সুমেধা চট্টোপাধ্যায়
মীরা চ্যাটার্জ্জী। আমার ঠাকুমা। আমি বোধ-জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই তাঁকে সাদা সরু পাড় শাড়িতে দেখেছি। দেখেছি একাদশী করতে। নিরামিষ খেতে। বাড়ির অন্য সকলের থেকে তাঁর এই আচরণগুলি যেহেতু আলাদা ছিল তাই এইগুলি খুব নাড়া দিত আমার শিশুমনকে। মনে জাগত অনেক প্রশ্ন। একটু বড় হয়ে শুনলাম আমার ঠাকুরদা যখন মারা যান আমার ঠাকুমা তখন কুড়ির কোঠায়। সেই থেকেই তার এই বৈধব্য আচরণ। খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল ঠাকুমার। উনি সেই সময়ে ম্যাট্রিক পাশ করেন।
স্কুল থেকে ফিরে আমার সর্বক্ষণের খেলার সঙ্গী ছিলেন তিনি। আমার দিদা (আমরা ঠাকুমাকে ‘দিদা’ বলে ডাকতাম)।আমাদের বাঙ্গুর এভিনিউতে ফ্ল্যাট ছিল পাঁচতলায়।লিফ্ট ছিল না। আমার স্কুলব্যাগ নিয়ে উঠতে কষ্ট হবে বলে দিদা নেমে আসত তিনতলায়। একটু বড় হয়ে ওনার মুখেই শোনা আমার ঠাকুরদা ইহলোক ত্যাগ করার পর কত কষ্ট করে উনি ছোট ছোট দুই ছেলে মেয়ে কে (আমার বাবা ও পিসি)মানুষ করেন শ্বশুরবাড়িতে থেকেই। নিজ স্বভাবগুণে শ্বশুরমশাই-এর পূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছিলেন। একাধিক দেওর-ননদের মধ্যে উনি ছিলেন সবার বড় বৌদি- তাই শুধু সন্তানপ্রতিপালন নয়... সংসারের অন্য অনেক দায়িত্বও ছিল কাঁধের উপর।
🍂
সেই দায়িত্বশীল মনোভাবের পরিচয় আমি প্রত্যক্ষ করি , ছোটবেলায় উনি যে যত্নশীলভাবে আমার রক্ষণাবেক্ষণ করতেন তা দেখে। দিদার একখানা ছোট নোটবই ছিল। সেটিতে লিখে রাখতেন প্রাণাধিক প্রিয় নাতি-নাতনিদের বিভিন্ন বয়সের একাধিক সাফল্যের দিনক্ষণ--- কবে প্রথম স্কুল, প্রথম পুরস্কার, আমার প্রথম ষ্টেজে নৃত্য- পরিবেশন ইত্যাদি ইত্যাদি।
আজ আমার পুত্রকে একইভাবে তার ঠাকুমার সান্নিধ্যে বড় হতে দেখছি চোখের সামনে। ছোটবেলার বহু স্মৃতিকে পুনরুজ্জীবিত হতে দেখি। আমাদের মতই আমার মা–বাবা দুজনেই যেহেতু চাকুরীজীবী ছিলেন, তাই দিনের একটি বড় সময় থাকতাম দিদার সাথে। অরণ্যদেবের গল্প শুনতাম, অনেক ছবির বই দেখতাম। সময় কাটত বেশ।
আমার আলুভাজা খাওয়ার প্রতি বিশেষ আকর্ষণ ছিল। এখনও আছে। বাবার বলে দেওয়া নিয়ম ছিল, একবার সবাই নির্দিষ্ট পরিমাণ পাওয়ার পর যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে তবেই দ্বিতীয়বার পাতে পড়বে আলুভাজা, নচেৎ নয়। সবাই খেয়ে উঠে যাওয়ার শেষে আমার পাতে দিদার নিজের ভাগে রাখা আলুভাজার একাংশ পড়ত। ওটিই ছিল আমার কাছে বিশেষ আকর্ষণ।
আমার স্কুলের বাস চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতেন বারান্দায়। একবার রেজাল্টের দিন ফি-বই নিয়ে যেতে ভুলে গেছিলাম বলে নিজেই তা নিয়ে স্কুলে চলে আসেন—ঠাকুমা হয়ে সকল মা-বাবার সামনে দিয়ে বীরদর্পে কৃতী নাতনির রিপোর্ট কার্ড নেন। বড় নাতনি হিসেবে একটু বেশীই প্রিয় ছিলাম ওনার কাছে।
জন্মদিনে আসনে বসিয়ে দিদার আশীর্বাদ করা, নীলষষ্ঠী, শীতলষষ্ঠী, অশোকষষ্ঠীর দিনে ব্রতকথা শোনানো এসবই আমার শৈশব ও কৈশোরের মধুর সব স্মৃতি। একদিন স্কুল থেকে এসে গল্প শুনতে শুনতে ডুকরে কেঁদে উঠেছিলাম। হঠাৎ ভয় লেগেছিল খুব এই ভেবে যে দিদা যেদিন থাকবে না সেদিন বড় একা হয়ে যাব। দিদা সান্ত্বনা দিয়েছিল “ আমার তিতলিরানী তখন তো অনেক বড় হয়ে যাবে, একা থাকতে শিখে যাবে, রাজপুত্র এসে ঘোড়ায় করে নিয়ে যেতেও পারে।“
পুজোর গন্ধ এলেই মহালয়ার পর থেকে মানে দেবীপক্ষে প্রতিবছর দিদার কথা খুব মনে পড়ে।আমার প্রথম মহিষাসুরমর্দিনী শোনা বোধহয় আট বছর বয়স এ... আমার দিদার সাথেই। দিদা মহালয়ার আগের দিন রাতে আমার বাবাকে বলতেন আকাশবানীর সঠিক স্টেশনটি রেডিওতে ঠিক করে রাখতে। ভোরবেলা চারটের আগেই উঠে যেতেন দিদা...বলতেন “যদি অ্যালার্ম শুনতে না পাই”---
প্রভাতী অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে আকাশবানীতে শুরুর একটি বিশেষ সুরে বাজনা বাজে...দূরদর্শনেও ঐ বাজনা শুনেছি...খুব নস্টালজিক লাগে এখনও।তারপরেই ঘোষনা হয়-“শুরু হচ্ছে মহালয়ার বিশেষ প্রভাতী অনুষ্ঠান “মহিষাসুরমর্দিনী”...
এরপর শঙ্খধ্বনি, “য়া চন্ডী”-র পরেই শ্রী বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কন্ঠে “ আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জরী”...দেবীপক্ষের সুচনা। গায়ে কাঁটা দেয় এখনও। দিদা স্তোত্রপাঠ শুরু হলেই ঘরে ধূপ জ্বালাতেন...একটি বিশেষ সুগন্ধযুক্ত...এক মোহময়তা সৃষ্টি হতো।আমরা দুজনে একসাথে পুরো মহালয়া শুনতাম..মা দুর্গার সৃ্ষ্টি, অস্ত্রদান ইত্যাদি প্রতিটি স্তোত্রের অর্থ দিদা আমাকে বুঝিয়ে দিতেন।এভাবে আমার শৈশবের দিনগুলিতে দেবীপক্ষের আগমন ঘটত।
পুজোর প্রতিদিন আমাদের বাড়ির কাছে বৈকালিকী স্বপন স্মৃতি পাঠাগারে সন্ধ্যারতি দেখে দিদা ঠাকুর দেখতে বেরতেন।
এ সবই আজ স্মৃতি...২০১২ সালে পুজোর অনেক আগেই দিদা আমাদের ছেড়ে চলে যান। সেই থেকে আজ অবধি আমি রেডিওতে "মহিষাসুরমর্দিনী" শুনি... বৈকালিকী আর যাওয়া হয় না...আমরা সেই শহরতলির আস্তানা ছেড়ে এখন দক্ষিণ-কলকাতাবাসী। কিন্ত দিদা চলে যাওয়ার পরও ছোটবেলার সেই ধূপের গন্ধটা প্রতি মহালয়ার দিনে পাই...হয়তো আশেপাশের কোন বাড়ি থেকে আসে...একই সুগন্ধ...কিন্ত আমার মন যুক্তি মানতে চায় না...মনে হয় “মীরা” সবসময় বিশেষ করে দেবীপক্ষে আমার আশেপাশেই থাকেন।
0 Comments