১০০ বছরের মধ্যেই সব বদলে গেল। শাস্তি চলে গেল চার দেওালের ভেতরে। - মানে জেলখানায় এল। এই বদলটাকে অনেক জ্ঞানী-গুণী বলছেন সভ্যতার অগ্রগতি। ফুকো বললেন, - না! এটা ক্ষমতার কৌশলের পরিবর্তন। ক্ষমতা আরও চালাক হয়ে গেছে আরও গভীরে গেছে। দেহ বা শরীর বা বহিরঙ্গ ছেড়ে ঢুকে গেছে সাধারণ মানুষের মনের গভীরে। 

১৭৯১ সালে ব্রিটিশ দার্শনিক জেরেমি বেন্থাম (Jeremy Bentham) তাঁর দর্শনের ভিত্তিতে একটা কারাগারের নকশা করেছিলেন, যার নাম দিয়েছিলেন প্যানঅপ্টিকন (Panopticon) । নকশার এই কারাগারটি হচ্ছে গোলাকার, মাঝে একটা উঁচু টাওয়ার, যেখান থেকে পুরো কারাগারটা দেখা যায়। চারপাশে বন্দীদের ঘর, প্রতিটি ঘর টাওয়ারের দিকে মুখ করা। বন্দীরা কিন্তু টাওয়ারের ভেতরে কেউ কাউকে দেখতে পায় না, কিন্তু তারা বিশ্বাস করে যেকোনো মুহূর্তে তাদের দেখা যেতে পারে। এই দেখতে না পাওয়াটাই প্যানঅপ্টিকনের মূল কৌশল। কৌশলটা কিন্তু মারাত্মক। যদি বন্দী নিশ্চিত জানতো এই মুহূর্তে কেউ দেখছে না, - সে হয়তো নিয়ম ভাঙতো। যখন সে জানে না কেউ দেখছে কী দেখছে না, তখন সে সবসময় ধরে নেয় দেখা হচ্ছে; এবং সেই অনুযায়ী বন্দী তার আচরণ ঠিক করে নেয়। রাষ্ট্রের এই ব্যবস্থা বা কৌশলে পাহারাদারকে সবসময় উপস্থিত থাকতে হয় না। বন্দী নিজেই নিজের পাহারাদার হয়ে যায়। 

🍂

মিশেল ফুকো বললেন, - আধুনিক ক্ষমতার না রাষ্ট্রীয় আধিপত্যবাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় আবিষ্কার হচ্ছে এটাই। ক্ষমতার সবচেয়ে কার্যকর রূপ সেটা নয়, যেখানে কেউ তোমাকে বাধ্য করছে, নিয়ন্ত্রণ করছে। এখনকার ক্ষমতার সবচেয়ে কার্যকর রূপ সেটা যেখানে তুমি নিজেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করবে। বাইরের নিয়ন্ত্রণ ভাঙা যায়, বিপ্লব করা যায়, লড়াই করা যায়, পালানো যায়, কিন্তু ভেতরের নিয়ন্ত্রণ ভাঙা প্রায় অসম্ভব। সেই নিয়ন্ত্রণ নিজেই নিজের তৈরি করা নিয়ন্ত্রণ। এইভাবে মিশেল ফুকো দেখালেন আধুনিক সমাজব্যবস্থা একটা বিশাল প্যানঅপ্টিকন। স্কুলে গিয়ে বাচ্চা জানে বা মানে শিক্ষক যেকোনো সময় তাকে দেখছে। তাই সে নিজেই চুপ করে থাকে। একইভাবে এখন অফিসের কর্মচারী জানে অফিসে সিসিটিভি আছে, ম্যানেজার আছে, তাই সে অফিসে নিজেই নিজেকে ব্যস্ত রাখে। হাসপাতালের রোগী শুয়ে-শুয়ে বিশ্বাস করে ডাক্তার রিপোর্ট দেখবেন, তাকে ওষুধ বা ইনজেকশন দেবেন, তাই সে নিজেই নিয়ম মেনে শুয়ে থাকে। ২২ বছর আগে মিশেল ফুকো মারা যান। এই ২২ বছরে প্যানঅপ্টিকনের ধারণা একটা অদ্ভুত বাঁক নিয়েছে। পুরনো প্যানঅপ্টিকনের ধারনায় বন্দীরা অনিচ্ছায় নিজেই নিজের পাহারাদার ছিল। আজকের প্যানঅপ্টিকনে যার আধুনিকতম রূপ হচ্ছে Social media তাতে মানুষ স্বেচ্ছায় ঢুকছে, বার হচ্ছে, আবার ঢোকার জন্য লাইন দিচ্ছে। .

ভালো করে ভাবলে একটু মজাই লাগে যখন আমরা বুঝতে পারি Facebook, Instagram, Twitter ইত্যাদিতে আমি নিজেই আমার জীবনকে পোস্ট করছি। নিজেই জানাচ্ছি কোথায় আছি, কী করছি, কী ভাবছি বা কার সাথে আছি, এবং আমি জানি আমার Boss আমায় দেখতে পারছে, আমার পরিবার দেখতে পারছে। রাষ্ট্রব্যবস্থা বা সরকার আমায় দেখতে পাচ্ছে। আর অজস্র অচেনা মানুষ আমায় দেখতে পাচ্ছে। এই জানাটাই আমার আচরণ বদলে দিচ্ছে। আবার আমি কী সত্যি সত্যি নিজের মতকে প্রকাশ করছি? - না, আমি কিন্তু লিখছি acceptable version। আমি কী সত্যিকারের রাগ প্রকাশ করছি? - না, আমার সত্যিকারের রাগে ভেজাল মিশছে, কারণ আমি ভাবছি এটা screenshot হবে কিনা। আমি কী সত্যিকারের দুঃখ দেখাচ্ছি? – না, কারণ এই দুঃখ দেখানোটাকে মানুষ দুর্বলতা ভেবে নেবে। প্রতিটি Post এর আগে আমি নিজেই নিজেকে সেন্সর করছি। নিজেই নিজেকে মাপছি। নিজেই নিজের একটা উপস্থাপনাযোগ্য সংস্করণ তৈরি করছি। কেউ আমাকে বাধ্য করছে না, প্যানঅপ্টিকনের টাওয়ার থেকে কেউ নির্দেশ দিচ্ছে না। যা কিছু করছি আমি নিজেই নিজেকে সেন্সর করে উপস্থিত করছি। আধুনিক ক্ষমতা মানুষকে তার নিজের কারাগার নিজেই বানাতে শেখায়। মানুষ স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে নিজে থেকেই কারণ অস্বাভাবিক হওয়াটা বিপজ্জনক। 

ফুকো এই ধারণাটার নাম দিয়েছিলেন normalization বা স্বাভাবিকীকরণ। এখন social media তে এই নরমালাইজেশন নিয়ে প্রবলতম ব্যস্ততা, যাকে বলা হয় algorithm। যে post বেশি like পায় তাকে বেশি জনপ্রিয় মনে হয়। যে মত জনপ্রিয় সে আরও জনপ্রিয় হতে চায়। যে মানুষ এই জনপ্রিয়তার ভিড়ের বাইরে কথা বলে সে প্রাথমিকভাবে দৃশ্যহীন হয়ে যায়। ফলে মানুষ নিজেই ভিড়ের দিকে সরে আসে। কারণ দৃশ্যমান থাকতে গেলে স্বাভাবিক থাকতে হয়। এই স্বাভাবিকতার সংজ্ঞা ঠিক করে algorithm। আর এই algorithm -কে আসলে ঠিক করে কে? – ক্ষমতা, রাষ্ট্রক্ষমতা। শেষ পর্যন্ত কিন্তু দু’টো প্রশ্ন বেঁচে থাকে, যার উত্তর আজও অজানা। যখন ক্ষমতা মানুষের ভেতরে ঢুকে যায়, মানুষ নিজেই তার কারাগার বানায়, - তখন মুক্তি কোথায়? তাহলে বিপ্লব করবে কার বিরুদ্ধে যখন শত্রু তোমার নিজের ভেতরে? হাক্সলি একসময় বলেছিলেন, - দিন আসছে যখন মানুষ স্বেচ্ছায় স্বাধীনতা বিসর্জন দেবে। ফুকো দেখালেন, - সেই স্বাধীনতা বিসর্জনের কাঠামোটা কীভাবে কাজ করে, এবং কেন সেটা ভাঙা এতো কঠিন। অনুন্নত দেশগুলোতে বাইরের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে যে স্বাধীনতার লড়াই চলছে দুনিয়ার বৃহদাংশ জুড়ে সেই স্বাধীনতার লড়াইটা এখনো প্রবল। মিশেল ফুকো বা হাক্সলি আধুনিক social media -র রমরমার যুগে যে সংকটগুলোর কথা বলেছেন, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উন্নত স্বাধীন দেশের সমস্যা। আমরা এ দেশে বাস করতে করতে social media -র এই চূড়ান্ত রমরমার যুগেও বুঝতে পারছি মিশেল ফুকোর উত্তর-আধুনিকতাবাদ বা সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে যাপনের অনিবার্য কারাগারের উপস্থিতি। আর এখন বোঝা যাচ্ছে, social media -র প্রশ্নহীন একাধিপত্যকে ভেঙে চৌচির করে দিতে পারে একমাত্র অনিয়ন্ত্রণ-যোগ্য প্রকৃতি। ৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ লোকের বিপন্নতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে উন্মত্ত প্রকৃতি social media কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দিলো নেপালে। এখনো জানা যায়নি, সবগুলো মৃতদেহ কোথায়। এখনো বোঝা যায়নি আপাত শান্ত পাহাড়ি নদীগুলো কেন কীভাবে শতাব্দীর বৃহত্তম ট্র্যাজেডি ঘটিয়ে দিতে পারে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে। আজকের সর্বশক্তিমান social media -র বিপন্নতার একটি অস্থির চিত্র ২০২৬ এর আগস্ট মাসের উপান্তে কাঁপতে থাকা নেপাল, যেখানে মানুষ হয়তো অজান্তেই তার ধ্বংসের কারাগার তৈরি করছিল। 


Post a Comment

2 Comments

  1. শ্যামল মজুমদারSeptember 18, 2026

    পোষ্টমডার্ণ এই সময়টা খুবই আপেক্ষিক ও ভঙ্গুর, প্রকৃতির বিপন্নতা আসলে আমাদের সভ্যতার বিপন্নতার কারণ, এটাই পোষ্টমর্ডাণ ফ্যালাসি, মূল্য মানবসভ্যতাকে চোকাতেই হবে। আজ নয় কাল, অপেক্ষায় থাকি আমরা।

    ReplyDelete
  2. কমলিকা ভট্টাচার্যSeptember 18, 2026

    লেখক ও তার লেখনীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে

    চক্রব্যূহ
    দেয়াল ছিল না কোথাও,
    তবু চারপাশে
    কী এক অদৃশ্য ঘেরাটোপ
    পা বাড়ালেই ফিরে আসি
    নিজের আঁকা সীমানায়।

    কেউ পাহারা দেয় না,
    তবু শব্দেরা বেরোনোর আগে
    নিজের কাছেই তল্লাশি দেয়।
    কিছু রাগ নরম হয়ে যায়,
    কিছু কান্না আলোয় আসার আগেই
    চোখের ভেতর শুকিয়ে যায়,
    কিছু সত্য
    নিজের কাছেই অপরিচিত হয়ে থাকে।

    আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
    মুখটা একটু একটু করে পাল্টাই
    যতটা গ্রহণযোগ্য,
    যতটা সুন্দর,
    যতটা দেখানো যায়;
    বাকিটুকু রেখে দিই
    অন্ধকারের কাছে।

    চারদিকে অসংখ্য মুখ,
    সবাই একই স্রোতে ভাসে।
    আমিও ভাসি
    কখন যে নিজের পথ
    ভিড়ের পায়ের নিচে চাপা পড়ে যায়,
    টের পাই না।

    কেউ সুতো টানে না,
    তবু পুতুলেরা নড়ে
    একই অদৃশ্য ছন্দে।

    হয়তো এভাবেই
    সবচেয়ে নিখুঁত কারাগার তৈরি হয়
    যেখানে তালা থাকে না,
    চাবিও থাকে না,
    শুধু মানুষটি
    নিজের চারপাশে
    একটির পর একটি বৃত্ত আঁকতে আঁকতে
    একদিন ভুলে যায়
    চক্রব্যূহের বাইরে
    একটা আকাশও ছিল।

    ReplyDelete