দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ৩রা সেপ্টেম্বর, বিশ্ব স্কাইস্ক্র্যাপার দিবস। আসুন এই সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
আকাশছোঁয়া স্বপ্ন ও নগরসভ্যতার প্রতিচ্ছবি
মানুষের স্বপ্ন বরাবরই ঊর্ধ্বমুখী। একসময় মানুষ পাহাড়ের চূড়ায় ওঠাকে অসম্ভব মনে করত, অথচ আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতিতে আজ মানুষ নিজের তৈরি ভবনকেই আকাশের কাছাকাছি নিয়ে গেছে। বহুতল ও সুউচ্চ অট্টালিকার এই বিস্ময়কর স্থাপত্য-যাত্রাকে স্মরণ ও উদ্যাপনের একটি উপলক্ষ হলো, বিশ্ব স্কাইস্ক্র্যাপার দিবস। প্রতি বছর ৩রা সেপ্টেম্বর এই দিবসটি পালিত হয়। আকাশছোঁয়া ভবন শুধু স্থাপত্যের কৃতিত্ব নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে মানুষের উদ্ভাবনী শক্তি, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা।
‘স্কাইস্ক্র্যাপার’ শব্দটির অর্থ আক্ষরিকভাবে ‘আকাশ ছোঁয়া’। সাধারণত অত্যন্ত উঁচু বহুতল ভবনকে স্কাইস্ক্র্যাপার বলা হয়। উনিশ শতকের শেষভাগে আধুনিক স্কাইস্ক্র্যাপারের বিকাশ শুরু হয়। ইস্পাতের কাঠামো, নিরাপদ লিফট, উন্নত কংক্রিট এবং আধুনিক নির্মাণপ্রযুক্তির আবিষ্কার মানুষের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। আগে একটি ভবনের উচ্চতা মূলত তার দেওয়াল ও ভিত্তির শক্তির ওপর নির্ভর করত। কিন্তু ইস্পাতের কাঠামো ব্যবহারের ফলে, ভবনকে অনেক বেশি উঁচু করে নির্মাণ করা সম্ভব হয়।
বিশ্বের বড়, বড় শহরের পরিবর্তনের সঙ্গে স্কাইস্ক্র্যাপারের ইতিহাস গভীরভাবে যুক্ত। জমির পরিমাণ সীমিত অথচ জনসংখ্যা ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ক্রমশ বাড়তে থাকায় শহরগুলোকে ওপরের দিকে বিস্তৃত হতে হয়েছে। ফলে একই জমিতে বিপুল সংখ্যক মানুষকে বসবাস, কাজ ও ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার জন্য সুউচ্চ ভবন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নিউইয়র্ক, শিকাগো, দুবাই, সাংহাই, হংকং, সিঙ্গাপুরসহ পৃথিবীর বহু শহরের নগর-পরিচয়ের সঙ্গে আজ স্কাইস্ক্র্যাপার ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
🍂
স্কাইস্ক্র্যাপারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তার উচ্চতা হলেও এর গুরুত্ব কেবল উচ্চতায় সীমাবদ্ধ নয়। একটি আধুনিক সুউচ্চ ভবনের নকশায় স্থাপত্য, প্রকৌশল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নগরপরিকল্পনার সমন্বয় ঘটে। প্রবল বাতাস, ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড, মানুষের নিরাপত্তা এবং ভবনের ওজন সবকিছুকে হিসাবের মধ্যে রেখে নকশা করতে হয়, ফলে প্রতিটি স্কাইস্ক্র্যাপার মানুষের জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার এক অনন্য প্রদর্শনী। তবে আকাশছোঁয়া ভবন নির্মাণের সঙ্গে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সুউচ্চ ভবন তৈরিতে বিপুল পরিমাণ অর্থ, শক্তি ও নির্মাণসামগ্রী প্রয়োজন হয়। ভবন পরিচালনার সময়ও বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার যথেষ্ট হতে পারে। তাই বর্তমান বিশ্বে স্কাইস্ক্র্যাপার নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব বাড়ছে। সৌরশক্তি ব্যবহার, শক্তি-সাশ্রয়ী কাচ, প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের সর্বোচ্চ ব্যবহার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং সবুজ ছাদ এসব উদ্যোগ একটি ভবনকে আরও টেকসই করে তুলতে পারে।
আধুনিক স্কাইস্ক্র্যাপার তাই শুধু কংক্রিট ও ইস্পাতের সমষ্টি নয়; এটি ভবিষ্যতের নগরজীবনের পরীক্ষাগারও বটে। একটি সুউচ্চ ভবনের ভেতরে অফিস, বাসস্থান, দোকান, বিনোদনকেন্দ্র, রেস্তোরাঁ এবং নানা ধরনের পরিষেবা থাকতে পারে, ফলে একটি ভবন অনেক সময় একটি ছোট শহরের মতো কাজ করে। এর মাধ্যমে শহরের সীমিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব হয়। ভারতেও স্কাইস্ক্র্যাপার সংস্কৃতি দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। মুম্বই, দিল্লি-এনসিআর, কলকাতা, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদসহ বিভিন্ন শহরের নগরচিত্রে সুউচ্চ ভবনের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। বিশেষ করে মুম্বইয়ের মতো জনবহুল শহরে সীমিত জমির কারণে উল্লম্ব নগরায়ণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কলকাতার আকাশরেখাতেও ধীরে, ধীরে বহুতল ভবনের উপস্থিতি বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে উন্নয়নের পাশাপাশি নগরবাসীর নিরাপত্তা, পরিবেশের ভারসাম্য এবং ঐতিহাসিক স্থাপত্য সংরক্ষণের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব স্কাইস্ক্র্যাপার দিবস আমাদের তাই শুধু উঁচু ভবনের দিকে তাকাতে শেখায় না, বরং প্রশ্ন করতে শেখায় উন্নয়নের উচ্চতা কতটা টেকসই? একটি শহর কতটা বাসযোগ্য? প্রযুক্তির অগ্রগতি কি প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগোচ্ছে? কারণ মানুষের তৈরি ভবন যতই আকাশ ছুঁয়ে ফেলুক, তার ভিত্তি থাকতে হবে মাটিতেই। সেই ভিত্তি হলো নিরাপত্তা, পরিবেশ সচেতনতা, মানবিকতা এবং সুশৃঙ্খল নগরপরিকল্পনা।
আকাশছোঁয়া ভবন মানুষের অদম্য কল্পনাশক্তির প্রতীক। একসময় যে উচ্চতা কল্পনার বিষয় ছিল, আজ তা বাস্তব। স্কাইস্ক্র্যাপার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষ সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে সত্যিকারের সাফল্য কেবল আরও উঁচু ভবন নির্মাণে নয়, এমন নগর তৈরি করায়, যেখানে প্রযুক্তি, প্রকৃতি এবং মানুষের জীবন একসঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে,
0 Comments