জ্বলদর্চি

চা /ভাস্করব্রত পতি

বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১৪৪
চা

ভাস্করব্রত পতি

"টিপাই টিপাই টিপাই টিপাই টিপাই টিপাইরে 
আহা রাম রাম দু'টি পাতা একটি কুঁড়ি
সবুজ বাগানে 
এই সবুজ বাগানে
টিপাই টিপাই টিপাই টিপাই টিপাই টিপাইরে
জাহাজ চড়ে যে এই চা যাবে রে
জার্মান যাবে জাপান যাবে
আর লণ্ডন যাবেরে....."! 
চা নিয়ে এতো নস্টালজিক গান বাংলা সিনেমায় নেই বললেই চলে। 'ধনরাজ তামাং' সিনেমায় আরতি মুখার্জির গাওয়া এই গানটি আজও মনে করিয়ে দেয় 'দুটি পাতা একটি কুঁড়ি'কে ঘিরে আবহমান সংস্কৃতি, শিল্প, ঐতিহ্য, জীবনযাপন আর ইতিহাসের বিবরণ। দুটি পাতা একটি কুঁড়ি, ছবি - নরসিংহ দাস

চিনাদের কাছে একসময় চা'কে মনে করা হত ভগবানের দান হিসেবে। খ্রিস্টপূর্ব ২৭৩৭ এ চিনে প্রথম চা আবিষ্কৃত হয়। সেসময় চিন সম্রাট শেন নাঙ সস্ত্রীক পাহাড়ি পথে যাচ্ছিলেন। তখন যেতে যেতে তাঁরা খুব তৃষ্ণার্ত হন। সেই সময় টুপ করে একটা গাছের পাতা তাঁর পায়ে পড়ে। সেখানে কোনও জল ছিল না। বাধ্য হয়ে সেই রসালো সবুজ পাতাকেই গায়ের সব শক্তি দিয়ে নিংড়ে রস বার করে খেলেন। খুব তেতো স্বাদ! কিন্তু দেহে শক্তি পেলেন। তাঁর বিশ্বাস হল, এই পাতা এলেবেলে পাতা নয়। রাজানুগ্রহে শুরু হল চায়ের ব্যবহার। এরপর এই চায়ের সংস্কৃতি এশিয়ান দেশগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে ধীরে ধীরে। এখন তো সারা বিশ্বে এর প্রভাব অতুলনীয়। ঘুম থেকে উঠে এবং ঘুমোতে যাওয়ার সময়, চায়ের সাথে চক্কর লেগেই রয়েছে। পাড়ার রোয়াকে বসে আয়েসী চা পান কিংবা গুমটি দোকানের চায়ের আড্ডার জনপ্রিয়তা অমূল্য। বাড়ির সকলে বসে চানাচুর, তেলে ভাজা সহযোগে চা খাওয়ার গুরুত্বই আলাদা। কবির লেখনিতে ধরা দিয়েছে --
'যদি মিথ্যে মনে হয় সব পুরোনো কথা
যদি চায়ের কাপেতে জমে নীরবতা
তবে বুঝে নিও চাঁদের আলো কত নিরূপায়'। 

ইতিহাস বলে, ১৬৫৮ সালে প্রথম চা বিক্রি করেন টমাস গারওয়ে। ১৭৭৬ সালে ইংরেজ উদ্ভিদবিজ্ঞানী স্যার জোসেফ ব্যাংক ভুটান এবং সংলগ্ন এলাকার মাটি, জলহাওয়া ও আবাদ পদ্ধতির বিশ্লেষণ করে কিছু বিশেষজ্ঞের সুপারিশসহ চা চাষের জন্য একটি দীর্ঘ প্রস্তাব জমা দেন। সেই প্রস্তাবে ভারতের মাটিকে চা চাষের আদর্শ জায়গা বলে উল্লেখ করেন। সেই প্রস্তাবমতো ১৭৮০ সালে ভারতে চিনা চা বীজ রোপণ করে প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে চায়ের চাষ করেন রবার্ট কিড।
চায়ের বাগানে চায়ে চুমুক

১৮২৩ সালে স্কটিশ রবাট ব্রুস আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় চায়ের জঙ্গল আবিষ্কার করেন। সেখানে ১৮৩৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্যিকভাবে প্রথম চায়ের চাষ শুরু করে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, পূর্ব ভারতে চায়ের প্রসারের কাজে অগ্রগণ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন দেওয়ান মণিরাম দত্ত বড়ুয়া। আরও ছয় বছর পর ১৮৪১ সালে দার্জিলিংয়ে চা চাষ শুরু হয় সিভিল সার্জেন ড. ক্যাম্পবেলের উদ্যোগে। আর বাণিজ্যিকভাবে এখানে চায়ের উৎপাদন শুরু হয় ১৮৫৬ সালে। ধীরে ধীরে বাড়ছিল চা চাষের প্রচার ও প্রসার। ফলে ক্রমশঃ প্রয়োজন পড়ে চা কেন্দ্রিক সংস্থা স্থাপনের। তাই ১৮৮১ তে ভারতের বুকে প্রতিষ্ঠিত হয় 'ইন্ডিয়ান টি অ্যাসোসিয়েশন'। 

ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট চা রপ্তানির ওপর 'সেস' বসাতে ইন্ডিয়ান টি সেস বিল পাশ করে ১৯০৩ সালে। এর ফলে পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে ইন্ডিয়ান টি কন্ট্রোল অ্যাক্ট পাস হয়। যা ১৯৫৩ তে নতুন করে চা আইন হিসেবে পরিচিত হয়। এই আইনের দরুন গঠিত হয় চা পর্ষদ বা টি বোর্ড। যার সদর দপ্তর অবস্থিত কলকাতাতে। চায়ের রাসায়নিক উপাদান বিশ্লেষণে উদ্যোগী হয়েছিলেন ই এ এইচ রবার্টস। তিনি লন্ডনের 'দি ইন্ডিয়ান টি অ্যাসোসিয়েশন ইন বাটলারস্ ভারফ'-এর সঙ্গে ১৯৪০ এবং ১৯৫০ দশকে জড়িয়ে ছিলেন বিশ্লেষণী রসায়নের অন্যতম ভারপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী হিসেবে। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল 'ব্ল‍্যাক টি'। তিনি গবেষণা করে বলেন, ব্ল‍্যাক টি'র স্বাদ এবং গন্ধের জন্য দায়ী 'ফেনল' জাতীয় রাসায়নিক যৌগ। এতে থাকে দুটি ফেনল গোষ্ঠীর রাসায়নিক যৌগ, 'থিয়াফ্লেভিনস' এবং 'থিয়ারুবিগিনস'। আর চায়ের সবুজ পাতায় থাকে 'ক্যাটেচিনস' যৌগ।
পাহাড়ি ঢালে এভাবেই হয় চায়ের চাষ

আমাদের দেশে উৎপাদনকারী অঞ্চলের নামে চায়ের নামকরণ করা হয়ে থাকে। যেমন - আসাম চা, দার্জিলিং চা, নীলগিরি চা। আর ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের প্রকারভেদে তিনরকম চা অর্থোডক্স টি, সি টি সি টি (Crush. Tear and Curl) এবং গ্রিন টি মেলে বাজারে। এখন বিভিন্ন দেশে 'মশলা চা' খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। চিরাচরিত চা তৈরির বদলে ইদানিং খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে 'টি ব্যাগ'। চটজলদি চা পেতে কেবল গরম জলে টি ব্যাগ ডোবালেই চা তৈরি। আর সেইসাথে বিভিন্ন ফ্লেভারের চা যেমন এলাইচি টি, জেসমিন টি, লেমন টি, অ্যাপেল টি, পিচ টি, ওসিমাম টি ইত্যাদিও রসনাতৃপ্ত করতে হাজির। তবে চা মূলত তিন রকমের। 'কালো চা' বা 'ব্ল্যাক টি' তৈরি হয় 'অ্যাসামিকা' জাতের পাতা থেকে। এদের পাতা গাঁজানো  (Fermentation) হয়। সারা পৃথিবীর ৭৫ শতাংশ চায়ের বাজার 'ব্ল‍্যাক টি'র দখলে। 'ব্ল‍্যাক টি'-র মোট চাহিদার সিংহভাগই মেলে ভারতে। ১৯৮৯ সালে সারা পৃথিবীতে বিক্রি হয়েছিল ২৪ লক্ষ টন চা। তার মধ্যে সবুজ চা ছিল ৫ লক্ষ টন আর ১৯ লক্ষ টন ছিল কালো চা। চিন, জাপান এবং তাইওয়ান 'সবুজ চা' বা 'গ্রীন টি'র প্রধান উৎপাদক। এই চায়ের পাতা গাঁজানো হয়না। এছাড়াও রয়েছে 'উলং টি'। এদের পাতা আংশিক গাঁজানো হয়ে থাকে। এটির প্রধান উৎপাদক চিন এবং তাইওয়ান। চায়ের জনপ্রিয়তাকে মান্যতা দিয়ে প্রতি বছর ২১ মে তারিখটি আন্তর্জাতিক চা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
ছায়াবৃক্ষের তলায় চায়ের বাগান

ইংরেজিতে চা'কে বলা হয় টি (tea)। বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ চা উৎপাদক দেশ চিনে ‘টি’-এর উচ্চারণ ছিল ‘চি’। পরবর্তীতে তা হয়ে যায় ‘চা’। গ্রিকদেবী 'থিয়া'র নামানুসারে চায়ের গণ Theaceae করা হয়েছে। আর এর বিজ্ঞানসম্মত নামকরণেও 'থিয়া' এসেছে।
Thea assamica 
Thea bohea 
Thea cantonensis 
Thea chinensis 
Thea cochinchinensis
Thea grandifolia
Thea olearia 
Thea oleosa 
Thea parvifolia 
Thea sinensis 
Thea viridis 
Theaphylla cantonensis
তবে চায়ের আরও কিছু প্রজাতির বিজ্ঞানসম্মত নাম মেলে। যেমন -
Camellia sinensis
C. angustifolia 
C. arborescens 
C. assamica 
C. dehungensis 
C. dishiensis
C. longlingensis 

চায়ের ছোট চারাগুলি ২০ সেন্টিমিটার দীর্ঘ হয়। তখন চা বাগানে এদের সারিবদ্ধভাবে দেড় মিটার অন্তর রোপণ করা হয়। কোনও কোনও চা গাছ প্রায় ৬ মিটার বা ২০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। যাতে সহজে গাছ থেকে পাতা তোলা যায় তার জন্য গাছগুলিকে দেড় মিটার বা ৪ ফুটের বেশি বাড়তে দেওয়া হয় না। নিয়মিত ছাঁটার ফলে গাছগুলি ঘন ঝোপ আকারের হয়। চা'বাগানে ছায়াপ্রদানকারী বৃক্ষ লাগানো হয়। চারা রোপণের ২-৩ বছর পরেই চা পাতা তোলার উপযোগী হয়ে ওঠে। গড়ে ৩০-৪০ বছর ঐ গাছ থেকে চা পাতা সংগ্রহ করা যায়। চা চাষের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত (১৭৫ - ২৫০ সেন্টিমিটার) প্রয়োজন। কিন্তু খেয়াল রাখতে হয় যাতে গাছের গোড়ায় জল জমা না হয়। 

ক্রান্তীয় মৌসুমী জলবায়ু অঞ্চলে চা চাষ হলেও উপক্রান্তীয় জলবায়ু এলাকাতেও চায়ের চাষ হচ্ছে। উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এলাকা দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, উত্তর দিনাজপুর, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার ছাড়াও দক্ষিণবঙ্গের জেলাতেও চায়ের চাষ হচ্ছে ইদানিং। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার খড়গপুর আই আই টি চত্বরের ২০ একর জমিতে চা চাষ হচ্ছে। ১৯৯৭ সালে এখানে সমতলে চা চাষ শুরু করেছিলেন খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের শিক্ষক বিজয়চন্দ্র ঘোষ। বর্তমানে এখানকার এগ্রিকালচার অ্যান্ড ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ সহ আই আই টি খড়গপুরের ইঞ্জিনিয়ারিং, কেমিক্যাল, মেকানিক্যাল, বায়োটেকনোলজি সহ আরও কয়েকটি বিভাগ মিলে উন্নতমানের চা প্রস্তুতকারক মেশিনও তৈরি করেছে। বাঁকুড়া, পুরুলিয়াতেও চা চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।  

চা আমাদের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে গেছে। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত গতানুগতিক খাবারের সাথে চা হয়ে উঠেছে অন্যতম ভালোবাসার সঙ্গী। কবির কল্পনায় চা ধরা দিয়েছে এভাবে -- 'আলমোড়া ভাঙা স্মৃতির সকালে / ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা / এই বুঝি ভালোবাসা'। চা শিল্প আজ একটি অন্যতম অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। এই চা বাগানকে কেন্দ্র করে বহু মানুষের জীবন জীবিকা আবর্তিত। সেইসব কাহিনি নিয়েই গড়ে উঠেছে মিথ। বিখ্যাত লোকগান "চল মিনি আসাম যাবো / দেশে বড় দুখ রে / আসাম দেশে রে মিনি চা বাগান ভরিয়া / চল মিনি আসাম যাব / কুড়ল মারা যেমন তেমন, / পাতা তুলা কাম গো- / কুড়ল মারা যেমন তেমন / পাতা তুলা কাম গো / হায় যদুরাম / ফাঁকি দিয়া পঠাইলি আসাম" সেই দুঃখের কথাই বিধৃত করে। আবার মহানায়ক উত্তমকুমার অভিনীত 'ধনরাজ তামাং' সিনেমার একটি গানও চা বাগানের কাহিনি নিয়েই আবর্তিত। সেই গানের মাধ্যমে চা'বাগানের সাথে মানবজীবনের সম্পর্ক, দুঃখ কষ্ট, টানাপোড়েন আবর্তিত হয়েছে নিখুঁতভাবে। 
"ধনরাজ তামাং, একটি শুধু নাম
যতদিন এ হিমালয় থাকবে
তার কথা যে সবাই মনে রাখবে।
একটি শুধু নাম, ধনরাজ তামাং
সিংতম এই চায়ের বাগান পাহাড়েরই কোলে
চিকন চিকন পাইন পাতা তার কথা যে বলেরে
হিমেল হাওয়ায় দোলে।
একটি শুধু নাম, ধনরাজ তামাং
পাহাড়িয়া ঝোরা যে ওই ঝিরিঝিরি ঝরে
ধনরাজের কথা ভেবে শুধুই কেঁদে মরে রে
তাঁকেই মনে পড়ে।
একটি শুধু নাম, ধনরাজ তামাং"। 

আজ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির 'চায়ে পে চর্চা' তো বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। ভারতের এই যশস্বী প্রধানমন্ত্রী অতীতে গুজরাটের ভাবনগর রেলস্টেশনে চা বিক্রি করতেন। সেই চা ওয়ালা প্রধানমন্ত্রী আজ সারা বিশ্বের সমীহ আদায় করে নিতে পেরেছে। সুখে, দুঃখে, আনন্দে, রোগ নিরাময়ে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দেওয়া এবং বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় চা ও চায়ের কাপ হয়ে ওঠে তুফানী মৌতাত। আর তাইতো কবীর সুমনের মুখে শোনা গিয়েছে -- "এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই, ডাইনে ও বাঁয়ে আমি তোমাকে চাই"! 

চিত্রঋণ : নরসিংহ দাস, এলাহিয়া হাই মাদ্রাসা

🍂

Post a Comment

0 Comments