জ্বলদর্চি

সেগুন-শালের অরণ্যগাথা/পর্ব ১/মৈত্রেয়ী চট্টোপাধ্যায়

সেগুন-শালের অরণ্যগাথা
পর্ব ১
মৈত্রেয়ী চট্টোপাধ্যায় 

মধ‍্যভারতের বাঘমহাল 

বিভূতিভূষণ “চাঁদের পাহাড়” লিখেছিলেন, তাঁর কল্পলোকে আফ্রিকা যে রূপে ধরা দিয়েছিলো তার ওপর ভিত্তি করে। আফ্রিকায় তাঁর যাওয়া হয়নি কখনো। ঠিক তেমনই রুডইয়ার্ড কিপলিং এর মনোভূমিতে মধ‍্যভারতের অরণ্যানীর যে ছবি সেদিন ফুটে উঠেছিল, তাই দিয়ে জন্ম হয়েছিল সেই চিরন্তন রূপকথার যার আবেদন বিশ্বব্যাপী। তিনি এ জঙ্গল চাক্ষুষ করেননি কোনদিন। অনেকটা এইরকম -  বরফঘেরা এক নিঃসঙ্গ কটেজ, নাম “নৌলখা”। তীব্র শীতল, তুষারাবৃত। আমেরিকার সেই কটেজে ফায়ারপ্লেসের আগুনের সামনে বসে সাতাশ আঠাশ বছরের এক যুবকের কল্পনায় ধরা দিল সুদূর ভারতের এক গভীর অরণ‍্য। উষ্ণ, আর্দ্র, চিরসবুজ ও পর্ণমোচী। তাঁর সুদূরপ্রসারী ভাবনার মানসলোকে তিনি যে মহারণ‍্যের ছবি আঁকলেন, সেখানে ভেসে উঠলো শুকনো পাতা ছড়ানো সেগুনের বন, তার ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া অদৃশ্য শ্বাপদকূলের নিঃশব্দ পদচারণা। সেখানে জন্ম নিল আমাদের শৈশবের সেই চিরন্তন রূপকথার। এই সেই অরণ্য-সাম্রাজ্য যার নাম ‘সিওনি হিলস’ বা আজকের পেন্চ জাতীয় উদ্যান। 

তৎকালীন ব্রিটিশ শিকারী ও প্রকৃতিবিদদের কিছু ডায়েরি ও রিপোর্ট ছিল তাঁর রশদ। এলাহাবাদ ও বোম্বেতে তাঁর সাংবাদিকতা করার সময় তিনি পড়েছিলেন স্যার উইলিয়াম হেনরি স্লিম্যানের একটি চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট— “অরণ্যে নেকড়েদের দ্বারা লালিত মানব শিশু”An Account of Wolves Nurturing Children in Their Dens"। ১৮৩১ সালে এই সিওনি জেলার জঙ্গল থেকেই উদ্ধার হয়েছিল এক আদিম ‘নেকড়ে-বালক’, যার কাছে মানুষের ভাষা ছিল অজানা, হাঁটত সে চার পায়ে । সেই নেকড়ে-বালকই ছিল ঐতিহাসিক ‘মোগলি' চরিত্রটি সৃষ্টির পিছনে মূল অনুপ্রেরণা । সেই জঙ্গল-বালক ও মধ্যভারতের অরণ্য-করিডোরের মানচিত্র সামনে রেখে লেখা হলো এক চিরন্তন রূপকথা। সৃষ্টি হল “দ্য জাঙ্গল বুক”।

শুষ্ক ও পাতাঝরা অরণ্য হওয়া সত্ত্বেও জলাভূমি এই বনের জীবনীশক্তি। এখানকার নদী, জলাধার এবং ছোট ছোট জলাভূমি জঙ্গলটির  ভারসাম্য রক্ষা করে। জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়েছে পেঞ্চ নদী। জঙ্গল পার হয়ে কানহান নদী ও পরে বাঈনগংগা নদীর সাথে গিয়ে মিলিত হয় এই নদী। উদ্যানটি বাঈনগংগা নদী অববাহিকার  অন্তর্ভুক্ত। এই নদী মধ্যপ্রদেশের সেওনি জেলার মহাদেব পাহাড়ের মুণ্ডারা গ্রাম থেকে উৎপন্ন হয়েছে। পথিমধ্যে নদীটি মহারাষ্ট্রে ওয়র্ধা নদীর সাথে মিশে ‘প্রাণহিতা’ নাম নিয়ে শেষ পর্যন্ত গোদাবরীতে গিয়ে পড়েছে। বলা হয়ে থাকে, রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের বিখ্যাত ‘দ্য জঙ্গল বুক’-এর গল্পগুলো এই বনাঞ্চল আর নদীকে কেন্দ্র করেই অনুপ্রাণিত হয়েছিল। বনের ঠিক কেন্দ্রে পেঞ্চ নদীর ওপর গড়ে উঠেছে তোত্লাদোহ বাঁধ, যা মেঘদূত ড্যাম নামেও পরিচিত। বন‍্য প্রাণীদের জন‍্য আশীর্বাদ সম। বিশেষ করে এপ্রিল-মে মাসের তীব্র গরমে যখন বনের ছোটখাটো নালা ও খাঁড়িগুলো একদম শুকিয়ে যায়, তখন এই জলাধারটিই হয়ে ওঠে বন্যপ্রাণীদের তৃষ্ণা মেটানোর প্রধান আশ্রয়।তবে পেন্চ নদী গ্রীষ্মকালে শুকিয়ে গেলেও নদীর তলদেশে এবং কিছু নির্দিষ্ট নিচু এলাকায় প্রাকৃতিকভাবেই গভীর গর্ত বা জলাশয় তৈরি যেগুলোকে স্থানীয় মানুষ‘দোহ’ (Dohs) বলে। এই দোহগুলো বনের গভীরে থাকা বাঘ, চিতাবাঘ ,হরিণ ও অন‍্যন‍্য প্রাণীদের জলপানের জন্য চমৎকার ‘ওয়াটারহোল’ হিসেবে কাজ করে ।

শীতে আবার এই জলাভূমিগুলোর রূপ আমূল বদলে যায়। হিমালয় এবং উত্তর এশিয়া থেকে হাজার হাজার পরিযায়ী জলজ পাখি যেমন বার-হেডেড গিজ, পিনটেল হাঁস, ব্রাহ্মিনী হাঁস এই জলাধারে আশ্রয় নেয়। এই সময়ে জলাভূমির চারপাশ পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত থাকে, যা পাখিপ্রেমীদের জন্য এক পরম পাওয়া। জলাভূমিগুলোতে  কুমির এবং মিঠে জলের কচ্ছপ দেখা যায়। নদীর অগভীর অংশে মাছরাঙা এবং অস্প্রে পাখিদের মাছ শিকার করার দৃশ্য সাফারির অন্যতম বড় আকর্ষণ। জলাভূমির অগভীর অংশে পদ্ম ও শাপলা ফুল ফুটে থাকে যা পরিবেশকে অতি মনোরম করে তোলে। পার্কের সীমানার কাছে অবস্থিত শান্ত ও সুন্দর হ্রদটি সূর্যাস্ত দেখার জন্য সমাদৃত। সাফারির সময় গাইডরা সাধারণত এই জলাভূমিগুলোর আশেপাশেই ড্রাইভারদের গাড়ি থামানোর নির্দেশ দেন। এখানে বন্যপ্রাণী দেখার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
 ভারতবর্ষের প্রায় বেশীরভাগ জঙ্গল ভ্রমনের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে এটিই সবচেয়ে মনোরম ও দৃষ্টিনন্দন অরণ‍্যভূমি। অদ্ভুত মোহময়। এ জঙ্গল কখনো নিরাশ করেনি। যতবার যাই, দুহাত নিংড়ে নিয়ে আসি অসংখ‍্য ভালোলাগা মূহুর্ত ও চিত্র। 

পেনচ মূলত একটি পর্ণমোচী বা পাতাঝরা অরণ্য। শাল, সেগুন, মহুয়া এবং পলাশ এর সমারোহে প্রজ্বল। বসন্তের পলাশ জঙ্গলকে মায়াবী রঙে রাঙায়। এখানে তখন বসন্ত উৎসব।
এই অভয়ারণ্য প্রকৃতির এক অপরূপ মায়াজাল যেন, যেখানে মিশেছে আদিম অরণ্যের রহস‍্য এবং বন্য জীবনের রোমাঞ্চ। খোলা জিপে  প্রকৃতির বুকে ঘুরে বেড়ানোর মধ্যে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ আছে। সকলের মত আমার কাছেও এই জিপসিতে চড়ে জঙ্গল ঘুরে বাঘ খোঁজার আনন্দ সবচেয়ে বেশি। ভোরবেলায় বা বিকেলের শেষ আলোয় বনের শান্ত পরিবেশের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ যখন কোনো বন্যপ্রাণী গর্জন শুনি বা সম্বর হরিনের সতর্কবার্তা (Alarm Call), অজানা ভয়, সাথে তীব্র উত্তেজনা ঘিরে ধরে। শুরু হয় নি:শব্দ অপেক্ষা। 

গ্রীষ্ম এখানে চরম ভাবাপন্ন এবং শুষ্ক। তাপমাত্রা ৩৫° থেকে ৪৫° সেলসিয়াস। মধ‍্যদিনে প্রচণ্ড লু বা গরম হাওয়া বইলে কিছুটা অসহনীয় মনে হতে পারে। গাছের সব পাতা ঝরে গেলে জঙ্গল শুকনো, ধূসর এবং উন্মুক্ত রূপ নেয়। বনানী তখন যেন সংকোচহীন। তাই বাঘ দেখার সেরা সময়। জলের খোঁজে বাঘ ও তৃষ্ণার্ত বন্যপ্রাণীরা ওয়াটারহোলের আশেপাশে ভিড় করে বলে পশুদের সহজেই দেখা মেলে। 
হালকা সুতির পোশাক, রোদচশমা ,টুপি এবং জল সাথে রাখতে প্রয়োজন। 

শীতের রূপ আবার একেবারেই আলাদা। কুহকী এই জঙ্গল তখন সবুজ, ঘন এবং সতেজ। ভোরের দিকে  পরিবেশ ঐন্দ্রজালিক। অত্যন্ত ঠান্ডা বাতাসের কারণে খোলা জিপে সাফারি কিছুটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। বাঘ দেখার সম্ভাবনা তখন কিছুটা মাঝারি। জঙ্গল ঘন হওয়ার কারণে বাঘ সহজেই লুকিয়ে থাকে। হরিণ, বাইসন এবং শীতের পরিযায়ী পাখিদের (Migratory Birds) দেখার এটি সেরা সময়। শীতকালের জঙ্গল দারুণভাবে উপভোগ্য। যদি বাঘ দেখা গৌণ হয় তবে জঙ্গল ভ্রমণ শীতে এক অন‍্য মাত্রা নেয়। ভোরের সাফারির জন্য জ্যাকেট, গ্লাভস এবং মাফলার অবশ্যই প্রয়োজন।

মধ্যপ্রদেশ আর মহারাষ্ট্রের বর্ডার পার হয়ে যখন পেঞ্চের গভীর জঙ্গলে পা রাখলাম, বুকের ভেতর কেমন যেন একটা চেনা ছটফটানি টের পেলাম। এটা শুধু চোখের সামনে হঠাৎ বাঘ দেখার এক্সাইটমেন্ট নয়; এটা আসলে খাঁচামুক্ত এক আদিম জীবনে, নিজের শিকড়ে ফিরে যাওয়ার এক অদ্ভুত টান।
কানহার সেই দিগন্তজোড়া সবুজ ঘাসজমি, পেঞ্চের নুড়ি-পাথরে ভরা শুকনো নদীখাত, তাডোবার রুক্ষ গরম বাতাস, আর বিন্ধ্য-সাতপুরার পাহাড়ি কোলে বান্ধবগড়ের জঙ্গল— এই সবটা মিলিয়েই মধ‍্যভারতের অরণ্যদেবতার রাজত্ব। যেখানে অরণ‍্যের প্রতিটি স্পন্দন এক একটি জীবন্ত ইতিহাস। এই ধারাবাহিক আসলে সেই প্রাচীন সাম্রাজ্যের রাজনদের রাজত্বে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়া এবং এক আত্মিক যাত্রার গল্প... (ক্রমশ...)
🍂

Post a Comment

2 Comments

  1. অসাধারণ বর্ণনা l সঙ্গের ছবিগুলিও অতি চমৎকার l

    ReplyDelete
    Replies
    1. জেনে আনন্দ পেলাম।

      Delete