জ্বলদর্চি

সুপার প্যাঁক আর ক্যাপ্টেন ছটফটের মহা-অভিযান/শ্রী সৌমিত্র

সুপার প্যাঁক আর ক্যাপ্টেন ছটফটের মহা-অভিযান

শ্রী সৌমিত্র

হবি মিয়ার খামারবাড়িতে দুজন খুব অদ্ভুত বন্ধু ছিল। একজন হলো 'প্যাঁক প্যাঁক', একটা তুলতুলে হলুদ রঙের নাদুসনুদুস হাঁসের ছানা। সে ছিল ভীষণ শান্ত, আর সারাদিন পুকুরের জলে ভাসতে ভাসতে ভাবতো, "আহা! জীবনটা কত সুন্দর! জল ছাড়া দুনিয়াতে আর কোনো ভালো জিনিস হতেই পারে না।" অন্যজন হলো 'ছটফটে', একটা লালচে রঙের মুরগির ছানা। নাম যেমন, তার কাজও ছিল ঠিক তেমন! ছটফটে ছিল খামারের সবচেয়ে দুষ্টু ছানা। সে এক জায়গায় এক সেকেন্ডও স্থির থাকতে পারতো না। তার সারাদিনের কাজই ছিল নতুন নতুন বিপদ ডেকে আনা, এদিক সেদিক লাফিয়ে বেড়ানো, আর বুক ফুলিয়ে সবাইকে বলা, "আমি হলাম এই খামারের সবচেয়ে সাহসী বীর! আমি কাউকে ভয় পাই না!"
প্যাঁক প্যাঁক সবসময় তাকে সতর্ক করে বলতো, "ভাই ছটফটে, এত লাফিও না, একদিন পড়ে গিয়ে ঠিক ঠ্যাং ভাঙবে! তখন কিন্তু আমি বাঁচাতে যাব না।" কিন্তু ছটফটে মুরগির ছানা কি আর সেই কথা শোনে! সে হেসেই উড়িয়ে দিত।
একদিন সকালে ছটফটে একটা পুরোনো খবরের কাগজের ছেঁড়া টুকরো মুখে করে দৌড়ে এলো প্যাঁক প্যাঁকের কাছে। কাগজের ওপর একটা বিশাল বড় সোনালী ভুট্টার ছবি আঁকা ছিল। ছটফটে উত্তেজনায় চোখ বড় বড় করে বলল, "প্যাঁক প্যাঁক! দেখ! আমি একটা হারানো গুপ্তধনের ম্যাপ পেয়েছি! এই বিশাল জাদুকরী সোনার ভুট্টাটা লুকানো আছে খামারের একেবারে ওপারে, 'ভয়ংকর সবুজ জঙ্গলের' ঠিক মাঝখানে (আসলে সেটা ছিল হবি মিয়ার সাধারণ একটা বাঁধাকপির বাগান)। আজই আমরা অভিযানে যাব আর সেই গুপ্তধন উদ্ধার করে আনব!"
প্যাঁক প্যাঁক ম্যাপটা দেখে ভয়ে দুই পা পিছিয়ে গেল। সে আমতা আমতা করে বলল, "ওরে বাবা! আমি তো জলে বেশ আছি। শুকনায় বেশি হাঁটলে আমার চ্যাপ্টা পা ভীষণ ব্যথা করে। তাছাড়া ওখানে যদি শেয়াল বা অন্য কোনো ভয়ংকর কিছু থাকে? আমি বাবা ওসবের মধ্যে নেই।"
🍂
ছটফটে হো হো করে হেসে উঠল, "আরে ভিতুর ডিম! তুই সারাজীবন ওই পুকুরেই থাকবি নাকি? আমি থাকতে তোর কোনো ভয় নেই। আমি তোকে রক্ষা করব। চল আমার সাথে!" অগত্যা বন্ধুকে একা ছাড়তে না পেরে প্যাঁক প্যাঁক মনের অমতে, প্যাঁক প্যাঁক করতে করতে ছটফটের পিছু নিল।
তাদের রোমাঞ্চকর অভিযান শুরু হলো। তারা যখন 'ভয়ংকর সবুজ জঙ্গলে' মানে বাঁধাকপির বাগানে ঢুকল, বড় বড় পাতার কারণে চারদিক বেশ অন্ধকার লাগছিল। হঠাৎ তাদের সামনে একটা বিশাল সবুজ পাতা খসখস করে নড়ে উঠল। ছটফটে, যে একটু আগে নিজেকে বীর বলছিল, সে তো ভয়ে এক লাফ দিয়ে সোজা প্যাঁক প্যাঁকের পেছনে লুকিয়ে পড়ল। "ও... ওটা কী রে? জ-জ-জঙ্গলের ড্রাগন নাকি?" ছটফটে কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিস করে বলল।
প্যাঁক প্যাঁক সাহস করে উঁকি মেরে দেখল, একটা মোটা, গোলগাল শুঁয়োপোকা আপন মনে বসে বসে বাঁধাকপি চিবোচ্ছে। প্যাঁক প্যাঁক খিলখিল করে হেসে বলল, "তোর ভয়ংকর ড্রাগন তো দেখছি শুধু পাতা খায়!" ছটফটে ভীষণ লজ্জা পেয়ে গলা ঝেড়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, "হুম! আমি তো জাস্ট তোকে টেস্ট করছিলাম তুই ভয় পাস কিনা! আমি মোটেও ভয় পাইনি!"
জঙ্গল পার হয়ে তারা এসে পৌঁছালো একটা বিশাল কাদার গর্তের সামনে। গত রাতের বৃষ্টির জল জমে সেটা একেবারে 'কাদার মহাসাগর' হয়ে গেছে। প্যাঁক প্যাঁক তো কাদা দেখে আনন্দে আত্মহারা! সে ধপাস করে কাদার মধ্যে লাফিয়ে পড়ে খুশিতে সাঁতার কাটতে শুরু করল। কিন্তু ছটফটে মুরগির ছানা জলের ধারে দাঁড়িয়ে কাঁপতে লাগল। মুরগিরা জল আর কাদা একদম পছন্দ করে না!
ছটফটে বলল, "আমি... আমি এক লাফে এটা পার হয়ে যাব! দেখ আমার জাদু!" এই বলে সে চোখ বন্ধ করে এক বিশাল লাফ দিল। কিন্তু কিনারায় পৌঁছাতে না পেরে সে সোজা কাদার ঠিক মাঝখানে 'প্যাঁচাস' করে পড়ল! আঠালো কাদার মধ্যে আটকে গিয়ে সে চ্যাঁ চ্যাঁ করে কাঁদতে শুরু করল, "বাঁচাও! বাঁচাও! আমি কাদার সাগরে ডুবে যাচ্ছি! কাদা আমার সুন্দর লালচে পালকগুলো সব নষ্ট করে দিচ্ছে!"
প্যাঁক প্যাঁক তখন সাঁতার কেটে এগিয়ে গিয়ে ছটফটের ডানা ধরে অনেক কষ্টে টেনে তাকে ডাঙায় তুলল। ছটফটে তখন আপাদমস্তক কাদা মেখে একেবারে 'কাদার ভূত' হয়ে গেছে। তার আর কোনো অহংকার অবশিষ্ট নেই।
কাদার গর্ত পার হয়ে তারা অবশেষে সেই গুপ্তধনের জায়গায় পৌঁছাল। সত্যিই সেখানে খবরের কাগজের ছবির মতো একটা বড় শুকনো ভুট্টার ছড়া পড়ে ছিল! কিন্তু গুপ্তধনের পাহারাদার হিসেবে সেখানে এক ভয়ংকর বিপদ অপেক্ষা করছিল। ভুট্টার ঠিক পাশেই ঘুমাচ্ছিল খামারের সবচেয়ে রাগী প্রাণী— 'হুলো বিড়াল'!
হঠাৎ খচমচ আওয়াজে হুলো বিড়ালের কাঁচা ঘুম ভেঙে গেল। সে হাই তুলে, চোখ পিটপিট করে ছটফটে আর প্যাঁক প্যাঁকের দিকে তাকিয়ে জিভ চাটতে লাগল। ছটফটে তো ভয়ে একেবারে পাথর হয়ে গেল! তার 'সাহসী বীর' ভাব কোথায় যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেছে! সে চোখ বন্ধ করে কাঁপতে কাঁপতে ভাবতে লাগল, আজ বুঝি আর কোনোভাবেই রক্ষা নেই, বিড়ালের পেটে যেতেই হবে।
কিন্তু ঠিক এই মারাত্মক বিপদের সময় প্যাঁক প্যাঁকের ভেতর লুকিয়ে থাকা আসল সাহসটা জেগে উঠল। সে বুঝতে পারল যেভাবেই হোক আজ তার বোকা বন্ধুকে বাঁচাতে হবে। প্যাঁক প্যাঁক তার কাদা-মাখা ডানা দুটো বিশাল করে মেলে ধরল, নিজেকে যতটা সম্ভব বড় দেখানোর চেষ্টা করল। তারপর গলার সবটুকু জোর এক করে, তার জীবনের সবচেয়ে বিকট শব্দে ডেকে উঠল, "**প্যাঁক! প্যাঁক! প্যাঁক! প্যাঁক!**" একই সাথে সে তার ডানাগুলো এত জোরে ঝাপটাতে লাগল যে, একগাদা কাদা ছিটকে গিয়ে পড়ল হুলো বিড়ালের চোখে-মুখে!
বিড়ালটা এমন অদ্ভুত কাদা-মাখা আর বিকট আওয়াজ করা জন্তু জীবনেও দেখেনি। সে ভয় পেয়ে "ম্যাঁওওও!" করে এক বিশাল লাফ দিল এবং লেজ গুটিয়ে সেখান থেকে ভোঁ দৌড় দিল!
ছটফটে আস্তে আস্তে চোখ খুলে দেখল বিপদ একেবারেই কেটে গেছে। সে অবাক চোখে প্যাঁক প্যাঁকের দিকে তাকাল। যে হাঁসের ছানাকে সে সারাজীবন 'ভিতুর ডিম' ভেবে এসেছে, আজ সেই ভিতু হাঁসটাই তাকে এক সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাল!
ছটফটে মাথা নিচু করে, খুব নরম সুরে বলল, "প্যাঁক প্যাঁক, তুই আসলে সত্যিকারের হিরো। আমি শুধু মুখে বড় বড় কথা বলি, কিন্তু বিপদের সময় তুই-ই আমাকে বাঁচালি। তুই না থাকলে আজ আমার কী যে হতো! আজ থেকে তুই যা বলবি, আমি তাই শুনব। আর কখনো তোকে ভিতু বলব না।"
প্যাঁক প্যাঁক মুচকি হেসে বলল, "আর আমিও আজ বুঝলাম, ডাঙায় ঘোরাঘুরি করাটা অতটাও খারাপ নয়। আমার ভেতরেও যে এত সাহস আছে, সেটা আমি নিজেই জানতাম না! তবে চল, এবার গুপ্তধন নিয়ে বাড়ি যাই!"
দুষ্টু ছটফটে আর শান্ত প্যাঁক প্যাঁক মিলে সেই বিশাল ভুট্টার ছড়াটা টেনে টেনে মহানন্দে খামারে ফিরে এল। এই ছোট্ট এডভেঞ্চার তাদের দুজনকে পুরোপুরি বদলে দিল। ছটফটে বুঝতে পারল যে সত্যিকারের সাহস মানে শুধু বোকার মতো লাফিয়ে বেড়ানো নয়, বিপদে বন্ধুর পাশে দাঁড়ানো। আর প্যাঁক প্যাঁক বুঝতে পারল যে তার ভেতরেও অনেক সাহস লুকিয়ে আছে। সেই দিন থেকে খামারে তাদের জুটির নতুন নাম হয়ে গেল 'সুপার প্যাঁক আর ক্যাপ্টেন ছটফটে'!

Post a Comment

0 Comments