নদী তুমি কার
রাই পারমিতা আইচ
বহুদিন পর সেই নদীপাড়ে মধ্যবয়সী স্মৃতি,গভীরভাবে মেটাচ্ছে বুভুক্ষু তৃষ্ণা। বড় নদীটায় তখন গতিময়তার সাথে কতো স্রোত ছিল। এখন!
ভাবনায় ছেদ পড়ে। অমসৃণ পাথরে পা পড়েছে,ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে স্মৃতি। কোমরের ব্রেসটা জায়গাচ্যুত হয়েছিল।
স্বামীর বদলির চাকরিতে বারবার বদলেছে ঠিকানা। কিন্তু প্রকৃতি,নদী! একইভাবে সম্পর্কে রয়ে গেছে ওরা। স্মৃতির রঙ-তুলির যাদুতে ফুটেছে অজানা চাকচিক্য।
"বৌদি,আপনার জীবন্ত ছবির টান উপেক্ষা করা মানে প্রকৃতির সাথে বৈরীতা! এক্সিবিশনে একটা ছবি প্লিজ।"
মৃদু হাসে স্মৃতি।
"আমাদের বাড়ির বৌয়েরা এভাবে পরপুরুষের দৃষ্টি আকৃষ্ট করেনি। আঁকা-ফাঁকা বন্ধ।"
কাঠফাটা গ্রীষ্মে নদীকে চেনা দায়। কোথাও চৌচির বুকময় ফাটল,কোথাও ঘোলাজল।
"সোমেন!"
সূর্যাস্তের রঙ ছড়িয়েছে জলে। স্মৃতি নদীপাড়ে।অশ্রুফোঁটার সাথে দূরত্ব মিলেমিশে যায়।
আকাশে মেঘ জমলে শিহরিত হয় জল। গাছপালা মাতাল হয়। শুখা নদীতে শব্দ ওঠে,ছলাৎছল। ঘোলাজল গল্পঝাঁপি খোলে ঘাটে। রাতজাগা জোনাকীরা বুকে বাঁধে সে গল্প। স্মৃতির শুধু বুক ভাসিয়ে কান্না নামে। ততদিনে সে বুঝেছে সুখ নির্ভুল হয় না। সম্পর্কের মতোই তাতে হাজারটা অন্ধ ফাঁক-ফোঁকর।
🍂
নদী জেগে উঠলেই মরা শরীরেও ঢেউ তোলে। আবছা ভেসে ওঠে হারিয়ে যাওয়া মুখ। তারা ওকে কিছু বলে। হৃদস্পন্দন ছাড়া স্মৃতি মারা পড়বে,প্রতিবাদ ছলকে ওঠে। সোমেনকে লুকিয়ে চলে প্রাণদান।
হঠাৎই আবার বাসা পরিবর্তন। তখন স্মৃতির মতো ধানশস্যে ভরাট প্রকৃতির শরীর। বৃষ্টিভেজা রাতে লুকিয়ে কুপির আলোতে রঙছোপ আঁকে সে...
মাথার উপরে জমাট কালো-নীলের লুকোচুরি কাটাকুটি মেঘ। সোমেন আক্রোশে কুটিকুটি করছে আঁকাগুলো। বর্ষায় ভেসে যাচ্ছে উন্মত্ত অলকানন্দা,পদ্মা...।
"মা বৃষ্টি নামতে পারে, এস। সময়ের সাথে কতো জল বয়ে গেছে খেয়াল নেই স্মৃতির। মেয়েকে বলে চলেন নদীজন্মের গল্প। মেয়েও দেখে মায়াজন্ম,হসপিটাল,দাদু-দিদা সবার খুশীখুশী মুখ।
অশ্রুদাগ মুছে নদী জেগে উঠলে আনন্দের পাশাপাশি ভয়ও আছে।
আজ স্মৃতি ভাসিয়ে দেবে অকেজো আঁকা-জোখা। কষ্ট,ঘৃণা বেহিসেবী হিসেব! বহু অস্তিত্ব ও শূন্যস্থানের মাঝে দিগন্ত জোড়া শূন্য।
মেয়ে বিস্মিত, বুকে জড়ায় সেসব। অভিমানকে বেশী বাসি হতে দিও না মা।
0 Comments