জ্বলদর্চি

সেগুন-শালের অরণ্যগাথা/পর্ব ৮/মৈত্রেয়ী চট্টোপাধ্যায়

সেগুন-শালের অরণ্যগাথা
পর্ব ৮
মৈত্রেয়ী চট্টোপাধ্যায় 

কানহার ঘাস-সমুদ্র

"এ এক আলাদা জীবন, যারা ঘরের দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ থাকিতে ভালোবাসে না, সংসার করা যাদের রক্তে নাই, সেই সব বারমুখো, খাপছাড়া প্রকৃতির মানুষের পক্ষে এমন জীবনই তো কাম্য।" - বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।

এ কথা সত‍্য, জঙ্গল কোন এক মন্ত্রগুপ্তি বলে ঘোর সংসারীকেও বারমুখো করতে পারে। বারবার তাই ছুটে যাওয়া। পেঞ্চ-কানহার সেই দীর্ঘ অরণ্য-সেতু পেরিয়ে আমাদের  গাড়িটি যখন কানহার ‘খাটিয়া গেট’ দিয়ে ভেতরে ঢুকল, এক নিমেষে চোখের চেনা পরিধিটা অনেকটা বদলে গেল। তাডোবার তপ্ত রুক্ষতা কিংবা  পেঞ্চের পাথুরে নদীখাত— কোনো কিছুর সাথেই এই নতুন পৃথিবীর মিল নেই। আমাদের সামনে তখন মাইলের পর মাইল জুড়ে দিগন্ত বিস্তৃত এক সবুজ সমুদ্র, যার নাম কানহার মিডোজ বা ঘাসজমি। ভোরের হালকা কুয়াশার আস্তরণ সরিয়ে সূর্যের প্রথম আলো যখন সেই ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলোর ওপর এসে পড়ে, মনে হয় যেন লক্ষ্য কোটি হিরের কুচি কে যেন ছড়িয়ে দিয়েছে এই অরণ্য-সাম্রাজ্যে।


বুদ্ধদেব গুহের 'মাধুকরী' উপন্যাসে অরণ্যপ্রকৃতির রূপ, শীতের জঙ্গল, কানহার বনের মেঠো পথ, গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় বনের তীব্র কটুগন্ধ ও গাছপালার যে ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তা পুরোটাই মিলে যায়।

রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর দ‍্য জাঙ্গল বুক উপন্যাসের মূল চরিত্র ও অনুপ্রেরণা পেঞ্চ হলেও, তার আসল দৃশ্যপট কানহা বলেই মনে করা হয়। এখানকার আকাশছোঁয়া সুদেহী শাল গাছের জঙ্গল আর তার মাঝে লুকিয়ে থাকা সুবিস্তৃত উপত্যকাগুলো দেখলেই মনে আসে চঞ্চল মোগলি আর তার বুনো সাঙ্গপাঙ্গদের কথা। মধ্য ভারতের এই চিরহরিৎ শাল বন, বিস্তীর্ণ ঘাসজমি এবং পাহাড়ি নদীর যে বর্ণনা তিনি দিয়েছিলেন কানহার প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং ঘন জঙ্গল হুবহু কিপলিংয়ের কল্পিত সেই রহস্যময় বনভূমির মতোই। 

বাতাসে একটা অদ্ভুত ভেজা মাটির আর বুনো ঘাসের মিলিত গন্ধ ভেসে আসছে। জিপসির ইঞ্জিনটা বন্ধ করতেই নিরবচ্ছিন্ন এক নিস্তব্ধতা আমাদের গ্রাস করল। এ যেন এক জীবন্ত, স্পন্দমান অরণ্যের ধ্যানমগ্নতা।

কানহার এই সুবিস্তৃত ঘাসজমিগুলোর পেছনে কিন্তু লুকিয়ে আছে এক গভীর সত্য। আজ যেখানে আমরা মাইলের পর মাইল শুধু বুনো ঘাসের ঢেউ খেলানো সমুদ্র দেখছি, বহু দশক আগে সেখানে কিন্তু মানুষের বসতি ছিল, ছোট ছোট আদিবাসী গ্রাম ছিল। বন্যপ্রাণী ও বাঘেদের অবাধ বিচরণের স্বার্থে সরকার যখন অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে সেই গ্রামগুলোকে জঙ্গলের বাইরে পুনর্বাসন দেয়, প্রকৃতি তখন মানুষের ছেড়ে যাওয়া সেই খালি জমিকে পরম মমতায় নিজের করে নেয়। জন্ম নেয় এই ‘মেডোজ’। মানুষের ত্যাগ আর প্রকৃতির ভালোবাসার এই মেলবন্ধনই আজ কানহাকে ভারতের অন্যতম সেরা ব্যাঘ্র-প্রকল্পে পরিণত করেছে।
আমাদের গাড়ি যখন সেই ঘাস-সমুদ্রের মাঝখান দিয়ে যাওয়া মেঠো পথ ধরে এগোচ্ছিল, দূর দিগন্তে দেখা গেল এক আশ্চর্য কোলাহল। ঝাঁকে ঝাঁকে চিতল হরিণ আর সম্বর চরে বেড়াচ্ছে সেই মাঠে। পুরুষ সম্বর হরিণগুলো তাদের বিশাল রাজকীয় শিং উঁচিয়ে চড়া রোদে স্থির দাঁড়িয়ে আছে, যেন তারা এই বনের প্রহরী। কানহার এই খোলা প্রান্তরেই বাঘেদের শিকার করার কৌশল সবচেয়ে নিখুঁত হয়। উঁচু ঘাসের আড়ালে নিজের ডোরাকাটা শরীরটাকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে রেখে, বাতাসের অভিমুখ মেপে কীভাবে একটা বাঘ শিকারের দিকে এগিয়ে যায়— তা প্রকৃতির এক চরম ও নিষ্ঠুর গণিত বলা যায়।
হঠাৎ সেই শান্ত হরিণের পালের মধ্যে একটা তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হলো। একসাথে বেশ কয়েকটি চিতল হরিণ পিছনের পায়ে ভর দিয়ে খাড়া হয়ে দাঁড়াল। বনের এক কোণ থেকে ভেসে এলো এক অদ্ভুত, গম্ভীর সতর্কবার্তা— ‘ধাঁক... ধাঁক!’ বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও জঙ্গল সাফারিতে গাইডদের মতে, বনের সব প্রাণীর মধ্যে সম্বরের দেওয়া সতর্কবার্তা বা অ্যালার্ম কলকে সবচেয়ে নির্ভুল এবং নির্ভরযোগ্য মনে করা হয়। সম্বর হরিণ সাধারণত শিকারির উপস্থিতি সম্পূর্ণ নিশ্চিত না হয়ে বা সরাসরি চোখ দিয়ে তার নড়াচড়া না দেখে অ্যালার্ম কল দেয় না। তাই সম্বরের ডাককে বাঘ খোঁজার অন্যতম সেরা চাবিকাঠি ধরা হয়। সম্বরের সেই গভীর অ্যালার্ম কল জানান দিল, গভীর সমুদ্রের শান্ত জলের নিচে যেমন হাঙর লুকিয়ে থাকে, ঠিক তেমনই এই শান্ত ঘাসের ঢেউয়ের আড়ালে নিঃশব্দে পা ফেলছে এই বাঘ-মহালের আসল অধিপতি।
ছবি - অভিজ্ঞান ঘোষ

সবুজ ঘাসের চাদরে তখন একটা হালকা কম্পন। মেঠো পথের ধুলো উড়িয়ে জিপসির চালক গিয়ারটা বদলে নিলেন। কিছুক্ষণ পরেই চিত্ত চাঞ্চল্যর অবসান ঘটিয়ে বেরিয়ে এলো বিশালদেহী এক রয়েল বেঙ্গল টাইগার। হৃৎকম্পনের শব্দ গোনা যাচ্ছে তখন। এগিয়ে আসছে আমাদের জিপসির দিকে । বেগতিক দেখে গাইড গাড়ি পিছনোর নির্দেশ দেয়। যতই গাড়ি পিছিয়ে যায়, ততই সে এগিয়ে আসে আমাদের দিকে। কিছুক্ষণ এভাবে চলার পরে সে হঠাৎ বসে পড়ল সামনে। কপাল ঠুকে ড্রাইভার পিছনে যাওয়ার উপক্রম করতেই হলো আর এক বিপত্তি। পিছনে তাকিয়ে দেখি আর একটি অতিকায় বাঘ পাশের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে পিছনে এসে উপস্থিত হয়েছে । কি করণীয় সঠিক কারুরই জানা নেই। সেদিনের কথা মনে পড়লে আজও শিহরিত হতে হয়। গাড়ি দাঁড়িয়ে রইল । এক একটা মুহূর্ত যেন এক একটা দীর্ঘ আলোকবর্ষ। মনে মনে প্রার্থনা করা ছাড়া কোনও বিকল্প খুঁজে পেলাম না ।  (ক্রমশ...)
🍂

Post a Comment

0 Comments