জ্বলদর্চি

বর্গির দুর্গাপূজা /সৌরভ চক্রবর্তী

বর্গির দুর্গাপূজা
 
সৌরভ চক্রবর্তী

বাংলার সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাসে অষ্টাদশ শতাব্দী এক অত্যন্ত অশান্ত ও ঝোড়ো সময় ছিল। মুঘল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শক্তির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তখন নবাব আলিবর্দি খাঁ বাংলার শাসনভার পরিচালনা করছিলেন। ঠিক এই সময়েই নাগপুরের মারাঠা শাসক রঘুজী ভোঁসলের সেনাপতি ভাস্কর রাম কোলহাটকর—যিনি বাংলায় ভাস্কর পণ্ডিত নামে কুখ্যাত—তাঁর নেতৃত্বে মারাঠা অশ্বারোহী বাহিনী বা বর্গি দল বাংলায় একের পর এক ধ্বংসাত্মক আক্রমণ চালায়। এই লুণ্ঠন, রক্তপাত এবং চরম অরাজকতার ইতিহাসের সমান্তরালে ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দে এক অনন্য ও রোমাঞ্চকর অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, যা ইতিহাসে 'ভাস্কর পণ্ডিতের দুর্গাপূজা নামে পরিচিত। পূর্ব বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার অন্তর্গত গঙ্গার তীরবর্তী দাঁইহাট শহরে আয়োজিত এই পুজো কেবল একটি ধর্মীয় আচার ছিল না, বরং তা ছিল যুদ্ধ, রাজনীতি, কূটনীতি এবং সংস্কৃতির এক অদ্ভুত ও অভূতপূর্ব মেলবন্ধন।
🍂
১৭৪০-এর দশকে বাংলায় বর্গি আক্রমণ সাধারণ মানুষের জীবনে এক চরম ও দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বর্গি নির্যাতনের সেই ভয়াবহতা আজও বাংলার লোকসংস্কৃতি এবং ছড়ার মধ্যে বেঁচে রয়েছে। ১৭৪২ খ্রিষ্টাব্দে ভাস্কর পণ্ডিত প্রায় চল্লিশ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বাংলায় হানা দেন এবং বর্ধমানের যুদ্ধে নবাব আলিবর্দি খাঁর বাহিনীকে অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করেন। এই বিজয়ের পর মারাঠারা তৎকালীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র কাটোয়া এবং তার সংলগ্ন গঙ্গার পশ্চিম কূলের দাঁইহাট অঞ্চলে নিজেদের শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলে। নবাব তখন নিরুপায় হয়ে গঙ্গা পার হয়ে মুর্শিদাবাদে সাময়িকভাবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন এবং সমগ্র অঞ্চলটি বর্গিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এই একছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর নিজের শৌর্য প্রদর্শন এবং ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে ভাস্কর পণ্ডিত শরৎকালের প্রধান উৎসব দুর্গাপূজার আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেন।
পূজার স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল দাঁইহাটের একটি বড় উঠোনসহ প্রাচীরবেষ্টিত বাড়ি, যা তৎকালীন বর্ধমান রাজাদের কাছারিবাড়ি বা শুল্ক আদায়ের প্রধান কার্যালয় ছিল বলে ঐতিহাসিকদের ধারণা। মারাঠারা স্বভাবগতভাবেই শাক্ত তথা দেবী দুর্গার পরম উপাসক ছিলেন। দীর্ঘদিনের যুদ্ধযাত্রায় ক্লান্ত ও অবসন্ন সৈন্যদের মনোবল চাঙ্গা করা এবং বিজয়ের উল্লাসকে উদযাপন করাই ছিল এই রাজকীয় পূজার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বর্গি সেনাপতির চরম ভয়ে ভীত হয়ে স্থানীয় বহু জমিদার এবং সামন্ত রাজা নিজেদের জীবন ও সম্পত্তি সুরক্ষার তাগিদে এই পূজায় বিপুল পরিমাণ অর্থ, সোনা-দানা, বহুমূল্য বস্ত্র এবং পূজার অন্যান্য উপাচার উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন, যা পূজার জাঁকজমক বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল।
ভাস্কর পণ্ডিতের এই দুর্গাপূজা বাংলার সনাতন ও ঐতিহ্যবাহী পূজার রীতিনীতি থেকে বেশ কিছুটা আলাদা এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল ছিল। বাঙালি হিন্দুরা সাধারণত দশহাত বিশিষ্ট বা দশভুজা রূপে দেবী দুর্গার আরাধনা করে থাকলেও, ভাস্কর পণ্ডিত মারাঠা ও দাক্ষিণাত্যের ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুসরণ করে আট হাত বিশিষ্ট বা অষ্টভুজা মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। স্থানীয় লোকশ্রুতি ও প্রাচীন ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, এই প্রতিমাটি সাধারণ মাটি বা কাঠের তৈরি ছিল না, বরং তা ছিল এক অত্যন্ত মূল্যবান ও জাঁকজমকপূর্ণ সোনার দুর্গা প্রতিমা। মহাসপ্তমী তিথি থেকে শুরু করে প্রতিদিন শত শত ছাগল ও মহিষ বলির মাধ্যমে অত্যন্ত উগ্র ও রাজকীয় কায়দায় দেবীর শক্তি আরাধনা চলছিল এবং মারাঠা সৈন্যদের উৎসব উদযাপনের অবাধ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস সবসময় একরেখায় চলে না এবং এই পূজার আনন্দের চরম শিখরেই লুকিয়ে ছিল এক চরম নাটকীয় মোড়। নবাব আলিবর্দি খাঁ কেবল একজন দক্ষ শাসকই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এক অত্যন্ত চতুর ও দূরদর্শী সামরিক স্ট্র্যাটেজিস্ট। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, দুর্গাপূজার উৎসবে মেতে উঠে মারাঠা বাহিনী তাদের স্বাভাবিক সামরিক সতর্কতা ও প্রহরা অনেকটাই শিথিল করে দিয়েছে। এই সুযোগটিকে একটি মোক্ষম সামরিক চাল হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন নবাব। মহাষ্টমীর গভীর রাতে, যখন ভাস্কর পণ্ডিতের বর্গি সেনারা মদ্যপান, নাচ-গান এবং উৎসবের আমেজে সম্পূর্ণ মগ্ন ও অসতর্ক ছিল, তখন নবাব আলিবর্দি খাঁর সুশিক্ষিত ও অতর্কিত আক্রমণকারী সেনাদল অত্যন্ত গোপনে নদী পার হয়ে দাঁইহাটের বর্গি ঘাঁটিতে তীব্র ও মারাত্মক আক্রমণ চালায়।
হঠাৎ শুরু হওয়া এই আকস্মিক আক্রমণ এবং নবাবের বাহিনীর তীব্র কামানের গোলার আঘাতে মারাঠা শিবির পুরোপুরি ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। মহানন্দা ও ভাগীরথী নদীর সংযোগস্থলের এই রণক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে ভাস্কর পণ্ডিত দ্রুত বুঝতে পারেন যে এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধজয় বা ঘাঁটি রক্ষা করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। সেই চরম বিশৃঙ্খলা ও পরাজয়ের মুহূর্তেও ধর্মীয় অনুভূতির কারণে তিনি চেয়েছিলেন যেন দেবীর পবিত্র প্রতিমা শত্রুপক্ষের হাতে কোনোভাবেই অপবিত্র, লুণ্ঠিত বা অসম্মানিত না হয়। এই কারণে মহানবমীর ভোরের আলো ফোটার আগেই তিনি অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে পূজা অসমাপ্ত রেখেই সেই মূল্যবান প্রতিমা ভাগীরথী নদীর পবিত্র জলে বিসর্জন দেওয়ার নির্দেশ দেন। প্রতিমা বিসর্জনের পরপরই তিনি নিজের অবশিষ্ট প্রাণ এবং সৈন্য বাঁচাতে ঘোড়া ছুটিয়ে বীরভূম হয়ে মহারাষ্ট্রের দিকে পালিয়ে যান, যার ফলে আড়াইশো বছর আগের সেই মহাসমারোহের দুর্গাপূজাটি চিরকালের জন্য অপূর্ণ ও অসমাপ্ত থেকে যায়।ভাস্কর পণ্ডিতের সেই অসমাপ্ত ও নাটকীয় পূজার স্মৃতি দাঁইহাটের মানুষ ও বাংলার ইতিহাস আজও ভুলে যায়নি। এই ঐতিহাসিক ঘটনার দীর্ঘ সময় পর, ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে কাটোয়া ও দাঁইহাটের কিছু ইতিহাস অনুরাগী মানুষ এবং স্থানীয় বাসিন্দা মিলে সেই নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক স্থানে পুনরায় দুর্গাপূজা শুরু করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বর্তমানে দাঁইহাটের সমাজবাটি পাড়ার সেই প্রাচীন কাছারিবাড়িতে প্রতি বছর অত্যন্ত সাড়ম্বরে এবং ঐতিহাসিক মর্যাদার সাথে এই পূজার আয়োজন করা হয়। দাঁইহাটের সেই সমাজবাটি এলাকায় আজও একটি প্রাচীন ভাঙা পাঁচিল অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে, যা স্থানীয় মানুষের কাছে ভাস্কর পণ্ডিতের পূজার পাঁচিল নামে অত্যন্ত পরিচিত। এই প্রাচীরটি ভালো করে লক্ষ্য করলে আজও নবাবের বাহিনীর ছোঁড়া প্রাচীন কামানের গোলার তীব্র আঘাতের দাগ স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়, যা সেই রক্তক্ষয়ী মহাষ্টমীর রাতের নীরব সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। ভাস্কর পণ্ডিতের দুর্গাপূজা বাংলার ইতিহাসের একটি অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী অথচ রোমাঞ্চকর এবং অনন্য অধ্যায়ের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। একজন লুণ্ঠনকারী ও অত্যাচারী বর্গি সেনাপতির শক্তির আরাধনা কীভাবে কালক্রমে বাংলার শ্রেষ্ঠ উৎসবের অঙ্গ হয়ে উঠল এবং একটি স্থায়ী লোকগাথায় রূপান্তরিত হলো, তা সত্যিই বিস্ময়কর। ১৭৪২ খ্রিষ্টাব্দের সেই অসমাপ্ত পূজা আজ আড়াইশো বছরেরও বেশি সময় পার করে দাঁইহাটের এক অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এই ঘটনাটি অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রমাণ করে যে, সাময়িক যুদ্ধবিগ্রহ, রাজনৈতিক উত্থান-পতন কিংবা শাসকদের পরিবর্তনের চেয়েও সংস্কৃতির টান এবং উৎসবের আবহ মানুষের যৌথ অবচেতনে কতখানি গভীর, দীর্ঘস্থায়ী এবং চিরন্তন প্রভাব ফেলে রেখে যেতে পারে।

তথ্যসূত্র:
১. রিয়াজ-উস-সালাতিন — গোলাম হুসেন সলিম
২. মহারাষ্ট্র পুরাণ — গঙ্গারাম
৩. বর্ধমান জেলার ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতি — পশ্চিমবঙ্গ সরকার তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ 
৪. দ্য টেলিগ্রাফ এবং আনন্দবাজার পত্রিকা (আঞ্চলিক ইতিহাস বিষয়ক প্রতিবেদন ও দস্তাবেজ)।
৫. কাটোয়া ও দাঁইহাটের স্থানীয় ইতিহাস বিষয়ক স্মারক পত্রিকা ও পুরাতাত্ত্বিক ক্ষেত্র সমীক্ষা।

Post a Comment

0 Comments