দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে
আজ ৪ঠা অক্টোবর, বিশ্ব প্রাণী কল্যাণ দিবস। দিবসটি আমাদের সকলের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ আসুন সবকিছুই বিস্তারিতভাবে জেনে নিই।
প্রাণের প্রতি মমত্ববোধের অঙ্গীকার নেওয়া উচিৎ।
প্রাণী আমাদের পৃথিবীর সহযাত্রী। মানুষ একা এই পৃথিবীর অধিবাসী নয়, অসংখ্য প্রাণী, পাখি, কীটপতঙ্গ ও জলজ জীবের সঙ্গে মিলেই গড়ে উঠেছে প্রকৃতির ভারসাম্য। অথচ মানুষের নানা কর্মকাণ্ডে আজ বহু প্রাণী নিরাপদ জীবন থেকে বঞ্চিত। প্রাণীদের প্রতি মানুষের দায়িত্ব ও সহমর্মিতার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে প্রতি বছর ৪ অক্টোবর বিশ্ব প্রাণী কল্যাণ দিবস পালন করা হয়। ১৯২৫ সালে জার্মানির বার্লিনে প্রথম এই দিবসের আয়োজন হয় এবং ১৯৩১ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে আন্তর্জাতিক প্রাণী সুরক্ষা সংগঠনগুলোর সম্মেলনে ৪ঠা অক্টোবরকে বিশ্ব প্রাণী দিবস হিসেবে সর্বজনীনভাবে পালনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। বিশ্ব প্রাণী কল্যাণ দিবসের উদ্দেশ্য শুধু প্রাণীকে ভালোবাসার কথা বলা নয়, তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়াও এর অন্যতম লক্ষ্য। প্রাণীরা মানুষের ভাষায় কথা বলতে না পারলেও তারা ক্ষুধা, ভয়, কষ্ট ও নিরাপত্তার অনুভূতি প্রকাশ করে। তাই তাদের প্রতি অকারণে নিষ্ঠুরতা মানবিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রাণী ও মানুষের জীবন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কৃষিকাজ, পরিবেশের ভারসাম্য, পরাগায়ন, বীজ ছড়িয়ে দেওয়া এবং খাদ্যশৃঙ্খল প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিভিন্ন প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগবাহীরা উদ্ভিদের প্রজননে সাহায্য করে, পাখিরা বীজ ছড়ায় এবং বন্যপ্রাণীরা বাস্তুতন্ত্রকে সচল রাখে। তাই প্রাণীদের রক্ষা করা মানে শেষ পর্যন্ত নিজেদের পরিবেশকেও রক্ষা করা।
🍂
কিন্তু বাস্তব চিত্র সব সময় আশাব্যঞ্জক নয়। বন ধ্বংস, জল ও বায়ুদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য, অবৈধ শিকার, পাচার এবং প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার কারণে অসংখ্য প্রাণী বিপদের মুখে পড়ে। শহরাঞ্চলেও পথপ্রাণীদের খাবার, নিরাপদ আশ্রয় ও চিকিৎসার অভাব দেখা যায়। ভারতের সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা এই সমস্যার বাস্তব চিত্র তুলে ধরলাম, যেমন,২০২৫ সালে দিল্লি-এনসিআর অঞ্চলে বন্যার সময় বহু প্রাণী আটকে পড়েছিল। উদ্ধারকারীরা নৌকা ব্যবহার করে আটকে পড়া প্রাণীদের উদ্ধার করেন। তাদের মধ্যে একটি ছোট কুকুরছানাকে ইয়মুনার তীর থেকে উদ্ধার করে চিকিৎসা করা হয় এবং পরে তার জন্য স্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়।
আরও একটি ঘটনা ঘটে ঝাড়খণ্ডের হাজারিবাগে। ২০২৫ সালের আগস্টে একটি হনুমানকে কয়েক দিন ধরে একটি বন্ধ শাটারের কাছে শিকল দিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। স্থানীয় একজনের অভিযোগের পর বন বিভাগের সহায়তায় প্রাণীটিকে উদ্ধার করা হয়। চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে উঠলে তাকে আবার প্রাকৃতিক পরিবেশে ছেড়ে দেওয়া হয়। উড়িষ্যার উদুপি জেলার একটি ঘটনাও প্রাণী কল্যাণের গুরুত্ব স্পষ্ট করে। ২০২৫ সালে একটি অবৈধ প্রাণী রাখার কেন্দ্রে একাধিক প্রজাতির শত, শত প্রাণীকে অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় রাখার অভিযোগ ওঠে। প্রশাসন, বন বিভাগ, প্রাণীসম্পদ দপ্তর, পুলিশ ও প্রাণী কল্যাণ সংগঠনের যৌথ অভিযানে পর্যায়ক্রমে ৩০০ র বেশি প্রাণী উদ্ধার করা হয়।
এই ঘটনাগুলোর প্রতিটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়, একজন সাধারণ মানুষের সচেতনতা থেকেও একটি প্রাণীর জীবন বদলে যেতে পারে। কোথাও একজন নাগরিক প্রাণীর দুরবস্থা দেখে অভিযোগ করেছেন, কোথাও স্থানীয় মানুষ উদ্ধারকারীদের সহযোগিতা করেছেন, আবার কোথাও প্রশাসন ও বন বিভাগের সঙ্গে সমন্বিতভাবে উদ্ধারকাজ পরিচালিত হয়েছে। অর্থাৎ প্রাণী কল্যাণ কেবল কোনো একটি সংগঠনের কাজ নয়; এটি সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। তবে প্রাণী কল্যাণ মানে শুধু আহত প্রাণীকে উদ্ধার করা নয়। পোষ্য প্রাণীর যথাযথ খাবার, পানি ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, তাকে রাস্তায় পরিত্যাগ না করা, পথপ্রাণীকে অকারণে আঘাত বা বিরক্ত না করা এবং পরিবেশে প্লাস্টিক ও অন্যান্য ক্ষতিকর বর্জ্য না ফেলা, এসবও প্রাণী কল্যাণের অংশ।
শিশু ও তরুণদের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। স্কুলে প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে আলোচনা, সচেতনতামূলক কর্মসূচি, বৃক্ষরোপণ এবং স্থানীয় প্রাণীদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণের মাধ্যমে ছোটবেলা থেকেই দায়িত্ববোধ তৈরি করা যায়। গরমের দিনে বাড়ির বাইরে পরিষ্কার জলের পাত্র রাখা কিংবা কোনো আহত প্রাণীকে দেখে দায়িত্বশীল প্রাপ্তবয়স্ক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো, এ ধরনের ছোট উদ্যোগও অর্থবহ।
প্রাণী কল্যাণের জন্য আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি। প্রাণীকে বিনোদনের বস্তু বা নিছক সম্পদ হিসেবে না দেখে জীবন্ত সত্তা হিসেবে সম্মান করতে হবে। বন্যপ্রাণীর ক্ষেত্রে তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোনো প্রাণীকে শুধু উদ্ধার করলেই সমস্যার সমাধান হয় না, তার নিরাপদ আবাস ও স্বাভাবিক পরিবেশও নিশ্চিত করতে হয়।
বিশ্ব প্রাণী কল্যাণ দিবস তাই আমাদের কাছে একটি প্রশ্ন রাখে, আমরা কেমন পৃথিবী রেখে যেতে চাই? এমন একটি পৃথিবী, যেখানে মানুষের উন্নতির সঙ্গে অন্য প্রাণীদের জীবন বিপন্ন হবে, নাকি এমন একটি পৃথিবী, যেখানে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী নিরাপদে সহাবস্থান করতে পারবে? মানবিকতা শুধু মানুষের প্রতি আমাদের আচরণে প্রকাশ পায় না; অন্য প্রাণীর প্রতি আমাদের আচরণেও তার পরিচয় পাওয়া যায়। একটি অসহায় প্রাণীকে অকারণে কষ্ট না দেওয়া, আহত প্রাণীকে সাহায্যের আওতায় আনা, প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষা করা এবং প্রাণীর প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করা, এসবই হতে পারে আমাদের দৈনন্দিন মানবিকতার প্রকাশ।
তাই ৪ঠা অক্টোবর শুধু একটি স্মরণীয় দিন নয়, এটি আমাদের দায়িত্ব নতুন করে ভাবার দিন। পৃথিবী মানুষের পাশাপাশি অসংখ্য প্রাণেরও। সেই পৃথিবীকে নিরাপদ, সহনশীল ও বাসযোগ্য করে তোলার দায়িত্ব আমাদের সবার। প্রাণীর প্রতি মমত্ববোধ আসলে প্রকৃতি ও জীবনের প্রতি সম্মান। আর সেই সম্মানই পারে আগামী প্রজন্মের জন্য আরও সুন্দর পৃথিবী গড়ে তুলতে।
0 Comments