জ্বলদর্চি

আন্তর্জাতিক পরিচর্যা ও সহায়তা দিবস/দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে

আন্তর্জাতিক পরিচর্যা ও সহায়তা দিবস

দোলনচাঁপা তেওয়ারী দে 

আজ ২৯শে অক্টোবর, আন্তর্জাতিক পরিচয় ও সহায়তা দিবস। আমাদের সমাজে এই দিবসটির গুরুত্ব কি? আসুন তা সবিস্তারে জেনে নিই।
মানবিকতার নীরব আলোকবর্তিকা
পৃথিবী কেবল শক্তিমান মানুষের সাফল্যের ইতিহাসে গড়ে ওঠেনি, গড়ে উঠেছে অসংখ্য মানুষের নীরব যত্ন, নিরলস শ্রম এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসার ভিতের ওপর। যে হাত অসুস্থের কপালে স্নেহের পরশ বুলিয়ে দেয়, যে মানুষ বৃদ্ধের চলার পথে অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়, যে হৃদয় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের অসহায় মুহূর্তে সাহস জোগায় তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে, মানবসভ্যতার এক উজ্জ্বল অধ্যায়। এই পরিচর্যা ও সহায়তার মহৎ ভূমিকার স্বীকৃতি দিতেই আন্তর্জাতিক পরিচর্যা ও সহায়তা দিবসের তাৎপর্য আমাদের কাছে বিশেষভাবে মূল্যবান হয়ে ওঠে।  এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিচর্যা কোনও করুণা নয়, কোনও অনুগ্রহও নয়, এটি মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব, ভালোবাসা ও মর্যাদাবোধের এক অনিবার্য প্রকাশ। অসুস্থ মানুষ, প্রবীণ নাগরিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, শিশু কিংবা দৈনন্দিন জীবনে অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন হয় এমন মানুষের পাশে দাঁড়ানো একটি সুস্থ সমাজের অন্যতম প্রধান পরিচয়।
🍂
আমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন, যাঁদের শ্রম চোখে পড়ে না, অথচ তাঁদের অনুপস্থিতিতে সংসারের স্বাভাবিক ছন্দ ভেঙে পড়ে। পরিবারের অসুস্থ সদস্যের দেখাশোনা, বৃদ্ধ মা-বাবার ওষুধের সময় মনে রাখা, শিশুর খাওয়া-ঘুমের যত্ন নেওয়া কিংবা শয্যাশায়ী মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন পূরণ করা, এসব কাজের মধ্যেই মিশে থাকে অসংখ্য অপ্রকাশিত ত্যাগ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই দায়িত্ব পালন করেন পরিবারের নারীরা। তাঁদের শ্রমকে অনেক সময় ভালোবাসার স্বাভাবিক কর্তব্য বলে ধরে নেওয়া হয়, তার অর্থনৈতিক মূল্য, শারীরিক ক্লান্তি এবং মানসিক চাপ যথাযথ স্বীকৃতি পায় না। অথচ এই অদৃশ্য শ্রমের ওপর দাঁড়িয়েই অসংখ্য পরিবার প্রতিদিন এগিয়ে চলে।
পরিচর্যা মানে, শুধু খাবার তুলে দেওয়া কিংবা ওষুধ খাইয়ে দেওয়া নয়। পরিচর্যা মানে একজন মানুষের কথা মন দিয়ে শোনা, তাঁর অনুভূতিকে সম্মান করা, তাঁর সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে স্বীকার করা এবং অসহায়তার মুহূর্তেও তাঁর আত্মমর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা। অনেক সময় একটি আন্তরিক বাক্য, একটু ধৈর্য, কিংবা পাশে নীরবে বসে থাকার মধ্যেও এমন সান্ত্বনা থাকে, যা কোনও মূল্যবান উপহারের চেয়ে কম নয়। মানুষের শরীরের চিকিৎসা যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন মনের আশ্রয় এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা। তবে পরিচর্যার সমস্ত দায়িত্ব কেবল পরিবারের কোনও একজন সদস্যের, বিশেষত নারীর, কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়। এই দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে পরিবারের সব সদস্যকে, পাশাপাশি এগিয়ে আসতে হবে সমাজ ও রাষ্ট্রকেও। প্রশিক্ষিত পরিচর্যাকর্মীর যথাযথ পারিশ্রমিক, কর্মক্ষেত্রে তাঁদের নিরাপত্তা, বিশ্রামের সুযোগ এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি। পরিচর্যার সঙ্গে যুক্ত মানুষেরও বিশ্রাম, সুস্থতা ও মানসিক স্বস্তির অধিকার রয়েছে। যিনি অন্যের যত্ন নেন, তাঁর যত্ন নেওয়ার কথাটিও আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। বর্তমান পৃথিবীতে একদিকে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে বহু পরিবার ছোট হয়ে আসছে এবং কর্মজীবনের ব্যস্ততা ক্রমশ বাড়ছে। ফলে প্রবীণ ও বিশেষ সহায়তার প্রয়োজন এমন মানুষের পরিচর্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে সহজলভ্য স্বাস্থ্যপরিষেবা, স্থানীয় পরিচর্যাকেন্দ্র, প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা এবং পরিবারকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা দরকার। প্রযুক্তি কিছু ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু কোনও যন্ত্রই মানুষের আন্তরিকতা, সহমর্মিতা ও ভালোবাসার সম্পূর্ণ বিকল্প হতে পারে না। এই দিবসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, সহায়তা গ্রহণ করা দুর্বলতার লক্ষণ নয়। জীবনের কোনও না কোনও পর্যায়ে প্রত্যেক মানুষই অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন অনুভব করেন। আজ যে মানুষটি অন্যের হাত ধরে পথ চলতে শেখাচ্ছেন, কাল তাঁরও হয়তো কারও হাতের প্রয়োজন হবে, তাই সাহায্য দেওয়া ও গ্রহণ করার মধ্যে কোনও উচ্চ-নীচের সম্পর্ক থাকা উচিত নয়। এখানে থাকা উচিত পারস্পরিক সম্মান, সমমর্যাদা এবং মানবিক সংযোগ। আমরা যদি সত্যিই এই দিনের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে চাই, তবে শুধু আনুষ্ঠানিক উদ্‌যাপনে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নিজের পরিবারের প্রবীণ সদস্যটির সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো, পরিচর্যায় নিয়োজিত মানুষের শ্রমকে স্বীকৃতি দেওয়া, প্রতিবেশীর অসুস্থতার খবর নেওয়া কিংবা সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে এমন মানুষের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা, ছোট ছোট এই কাজগুলিই বৃহত্তর পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। পাশাপাশি পরিচর্যাকর্মীদের অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নেও আমাদের সচেতন হতে হবে। আন্তর্জাতিক পরিচর্যা ও সহায়তা দিবস তাই নিছক একটি বিশেষ দিন নয়, এটি আমাদের বিবেকের কাছে রাখা এক নীরব প্রশ্ন, আমরা কেমন পৃথিবী গড়তে চাই? এমন এক পৃথিবী, যেখানে অসুস্থতা, বার্ধক্য কিংবা প্রতিবন্ধকতা মানুষকে একাকিত্বের অন্ধকারে ঠেলে দেয়, নাকি এমন এক সমাজ, যেখানে প্রত্যেকে প্রয়োজনের সময় সম্মানজনক সহায়তা পায়? মানবিকতার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় তখনই, যখন আমরা দুর্বল মুহূর্তে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়াতে শিখি। পরিচর্যার মধ্যে কোনও ক্ষুদ্রতা নেই, রয়েছে অসীম মহত্ত্ব। সহায়তার মধ্যে কোনও পরাজয় নেই, রয়েছে মানুষের সঙ্গে মানুষের গভীরতম বন্ধন। আসুন, এই দিবসে আমরা এমন এক সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করি, যেখানে যত্ন হবে সম্মানের, সহায়তা হবে অধিকারের এবং ভালোবাসা হবে দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক ভাষা, কারণ, যে পৃথিবী পরিচর্যা করতে জানে, সেই পৃথিবীই শেষ পর্যন্ত মানুষ হয়ে উঠতে পারে।

Post a Comment

0 Comments