জ্বলদর্চি

অণুগল্প : গুম : মন্দিরা মর্ম্মু

অণুগল্প 

গুম

মন্দিরা মর্ম্মু

সেদিন রাতে হালকা বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো। চোখটা জানালার কাঁচের ওপারে পড়তেই আমি তৎক্ষণাৎ ফ্যানটা অফ করে দিলাম কেননা রোজকার এই ফ্যানের শব্দে কানটা জ্বলে উঠেছিল। আমি অন্য শব্দ শুনতে চাইছিলাম। এখন আমি বৃষ্টির হাসি-কান্না উপভোগ করতে চাইছিলাম। একাকী জীবনে খুব কমই মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পাই। তাই আজকাল আমি প্রকৃতির কণ্ঠ শোনার জন্য উৎকণ্ঠিত হয়ে থাকি। যেমন - বাতাসের তীব্র গতিশব্দ,গাছেদের মচমচানি,বৃষ্টির শব্দ আর রাতের টুংটাং। বৈচিত্র্যময় অপ্রাকৃতিক শব্দের  আয়োজন করে এই রাত, গভীর রাত।
তারপর কখন ঘুম এসে সকালে পালিয়ে যায় টেরই পাওয়া যায় না। এভাবেই দিন কেটে যায়। সকাল দশটায় অফিসে চলে যাই ফের ফিরে আসি বিকেল পাঁচটা। তারপর থেকে এক্কেবারে একা...একা থাকি রাতে। মাঝেমাঝেই উদ্ভট সব স্বপ্ন এসে ভীড় করে। ঘুম ভেঙে যায়, তারপর আধোঘুমে  স্বপ্নটা আবার দেখার চেষ্টা করি কিন্তু না! কখনোই পুরো হয়না। কিন্তু কখনো স্বপ্ন আর বাস্তব গুলিয়ে ফেলি নি । তবে সেদিন স্বপ্ন আর বাস্তব গুলিয়ে ফেললাম। সেদিন থানার বড়বাবুর মতোই আমারও সবকিছু তালগোল পাকিয়ে গেল, যেদিন শুনলাম—বাড়িওয়ালা সদ্যপ্রয়াত ড. সমরেশ দাসের পাগলি মেয়েটি নিখোঁজ হয়েছে। মেয়েটি কি সত্যিই হারিয়ে গেল? নাকি তাকে গুম করা হলো? নাকি খুন? মেয়েটিকে পাগলি বানানোর চেষ্টায় বিফল হয়ে হয়তো বা...! একদিন যখন তার সৎ মা মেয়েটিকে মারতে লাগল সে কোনো রকমে ব্যথা চেপে দোতলায়  উঠে এসেছিল আমার রুমে, আশ্রয় নিতে। সেদিন আমি তা দিতে পারিনি হিড়হিড় করে টেনে নামিয়ে নিয়ে গিয়েছিল তাকে। তবে অনেকের দাবী মেয়েটিকে নাকি একেবারে জরাজীর্ণ জুবুথুবু অবস্থায় ছাদে ধীর গতিতে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়।
🍂
তখন বাজে একটা বা দুটো। গভীর রাত। খাটে এপাশ ওপাশ করছিলাম। হঠাৎ যেন মেঝে থেকে উঠে এল আওয়াজটা। তারপর আওয়াজটা উঠে এলো এক্কেবারে আমার কানের কাছে, আমার বুকের উপর। হাঁসফাঁশ  করে নিঃশ্বাস ফেলছে। অদ্ভুত জীবন্ত নিঃশ্বাস। আচমকা চোখ খুলে গেলো। আমি খুব শান্তভাবে চোখ খুললাম একদম ধড়ফড় করলাম না। নাঃ কোথাও কিছু নেই, আমার আশেপাশে কেউ নেই  চার দেওয়ালের মাঝে শুয়ে আমি শান্ত চোখে তাকিয়ে আছি। ঠিক যেমন মেয়েটির চোখ দুটিকে দেখেছিলাম অসহায়,ক্লান্ত  ঠিক তেমন নিজের চোখকে মনে হতেই শরীরে শিহরণ বয়ে গেল। তারপর উঠে তাড়াতাড়ি আলো জ্বাললাম কিন্তু আগের মতোই কাউকে দেখতে পেলাম না,কাউকে না। কেবল এক ক্লান্ত, অবসন্ন, বিধ্বস্ত আত্মার মতো ফিনফিনে এক শরীর দেখলাম খাটের উল্টো পাশে -
কয়েকদিন হল আমি এখন আর জানালা খুলে বাইরে দেখি না, যদি বাইরেটা ‘আমাদের’ দেখে ফেলে তাই…

Post a Comment

0 Comments