জ্বলদর্চি

ছেলেবেলার পড়া || নবনীতা দেব সেন

ছেলেবেলার পড়া

নবনীতা দেব সেন

মাননীয় ঋত্বিকবাবু,
আপনার ঐকান্তিক অনুরোধ ফেলতেও পারছি না, রাখতেও পারছি না, খুব করুণ অবস্থা আমার। কী যে পড়েছি? একেবারে ছেলেবেলা থেকে আরেকটু বড়ো হওয়া ছেলেবেলা পর্যন্ত বলি। প্রথম অক্ষর পরিচয় আমাদের রাঁধুনি কাম হাউসকিপার কাম আমার অবধায়ক, গুনিয়াভাইয়ের কাছে উড়িয়া অক্ষরে। তারপরে মায়ের কাছে, বাংলা আর ইংরিজি হরফ চেনার খেলা।

বাড়িতে ছেলেবেলার পড়ার কথা সহজে বলতে পারি, মায়ের কাছে বর্ণপরিচয়ের পাশাপাশি হাসিখুশি, হাসিরাশি দিয়ে শিক্ষা শুরু, ইংরিজিতে একটা খুব বড় রঙিন ছবিওলা অক্ষর পরিচয়ের বই ছিল। তাতে আই-তে একটি গোলাপী আইস্ক্রিম কোণের ছবি ছিল, লোভে পড়ে আমি সেটি চেটে ফেলেছিলুম বলে মা খুব হেসেছিলেন, আমার এখনো মনে দুঃখ আছে। একটি মোটা সোটা নার্সারি রাইমের মেরুন চামড়ায় বাঁধানো বই ছিল আমার, অনেক সাদা কালো ছবি দেওয়া। সেই ছবিগুলো রঙিন পেন্সিল দিয়ে রঙ করতে শিখিয়েছিলেন মা। যখন যে ছড়াটা শেখা হতো, সেই ছবিটা রঙ করা হতো। সেই বই আমার বড় মেয়েও পড়েছে, কিন্তু তারপরে কোথায় হারিয়ে গেছে।

মা দক্ষিণের বারান্দার সবুজ পাথরের চৌকাঠে বসে আমাকে 'শিশু' থেকে কবিতা পড়ে শোনাতেন, আর শোনাতেন রবীন্দ্রনাথের নিজের কণ্ঠের ছোটোদের কবিতা, গ্রামোফোনের রেকর্ডে। কি সুন্দর করে পড়া! শুনে শুনে আমার মুখস্থ হয়ে যেত। আমি সেই রকম করেই বলার চেষ্টা করতুম। এ তো গেল বাড়ির পড়াশুনো।

স্কুলে পড়েছি বিদ্যাসাগরের আখ্যানমঞ্জরী ১ম, ২য়, ৩য় ভাগ, আর লোহারাম শিরোরত্নের বাংলা ব্যাকরণ। ইশকুলে আমার সবচেয়ে প্রিয় বাংলার র‍্যাপিড রিডিং-এর পাঠ্য ছিল, রাজকাহিনী। প্রত্যেকটি কাহিনি আমার অন্তরে গেঁথে গিয়েছিল।

ইংরিজিতে স্কুলে ছিল নেসফিল্ডের ব্যাকরণ। আর বাড়িতে ছিল আমার জয়শ্রীদিদির কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া, ওদের লোরেটো ইস্কুলের পাঠ্য, হাইরোড টু লিটারেচার বইয়ের বিভিন্ন খণ্ড। আমাদের গোখেল স্কুলে বইটি পাঠ্য ছিল না, কিন্তু মা আমাকে পাঠ্যের বাইরে ওই বইটি পড়তে উৎসাহ দিতেন। দিদির ক্লাসে ওঠা হয়ে গেলে বইটা চলে আসতো আমার কাছে। সত্যি, আমার খুব ভালো লাগতো বইটি। ওতেই প্রথম পড়েছিলুম আঙ্কল টমস ক্যাবিনের গল্প। বইয়ের ছবিতে আঙ্কল টমের সেই ক্যাবিনের দেয়ালে আর চালে ছিল অদ্ভুত সুন্দর হলুদ গোলাপ ফুলের লতা। সেই থেকে আমার মাথায় ছিল হলুদ গোলাপ লতা দেখার বাসনা। পূর্ণ হল আমি যখন পঞ্চাশ পেরিয়েছি, ইতালিতে একটি ফেলোশিপে কিছুদিন কাটিয়েছিলুম, লেক কোমোর তীরে ছোট্টো একটি পাহাড়ি গ্রামে, বেলাজ্জিওতে, এক প্রাচীন প্রাসাদে, ভিলা সেরবেলনি তার নাম। ভিলার একটি দেওয়াল জড়িয়ে উঠেছিল হলুদ লতানো গোলাপের শোভা, দেখেই চিনেছি, এই তো সেই আঙ্কল টমস ক্যাবিনের ফুল!

আমি সহজ পাঠ পড়ে বড় হইনি, মেয়েদের সঙ্গে সহজ পাঠ পড়েছি। কিন্তু শিশুর (আর শিশু ভোলানাথের কিছু) সব কবিতাই মা আমাকে পড়ে শোনাতেন, শুনিয়ে শুনিয়ে মুখস্থ করাতেন। আবোল তাবোল, হযবরল, পাগলা দাশু, অবাক জলপান ইত্যাদিও পড়তে দিতেন মা-ই। সেও মুখস্থ হয়ে যেতো আপনিই। ছেলেবেলায় আমার বই পড়ার প্রবল ঝোঁক ছিল। প্রচুর ছোটো ছোটো বিলিতি গল্পের বই ছিল আমার, সেও জয়শ্রীদিদির ছেলেবেলাকার বই, ব্রার র‍্যাবিট আর ব্রার ফক্সের কাহিনির সেট। বাংলায় চমৎকার সব রংচঙে, মোটাসোটা পুজোবার্ষিকী বেরুতো, শিশুসাথী, আর দেব সাহিত্য কুটিরের। সেগুলো সবই আমাদের বাড়িতে আসতো, তাতে মা বাবার লেখা থাকতো বলে। বাড়িতে অবশ্যই ছিল ঠাকুরমার ঝুলি, ঠানদির থলে, ঠাকুরদাদার ঝোলা ইত্যাদি। ছবিগুলো পর্যন্ত মুখস্থ ছিল। আর একটু বড় হয়ে খুব ভাল লাগতো লীলা মজুমদারের লেখা। লীলা মজুমদারের নতুন যে বই বেরুত, বাবা আনিয়ে দিতেন। সেই সময়ে আশাপূর্ণাও ছোটোদের জন্য ভারি সুন্দর লিখতেন।

ছেলেবেলায় আমার প্রিয় লেখক ছিলেন বাবার আরেক বন্ধু, হেমেন্দ্রকুমার রায়। হেমেন্দ্রকুমার রায়ের সমস্ত বইগুলি আমার ছিল, বেরুলেই হেমেনকাকা আমাকে দিয়ে যেতেন। বিমল কুমার, জয়ন্ত মানিক, বাঘা রামহরি এদের সবাইকে আমার ঘরের লোক মনে হত। এমনকি 'হুমম' হুংকারের সুন্দরবাবুকেও। ওদের জন্যে আমার মাঝে মাঝে মন কেমন করতো।

এই য্যাঃ রাজকাহিনী ছাড়া অবন ঠাকুরের কথা তো লেখাই হয়নি। বুড়ো আংলা, নালক, ক্ষীরের পুতুল, সব বাদ? ক্ষীরের পুতুল আমার খুব ছোটোবেলা, বুড়ো আংলা আরেকটু বড় হয়ে, আর রাজকাহিনী আমার আরো খানিক বড় হওয়া ছোটোবেলা। আর বিভূতিভূষণ? পথের পাঁচালি বাদ? ছি ছি! সে আবার হয় নাকি? তা ছাড়া প্রেমেন্দ্র মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়? ঘনাদা, টেনিদা? (আমার ঘনাদাকে পছন্দ ছিল, টেনিদাকে ততটা নয়।) বাংলা শিশু সাহিত্য এতই ঐশ্বর্যময়, যা পেয়েছি, তার হিসেব করা এত সহজ নয়। তবে আমি যা কিছু পড়েছি, আমার কাছের বন্ধুরাও সেই সব বইই পড়েছে। বাংলায় গল্পের বই পড়া তখন চালু ছিল গোখেলের মতো ইংরিজি মাধ্যমের ইশকুলেও। লোরেটোতে ছিল না।

ছি ছি! বলা হয়নি ছোটোদের অপূর্ব পত্রিকাগুলির কথা। বলতে হবে বাবার সম্পাদিত পাঠশালা পত্রিকা, শিশু সাথী, রামধনু, মৌচাক, আনন্দবাজারের আর যুগান্তরের দুই চমৎকার ছেলেভুলোনো পাতা, যুগান্তরে স্বপনবুড়োর আসর, আর আনন্দবাজারে আনন্দমেলার মৌমাছির কথা? এগুলো আমাদের বাড়িতে সবই আসতো, এবং সবগুলোই আমার প্রাণ ছিল। কাগজ আসা মাত্রই সেগুলো না পড়ে ফেললে প্রাণ আনচান!

আমাদের ছেলেবেলায় স্কুলের বন্ধুরা মিলেই কাউন্ট অফ মন্টেক্রিস্টো, আ টেল অফ টু সিটিজ, ফ্রাংকেন স্টাইন, দ্য হাঞ্চব্যাক অফ নৎরদাম ইত্যাদি ছোটোদের বিদেশী ক্লাসিকস পড়তে পড়তে একদিন স্কুল পেরিয়ে বড়দের বই পড়ার মতন বড় হয়ে গেলুম।

প্রচণ্ড তাড়াহুড়োয় লিখছি। চিন্তার সময় নেই। ঋত্বিকবাবুর কাগজ আটকে আছে! ছেলেবেলার পড়া কত কিছুই যে বাদ পড়ে গেল! তখন যা কিছু পড়েছি সবটুকুই জীবনের ধন হয়ে প্রাণের মধ্যে সঞ্চিত রয়ে গিয়েছে। ভেবে দেখলে আশ্চর্য লাগে, কোনোটাই পুরোনো হবার নয়, সবগুলিই আবার ফিরে পড়ার বই। আজকের আমি অনেকটাই তৈরি হয়েছি ছেলেবেলার ওইসব বইয়ের মাল মশলায়।

প্রীতিসহ, নবনীতা দেব সেন। ২৪.০৫.২০১৯
🍂

Post a Comment

0 Comments