জ্বলদর্চি

ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ২২৩


ছোটোবেলা বিশেষ সংখ্যা ২২৩
সম্পাদক : স্বাগতা পাণ্ডে 
চিত্র গ্রাহক: অমিতাভ সামন্ত

সম্পাদকীয় 

ছোট্ট বন্ধুরা, 
কেমন আছো সবাই? বৃষ্টি শেষ হয়নি, কিন্তু খোলা মাঠে সমুদ্রের মতো সাদা কাশ ফুলের ঢেউ। আর সেই কাশফুল ই বলে দিচ্ছে পূজোর ঘন্টা বেজে গেলো। গণেশ পূজা, বিশ্বকর্মা পূজা শেষ, এবার প্রহর গোনা আগমনী বার্তার। দেবী দূর্গার আবাহনের। এই সপ্তাহে তোমরা আমাকে পূজা র উপর ছবি এঁকে পাঠাও। শরতের আকাশ, সাদা কাশ, মা দুগ্গা, যা তোমাদের ইচ্ছা। 
ভালো থাকো সবাই। 
ইতি তোমাদের স্বাগতা দি


রায় সত্যজিৎ
            
সঞ্জীব ভট্টাচার্য 
           

বাঘা সেদিন দিচ্ছিলো তাল 
গুপীর গলায় গান
 হীরক রাজা ঝিমুচ্ছিলেন
মন্ত্রীর মুখে পান, 

শঙ্কুবাবু বাতাস চিরে
 গুনে যাচ্ছেন তারা 
এগোচ্ছিলেন পেছোচ্ছিলেন
 আঙ্গুলে গাঁট ধরা 

কাণ্ড দেখে ভূতের রাজা
 ভয়েই জড়োসড়ো 
একবার মরে ভূত হয়েছে
 আবার মরোমরো!

ওদিকেতে কি দেখে যে 
তপসে গেছে চুপসে 
লালমোহনকে কাছে পেয়ে
 জাপটে ধরে কষে। 

ফেলুদাদা  নিজের মনে
 একলা ভাবে ছাদে 
কেমন করে খুঁজবে দোষী 
আনবে ধরে বেঁধে 

লজেন্স চুরির গোপন কথা
 জানতে পারলো তবে
 এখন তাকে কে বাঁচাবে!  
কোথায় লুকিয়ে যাবে? 

হঠাৎ করে হাল্লার রাজা
হল্লা করে ওঠে 
আধো চোখে দেখলো গাবলু 
বসে তারই খাটে, 

বাঁচাও বাঁচাও ফেলু দাদা
 বাঁচাও ভূতের রাজা
 একটা তুমি বর দাওনা 
করে দিই না গাধা 

বাবা তাকান মায়ের দিকে 
চোখে ভরা  ইঙ্গিত
 মুচকি হেসে মা যে বলেন
 রায় সত্যজিৎ।
জয়দীপ সাহা, একাদশ শ্রেণি, সোদপুর হাইস্কুল 


ক্যুইজ ২২ 


১. মেদিনীপুর শহরের কর্ণগড়ের নাম কোন বিদ্রোহের সাথে যুক্ত? 
2. ভারতীয়-আমেরিকান নভোচারী সুনিতা উইলিয়াম কত সালে পদ্মভূষণ পেয়েছেন? 
৩. ক্রিকেট এ ভারত সর্বমোট কতবার ICC বিশ্বকাপ জিতেছে? 
৪. ইংরেজ শাসনকালে কোন ইংরেজ গভর্নর নিজেকে "বেঙ্গল টাইগার" বলতেন? 
৫. ব্ল্যাক প্যাগোডা বলা হয় ভারতীয় কোন মন্দির কে ? 


গত সপ্তাহের ক্যুইজ এর উত্তর: 

১. কোহিমা 
2. গড়বেতার গনগনি 
৩. ১৯ বার 
৪. পন্ডিত ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর 
৫. আসাম

🍂

 গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেট ম্যাচ 

সাঁইত্রিশ পর্ব

রতনতনু ঘাটী

হেডস্যারের রুমের চা-পর্ব শেষ হতে উঠে পড়লেন মুকুলকৃষ্ণ সেনাপতি। বললেন, ‘এবার আমি উঠি স্যার। কাল আবার ঠিক সময়ে স্কুলে চলে আসব।’

   হেডস্যার মুখে হাসি ছড়িয়ে বলে উঠলেন, ‘তা তো আসবেনই। এখন একটা দিনও আপনাকে না দেখতে পেলে আমার সব কাজ যেন পণ্ড হওয়ার জোগাড় হয়। কালকের জন্যে কত কাজ পড়ে আছে জানেন মুকুলবাবু? মাঠের উপরের শেডের উচ্চতা ফাইনালি কত হল দেখে নিতে হবে তো! কনট্রাকটার মনোজবাবু আমাদের নির্দেশ মতো সবই ঠিকঠাক করছেন নিশ্চয়ই। তবু দেখে নিতে দোষ কী? আমার মনে হয়, আমরা যতখানি উচ্চতা চেয়েছিলাম শেডের, ততখানি উচ্চতা ছুঁয়ে ফেলেছেন মনোজবাবু। এর চেয়ে বেশি উঁচু হওয়ার দরকার কী বলুন?’ তারপর ঘন্টিদাদুকে উদ্দেশ্য করে হেডস্যার বললেন, ‘তুমি সব দরজা-জানলা বন্ধ করে বাড়ি চলে যাও সম্মতিচরণ! আমি মুকুলবাবুকে এগিয়ে দিয়ে বাড়ির পথ ধরব!’

   হেডস্যার তাঁর রুম থেকে বেরোলেন। সঙ্গে মুকুলকৃষ্ণবাবু আর দেবোপমস্যাও আছেন। অমন সময় তাঁর রুমের বাইরে লোকন দাসকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হেডস্যার অবাক গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘লোকন, তুমি কি কিছু বলবে? এখনও বাড়ি যাওনি কেন? দাঁড়িয়ে আছ যে?’

   লোকন দেবোপমস্যারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘স্যার, আমি কাল স্কুলে আসব না। বিকেলে শুধু কোচিংয়ে আসব। তবে হয়তো একটু দেরি হতে পারে। এ কথা আপনাকে বলব বলে দাঁড়িয়ে আছি!’

   দেবোপমস্যার বললেন, ‘কাল তুমি স্কুলে আসবে না? কেন?’

   হেডস্যারও প্রশ্ন ভরা চোখ নিয়ে তাকালেন লোকনের দিকে। লোকন বলল, ‘স্যার, দিদির মাঝে-মাঝে জ্বর আসছে রাতের দিকে। কাল মহীতোষ ডাক্তারের চেম্বারে দিদিকে নিয়ে যাব। তার আগে আমাদের একবার যেতে হবে আমিতাভ সেনজেঠুদের বাড়ি।’

   হেডস্যার জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন, তাঁর বাড়িতে কেন যাবে?’

   লোকন কাঁচুমাচু মুখে বলল, ‘দিদি শখ করে মাস তিনেক আগে অমিতাভ জেঠুর কাছে তাঁর অ্যাকোয়ারিয়ামের একটা মাছ চেয়েছিল। জেঠু বলেছিলেন, ‘পারুলমণি, তোর বাড়িতে তো আর অ্যাকোয়ারিয়াম নেই? মাছ রাখবি কোথায়?’

   দিদি বলেছিল, ‘ভাইকে দিয়ে শিমুলতলির বাজার থেকে একটা কাচের জার কিনে এনে তাতে জল দিয়ে ছেড়ে রাখব! দেবেন একটা মাছ?’

   অ্যাকোয়ারিয়াম থেকে একটা মাছ তুলে বলেছিলেন, ‘এই মাছটাকে ফেলে দেব। এ মাছটা দুটো চোখেই দেখতে পায় না। একে আর রাখব না। অন্য ভাল মাছগুলো ওর সঙ্গে সব সময় মারামারি করে! এমনিতেই ও বাঁচবে না। তুই নিয়ে যা!’

   দিদি অমিতাভ জেঠুকে বলেছিল, ‘মাছটা অন্ধ বলে তুমি ফেলে দিতে চাইছ জেঠু? অন্ধকে কি কেউ অমন করে ফেলে দেয়? আমি তো দুটো চোখেই দেখতে পাই না? কই, আমার বাবা তো আমাকে ফেলে দেয়নি? তুমি মাছটা আমাকে দাও, আমি নিয়ে যাব।’ সেই থেকে মাছটা আমাদের বাড়িতে জারে বেঁচে ছিল। দিদি তার নাম রেখেছিল ‘নয়নী’। তার বন্ধুর অভাব হচ্ছিল বলে দিদি অমিতাভজেঠুর কাছ থেকে আরও একটা ভাল মাছ চেয়ে এনেছিল। জারে ছেড়ে দিয়েছিল। নয়নীর সঙ্গে সে বেশ বন্ধুও হয়ে উঠেছিল। সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে আমি আর দিদি দেখলাম, নয়নী মরে জারের মধ্যে উলটে ভেসে আছে! সেই থেকে দিদি রোজ রাতে কাঁদে নয়নীর জন্যে। আমরা ঠিক করেছি, কাল আমি দিদির সঙ্গে অমিতাভজেঠুর বাড়ি গিয়ে নয়নীর বন্ধু-মাছটাকে ফেরত দিয়ে আসব। দিদিই মনে দুঃখ এনে বসেছিল, ‘বল লোকন, এই মাছটা কার সঙ্গে বাঁচবে? তার বন্ধুটাও চলে গেল!’ আমরা ভাল মাছটাকে অমিতাভজেঠুর বাড়িতে ফেরত দিতে যাব। তার আগে আমাদের বিজনডিহি মাঠে ক্রিকেট খেলার জন্যে সকলে অপেক্ষা করবে—নয়ন, বিজয়, বিল্টু কামিলা, অনিল দুবেরা। ওদের সঙ্গে ঘণ্টাখানেক ক্রিকেট প্র্যাকটিস করতে হবে। ওরা তো কোথাও খেলতে পায় না। ওরা আবার আমার সঙ্গে খেলতে চায়। তারপর দিদিকে নিয়ে যাব মহীতোষ ডাক্তারের চেম্বারে। উনি যদি প্যাথলজিক্যাল টেস্ট কিছু দেন, সেসব করিয়ে নিতে যাব শিমুলতলি বাজারের সেবা প্যাথলজিতে। তারপর বাড়ি ফিরতে ফিরতে দুপুর। তাই স্কুলে আসতে পারব না স্যার।’

   হেডস্যার চিন্তিত মুখে বললেন, ‘যাও লোকন, দিদিকে ডাক্তার দেখিয়ে নাও! আজকাল চারদিকে যা ম্যালেরিয়া শুরু হয়েছে। শুনছি নাকি তিথিবকুল গ্রামের অনিরুদ্ধ দাসের বড় ছেলের ক’ দিন ধরে ঘুষঘুষে জ্বর হচ্ছিল। ডাক্তার ব্লাড টেস্ট করতে দিয়েছিল। ডেঙ্গুর ভাইরাস ধরা পড়েছে।’

   লোকল বলল, ‘হ্যাঁ স্যার। দিদিকে দেখিয়ে নিয়ে আমি ভাত খেয়ে স্কুলে চলে আসব ক্রিকেট কোচিংয়ে।’

   দেবোপমস্যার লোকনকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাড়িতে টাকাপয়সা আছে তো? ডাক্তার দেখাবে?’

   লোকন বলল, ‘না স্যার, মহীতোষডাক্তার দিদিকে দেখে দেন। কখনও ফিজ নেন না। আর সেবা প্যাথলজির দেবেনজেঠু হয়তো টেস্টের জন্যে টাকা নেবেন না।’

   তক্ষুনি দেবোপমস্যার পকেট থেকে থেকে ওয়ালেট বের করে পাঁচশো টাকা লোকনকে দিয়ে বললেন, ‘তুমি দিদিকে দেখিয়ে নিও। ওষুধ লাগলে কিনে নিও। যদি দিদির খুব শরীর খারাপ মনে হয়, তবে আজ না হয় না-ই বা প্র্যাকটিসে এলে?’

   মুকুলকৃষ্ণবাবু বললেন, ‘লোকন আমি সন্ধেবেলা একবার তোমার বাড়িতে গিয়ে পারুলমণি কেমন থাকল জেনে তবে বাড়ি যাব। তুমি চিন্তা কোরো না! আমরা তোমার সঙ্গে আছি?’

   হেডস্যার চিন্তিত মুখে বললেন, ‘তোমার টাকাপয়সার দরকার হলে তুমি আমাকে বোলো লোকন! দেবোপম আছে, মুকুলকৃষ্ণবাবু আছেন, আমি তো আছি। চিন্তা কোরো না লোকন!’

   লোকন দৌড় লাগাল বাড়ির দিকে। দিদি কেমন আছে, সে কথা ভাবতে ভাবতে দৌড়চ্ছিল। আজ যেন গগনজোতি স্কুল থেকে বিডনডিহি গ্রামের পথটা অনেকটা ছোট হয়ে এসেছে। সাঁইসাঁই করে লোকন ফিরে এল বাড়িতে। বানই ফিরে দেখল, পারুলমণি বিছানায় কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে।

   রাধাপিসি দু’জনের রাতের রান্না করে দিয়ে বাড়ি চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু রাধাপিসি যায়নি। পারুলমণির বিছানার পাশে জলপট্টির বাটি নিয়ে চুপটি করে বসে আছে। লোকন রাধাপিসিকে দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘রাধাপিসি, তুমি এখনও বাড়ি যাওনি কেন? এই অন্ধকারে একা কেমন করে বাড়ি যাবে?’

   ‘তুমি বাড়ি ফেরোনি বলে আমি পারুলমণিকে একা রেখে কেমন করে চলে যাই? মাঝে-মাঝে পারুল ভুল বকছে। কপালটা বড্ড গরম! আমি জলপট্টি দিয়ে যাচ্ছি। লোকন, তুমি বাবা কাল পারুলমণিকে ডাক্তার দেখানোর ব্যবস্থা করো! আমার কেমন ভাল ঠেকছে না!’

   ‘কাল তো মহীতোষ ডাক্তারকে দেখাতে নিয়ে যাব দিদিকে। আজ এখন চলো রাধাপিসি, তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসি। তুমি এই অন্ধকারে একা যাবে কেমন করে? তোমার ভয় করবে না?’

   ‘লোকন, তুমি পারুলমণির কাছে থাকো! খেতে দাও। আমি একাই বাড়ি চলে যেতে পারব।’

   বলে রাধাপিসি উঠোনের অন্ধকার ঠেলে এগিয়ে গেল তার বাড়ির দিকে। উঠোন থেকে ফিরে এসে লোকন বলল, ‘দিদি, চল খেয়ে নিবি। আমারও খুব খিদে পেয়েছে।’ বলে পারুলমণির মাথার পাশে বসে পড়ল লোকন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে-দিতে লোকন বেশ ভেঙে-পড়া গলায় বলল, ‘তুই জ্বরে পড়ে গেলি দিদি? হেডস্যার বলছিলেন, আমাদের গ্রামের চারদিকে এখন যা ডেঙ্গুর     

   পরের দিন সকাল সকাল মুকুলকৃষ্ণবাবু স্কুলে পৌঁছে গেলেন। হেডস্যার মগ্ন হয়ে টেবিলে অনেক খাতাপত্র নিয়ে কী সব হিসেব করছিলেন। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে দ্বিধা জড়ানো গলায় বললেন, ‘নবনীতস্যার, আমি ভাবছিলাম কী, এতই যখন খরচ হচ্ছে, তখন...! তাই কাল রাতে বাড়িতে মন্দাকিনীর সঙ্গে কথা বলছিলাম। মন্দুও বলল, ‘মাঠের শেডের একদম টিঙটিঙে উচ্চতা ভাল লাগবে না গো। তা ছাড়া, আমাদের গগনজ্যোতি স্কুলের ক্রিকেটাররা এক-একজন যে হারে ছক্কা হাঁকায়, তাতে শেডটা ঠিকমতো উঁচু না হলে, বল তো ধাক্কা খেয়ে নীচে নেমে আসবে? খেলা ঠিকঠাক জমবেই না!’ আমিও ভেবে দেখলাম মন্দাকিনী ঠিকই বলেছে। আজই মাঠে দাঁড়িয়ে দেখে এলাম, আরও ফুট পাঁচেক উচ্চতা বাড়িয়ে নিলে ভাল হবে স্যার! আমাদের হাতে এখনও তো সময় আছে?’

   হেডস্যারের মুখে চিন্তার ছায়া দোল খেয়ে উঠল। বললেন, ‘সময় তো খানিকটা আছে ঠিকই! কিন্তু না না মুকুলবাবু, খরচ বাড়তে বাড়তে কোথায় পৌঁছেছে জানেন? আর মনে হয় খরচ বাড়ানো ঠিক হবে না!’

   মুকুলবাবু হাসতে হাসতে বললেন, ‘তার আগে বলুন, উচ্চতা আরও পাঁচ ফুট বেড়ে গেলে আপনার সম্মতি পাব তো?’

   ‘সম্মতি পাবেন না কেন? কিন্তু টাকাটাও একটা বড় ব্যাপার! এখনও নবান্নের অনুদান এসে পৌঁছয়নি। এই নিয়ে আমি ডি এম সাহেবকে তাগাদা দেওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়েছি। উনি নবান্নে ক্রীড়ামন্ত্রীকে ফোনও করেছেন, আমাদের ওই অনুদানের টাকাটা যাতে তাড়াতাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা হয়ে যায়!’

   মুকুন্দবাবু বললেন, ‘ঠিক আছে! নবান্নের অনুদান এসে পৌঁছক। তার আগে একটা টাকার ব্যবস্থা ব্যবস্থাও হয়ে গেছে স্যার। আজ সকালে আমার স্ত্রী মন্দাকিনী তার কয়েকটা সোনার গয়না সিন্দুক থেকে বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল, ‘এগুলো নিয়ে যাও! বিক্রি করে দাও। আমার এসব গয়না আর কী হবে? এখন তো গয়না আর তেমন করে পরাই হয়ে ওঠে না। তা ছাড়া, আমার শ্বশুরমশাইয়ের স্মৃতিতে গগনজ্যোতি স্কুলে যখন নিখিলমনোহর স্টেডিয়াম তৈরি হচ্ছে, তখন তার তো একটা দেখনদারির ব্যাপার থাকতে হবে, নাকি? তুমি এই গয়নাগুলো বিক্রি করে হেডস্যারের হাতে টাকা ক’টা তুলে দাও!’

   হেডসার গলায় আবেগ ঝরিযে বললেন, ‘আপনি আর কত করবেন আমাদের জন্যে মুকুলবাবু? শাঁখাপোতা গ্রামের পৈতৃক ভিটেমাটি পর্যন্ত বিক্রি করে দিলেন। কুসুম নদীর ধারের অত সুন্দর বাড়িটা! কী মায়াময় ছিল বাড়িটা! বাড়িটার কথা ভাবলে আমার মনটা এখনও আনমনা হয়ে যায়।’

   ‘অমন কথা বলছেন কেন স্যার? তার বদলে আমাদের গগনজ্যোতি স্কুলের মাঠের মাথায় শেড তৈরি হবে, ছেলেমেয়েরা খেলতে গিয়ে বৃষ্টি-রোদে অসুবিধেয় পড়বে না। এর চেয়ে আনন্দের আর কী থাকে স্যার?’ একটু থেমে মুকুলবাবু বললেন, ‘তা ছাড়া ভেবে দেখুন একবার, আমাদের জেলায় আর একটিও স্কুল কি এরকম মাঠের মাথায় শেড বানাতে পেরেছে কি? এ তো একটা দৃষ্টান্ত! এ তো গর্বের কথা!’

   মুকুলবাবুর কথায় সমর্থন জানিয়ে ঘাড় নাড়তে লাগলেন হেডস্যার। বললেন, ‘কথাটা তো একশো ভাগ ঠিক! কিন্তু...’

   ততক্ষণে স্কুলে প্রেয়ারের ঘণ্টা বেজে উঠল। হেডস্যারের রুমের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন দেবোপমস্যার। হেডস্যারকে ডাকলেন, ‘চলুন স্যার!’

   হেডস্যার চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। মুকুলবাবুকে বললেন, ‘আপনি আমার রুমেই বসে থাকুন। খবরের কাগজ পড়ুন। প্রেয়ার শেষ করে আমরা ফিরে আসছি!’

   দেবোপমস্যার চললেন হেডস্যারের পিছন-পিছন অ্যাসেম্বলি হলের দিকে। মুকুলকৃষ্ণবাবু হেডস্যারের রুমের দরজা দিয়ে বাইরে মাঠের দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলেন, কেমন তাড়াতাড়ি শেডের কাজটা শেষের পথে এগিয়ে গেল। কর্পূর গাছের পাতার আড়ালে বসে সেই সুসময়ের কোকিলটা ‘কুহু-কুহু’ করে কয়েকবার ডেকে উঠল। 

(এর পর ৩৮ পর্ব)

Post a Comment

0 Comments