অর্হণ জানা
রাখি পূর্ণিমার পবিত্র উৎসব হল ভারতীয় উপমহাদেশের ভাই বোনের প্রেম-প্রীতির অন্যতম বন্ধন উৎসব। এই উৎসব যত না আনন্দের, তার চেয়েও অনেক বেশি দায়িত্বের।
কিংবদন্তী আছে, আলেকজান্দার ভারত আক্রমণ করলে আলেকজান্দারের স্ত্রী রাজা পুরুকে একটি পবিত্র সুতো পাঠিয়ে অনুরোধ করেছিলেন আলেকজান্দারের যাতে কোনও ক্ষতি না হয়। আলেকজান্দারের স্ত্রীর সেই অনুরোধ পুরু রেখেছিলেন। তিনি আলেকজান্দারের কোনও ক্ষতি হতে দেননি।
তবে রাখি পরানোর বিষয়টির সঙ্গে যোগ রয়েছে বেশ কিছু পৌরাণিক কাহিনিরও। মহাভারতে কথিত আছে, শ্রীকৃষ্ণ যখন সুদর্শনচক্র দিয়ে শিশুপালকে বধ করেছিলেন, তখন তাঁর তর্জনীতে চোট লেগে রক্তপাত হয়েছিল। সেই সময় দ্রৌপদী নিজের শাড়ির পাড় ছিঁড়ে প্রিয় সখার আঙুলে বেঁধে দিয়েছিলেন।
এতে শ্রীকৃষ্ণ অভিভূত হয়ে যান। দ্রৌপদী অনাত্মীয়া হলেও তিনি দ্রৌপদীকে নিজের বোন বলে ঘোষণা করেন এবং দ্রৌপদীকে এর প্রতিদান দেবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দেন।
এই ঘটনার বহু বছর পরে, পাশা খেলায় শেষ পর্যন্ত তাঁদের পাঁচ ভাইয়ের একমাত্র স্ত্রী দ্রৌপদীকে বাজি রেখে পঞ্চপাণ্ডবরা যখন হেরে যান, তখন কৌরবরা দ্রৌপদীকে লাঞ্ছিত করে তাঁর বস্ত্রহরণ করতে গেলে এই শ্রীকৃষ্ণই দ্রৌপদীর সম্মান রক্ষা করে সেই প্রতিদান দেন।
দ্রৌপদী যেদিন নিজের শাড়ির পাড় ছিঁড়ে শ্রীকৃষ্ণের তর্জনীতে বেঁধে দিয়েছিলেন, সেই দিনটি ছিল শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমার দিন। তাই এই দিনটিকে পুরাণে রাখিবন্ধন হিসেবে গণ্য করা হয়।
রাখি পূর্ণিমা ভারতের এমন একটি উৎসব যা হিন্দু, জৈন ও শিখরা পালন করে। এই দিন দিদি বা বোনেরা তাদের দাদা বা ভাইয়ের দীর্ঘায়ু, সাফল্য ও সমৃদ্ধির কামনা করে তাদের হাতে রাখি নামে একটি পবিত্র সুতো বেঁধে দেয়।
এই রাখিই ভাই বা দাদার প্রতি দিদি বা বোনের ভালবাসা এবং অবশ্যই নিরাপত্তার ঢাল। এই রাখি পরাবার সময় বোনেরা তাঁদের ভাইয়ের দীর্ঘায়ু, সাফল্য ও সমৃদ্ধির কামনা করেন। মঙ্গল কামনা তো বটেই। এই একই সঙ্গে এটা দিদি বা বোনকে আজীবন রক্ষা করার ভাই বা দাদার শপথের প্রতীকও।
হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, শ্রাবণ মাসের শুক্ল পক্ষের তিথিতে এই উৎসব পালিত হয়। রাখি উৎসব শুরু হওয়ার পিছনে দ্রৌপদী ও শ্রীকৃষ্ণের কাহিনির পাশাপাশি আরও অনেক পৌরাণিক গল্প প্রচলিত আছে।
ভাগবত পুরাণে একটি গল্পে রয়েছে, স্বর্গে তখন রাজত্ব চালাচ্ছে অসুররাজ বলি। অসুরের দাপটে ভীত ইন্দ্র একদিন ভগবান শ্রী বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন। তখন বিষ্ণু বামন অবতার হয়ে রাজা বলির কাছে ভিক্ষে চান তিন পা জমি। রাজা বলি সেই জমি দিতে রাজি হলে বামন অবতার বিশাল চেহারা ধারণ করে এক পায়ে স্বর্গ আর এক পায়ে মর্ত্য অধিকার করে নেন। অথচ বলি কথা দিয়েছেন তিনি তিন পা জমি দেবেন ভগবান বিষ্ণুকে। তাই তিনি তৃতীয় পা রাখার জন্য নিজের মাথা পেতে দেন।
🍂
অসুররাজ বলির এই কাজে খুশি হয়ে তাকে বর দিতে চান ভগবান বিষ্ণু। বলি তখন ভগবান বিষ্ণুর কাছে বর চান, তাঁর সঙ্গে পাতালে গিয়ে বসবাস করার। যেহেতু ভগবান বিষ্ণু বর দিতে চেয়েছেন এবং বলি নিজে ওই বর চেয়েছেন তাই ভগবান বিষ্ণু পাতালে গিয়ে বলির সঙ্গে বসবাস শুরু করেন।
এর কিছুদিন পরে ভগবান বিষ্ণুর স্ত্রী লক্ষ্মী তাঁর স্বামীকে ফিরে পাবার জন্য এক অতি সাধারণে মেয়ের ছদ্মবেশে বলিরাজের কাছে আসেন। তিনি বলিকে বলেন, তাঁর স্বামী নিরুদ্দেশ। যত দিন না তাঁর স্বামী ফিরে আসছেন তত দিন যেন বলি তাঁকে আশ্রয় দেন।
বলিরাজা ছদ্মবেশী লক্ষ্মীকে আশ্রয় দিতে রাজি হন। ওখানে থাকার সময়ে এক শ্রাবণ পূর্ণিমার উৎসবে বলির হাতে একটি রাখি বেঁধে দেন লক্ষ্মী। বলি এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে লক্ষ্মী নিজের পরিচয় দিয়ে সব খুলে বলেন। এতে বলিরাজা মুগ্ধ হয়ে ভগবান বিষ্ণুকে বৈকুণ্ঠে ফিরে যেতে অনুরোধ করেন। ভগবান বিষ্ণু ও লক্ষ্মীর জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করেন বলিরাজা। সেই থেকেই শ্রাবণ পূর্ণিমা তিথিতে ভাইদের হাতে রাখি বাঁধতে শুরু করে বোনেরা।
সংস্কৃত শব্দ 'রক্ষা বন্ধন' থেকেই প্রচলিত হয়েছিল রাখি কথাটি। শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে এর তাৎপর্য। রক্ষার বাঁধন। হিন্দু এবং শিখদের মধ্যে এই উৎসব ভাই-বোনেরা পালন করলেও জৈন ধর্মাবলম্বীরা আবার একটু অন্য ভাবে এই উৎসবে শামিল হন। তাঁদের মধ্যে আবার জৈন পুরোহিত ভক্তদের হাতে ধাগা বেঁধে দেন এই দিনে।
রাখি প্রচলনের নেপথ্য কাহিনি নিয়ে অন্য আরেকটি গল্পও প্রচলিত আছে। সেখানে রয়েছে--- রাখিবন্ধনের দিন গণেশের বোন গণেশের হাতে একটি রাখি বেঁধে দেন। এতে গণেশের দুই পুত্র শুভ ও লাভের হিংসে হয়। তাদের কোনও বোন ছিল না। তারা বাবার কাছে একটি বোনের জন্য বায়না ধরে।
গণেশ তখন তাঁর দুই পুত্রের নাছোড়বান্দা বায়নার জন্য দিব্য আগুন থেকে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। এই কন্যাই হল গণেশের মেয়ে সন্তোষী। সন্তোষী গণেশের দুই পুত্র শুভ ও লাভের হাতে রাখি বেঁধে দেন।
রাখিবন্ধন উৎসবের প্রচলন নিয়ে আরও নানা গল্প ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। শোনা যায়, গুজরাতের সুলতান বাহাদুর শাহ্ চিতোর আক্রমণ করলে চিতোরের বিধবা রাণী কর্ণবতী অসহায় বোধ করেন এবং ১৫৩৫ খ্রীষ্টাব্দে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে নিজের ওড়নার একটু অংশ ছিঁড়ে রাখি হিসেবে পাঠিয়ে তাঁর কাছে সাহায্য চান। কর্ণবতীর পাঠানো রাখি পেয়ে অবাক হয়ে যান হুমায়ুন এবং চিতোর রক্ষার জন্যে বিপুল সৈন্য পাঠান।
মহাভারতের কাহিনি অনুসারে, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে নাতি অভিমন্যুর রক্ষা কামনা করে রাখি বাঁধেন পঞ্চপাণ্ডবের মা কুন্তী।
কথিত আছে, ভাইফোঁটার মতোই এই রাখি উৎসবেও যম ও যমুনার একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। যমুনাও যমকে রাখি পরিয়েছিলেন। তাতে খুশি হয়েছিলেন যমরাজ। তিনি যমুনাকে অমরত্বের আশীর্বাদ দেন। তারপর থেকেই এটাই প্রচলিত বিশ্বাস যে, যদি কোনও বোন বা দিদি তাদের ভাই বা দাদার হাতে রাখি বেঁধে দেয় তাহলে সে অমরত্ব প্রাপ্ত হবে।
বাংলা ক্যালেন্ডার এবং পাঁজি অনুযায়ী প্রতি বছর শ্রাবণ পূর্ণিমার দিনেই এই উৎসব মহাধুমধাম করে পালিত হয়। শুধু ভারতেই নয়, রাখিবন্ধন উৎসব পালিত হয় নেপাল, পাকিস্তান এবং মরিশাসেও।
রাখিবন্ধনের এই উৎসব কীভাবে শুরু হয়েছিল তার পিছনে এ রকম অজস্র নেপথ্য কাহিনি প্রচলিত আছে। যেগুলি মানুষের মুখে মুখে প্রচারিত এবং মহাভারত, রামায়ণ, পুরাণ বা ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে, আমি কেবলমাত্র সেগুলিই বললাম। যাঁর যেটা পছন্দ হবে কিংবা যেটাকে বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে হবে, তিনি না হয় সেটাই বেছে নেবেন।
এ দিন ভাইয়ের কপালে কুমকুমের ফোঁটা দিয়ে হাতে রাখি বেঁধে দেন বোনেরা। রাখি পরানোর পর প্রদীপ জ্বালিয়ে ভাইয়ের আরতি করেন। তার পরে চলে মিষ্টিমুখের পালা। ভাইয়েরাও তার সাধ্য মতো বোনেদের হাতে তুলে দেন উপহার।
এ ভাবেই রক্তের সম্পর্ক ও ভালবাসা নিবিড় হয়। দীর্ঘকাল থেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে এই প্রথা। তবে বাঙালিদের কাছে রাখি কেবলই ভাই-বোনের মধ্যেই আবদ্ধ নয়, এখন তো বন্ধুরাও বন্ধুদের রাখি পরায়। সে ছেলেই হোক কিংবা মেয়ে।
আর এই রাখিবন্ধনের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম। কলকাতায় রাখিবন্ধন উৎসব শুরু করেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ২০ জুলাই বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পর জাতি বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই আন্দোলন ও প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে। ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গের দিন স্থির হয়।
বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে বাংলার প্রতিটি ঘরে অরন্ধন পালনের সিদ্ধান্ত হয়। এই কর্মসূচিতে সবাইকে এগিয়ে আসতে তাঁরা আমন্ত্রণপত্র দেন। সেই আমন্ত্রণপত্রে লেখা ছিল---
বঙ্গচ্ছেদে রাখীবন্ধন।
আগামী ১৬ই অক্টোবর, ৩০ আশ্বিন, সোমবার, আইনের দ্বারা আমাদের বাংলাদেশ বিভক্ত হইবে। আসুন, আমরা ঐ দিনকেই আমাদের সমস্ত বাঙালীর ঐক্যবন্ধনের দিন করি। ঐ দিন আমরা পরস্পরের হাতে হরিদ্রাবর্ণের সুতায় ঘরে ঘরে অথবা প্রকাশ্যস্থলে সম্মিলত হইয়া, রাখী-বন্ধন করিয়া, আমাদের অখণ্ড ভ্রাতৃভাব সকল বাঙালী মিলিয়া প্রকাশ করি। এই শুভ বন্ধনের স্থায়িত্ব কামনায় ঐ দিন আমরা সংযম গ্রহণ করিব। ঐ দিন সমস্ত বাংলাদেশের কোথাও কোন গৃহে রন্ধন হইবে না। আমরা বাঙালীরা সে দিন উষ্ণ দ্রব্য ভোজন করিব না। বনভজনের পারণের ন্যায় চিড়া মুড়কি, ফলাদি আহার করিয়া থাকিব। কেবল শিশুর জন্য দুগ্ধ জ্বাল দিতে অন্যত্র অগ্নি জ্বালিব, চুল্লি জ্বলিবে না। ঐ দিনকেই প্রতি বছর বাঙালী রাখিবন্ধনের দিন করিয়া স্মরণীয় করিয়া রাখিব। আশা করি, বঙ্গের জমিদার সম্প্রদায় প্রজাগণকে, গ্রামের প্রধানেরা গ্রামবাসীদিগকে, বিদ্যালয়ের ছাত্ররা তাহাদের প্রতিবাসীদিগকে এই অনুষ্ঠানের তাৎপর্য বুঝাইয়া দিয়া, যাহাতে বঙ্গের প্রত্যেক গ্রামে জাতীয় ঐক্যবন্ধনোৎসব সুচারুরূপে সম্পাদিত হয়, অবিলম্বে তাহার আয়োজন করিবেন।
নিবেদক,
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
শ্রীসুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।
শ্রীরামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী।
শ্রীভূপেন্দ্রনাথ বসু।
শ্রীহীরেন্দ্রনাথ দত্ত।
শ্রীবিপিনচন্দ্র পাল।
চিঠির মাঝখানে ছিল নিবেদক শব্দটি। বাঁ দিকে ছিল প্রথম তিনটি নাম। এবং বাকি তিনটি নাম ছিল ডান দিকে।
সে দিন এই আন্দোলন বাংলা ভাগের ব্রিটিশ চক্রান্ত রুখে দিয়েছিল। ১৯০৫-এর সেই দিনের স্মরণে ২০২৬-এর ২৭ আগস্ট রাজ্যজুড়ে সরকারি উদ্যোগে পালিত হবে রাখিবন্ধন উৎসব। এই উৎসবে গোটা রাজ্য জুড়ে মোট ২৫ লক্ষ ৬০ হাজার ৫০০টি রাখি সরবরাহের ব্যবস্থা করেছে সরকার।
এ বছর রাখি বন্ধন উৎসব পড়েছে ২৮ আগস্ট শুক্রবার। বাংলা মতে ১০ ভাদ্র। হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী, ২৭ আগস্ট সকাল ৯টা ০৮ মিনিটে ভাদ্র মাসের পূর্ণিমা শুরু হবে। ২৮ আগস্ট সকাল ৯টা ৩৮ মিনিট পর্যন্ত পূর্ণিমা থাকবে। উদয়া তিথিতে রাখি বন্ধন উৎসব পালিত হয়। ২৮ আগস্ট উদয়া তিথি হওয়ায় এ দিনই রাখি বন্ধন হবে। তবে পঞ্জিকা ভেদে সময় পৃথকও হতে পারে।
0 Comments